বিশ্ব বাঘ দিবস: সুন্দরবনে প্রতি বছর প্রাণ হারাচ্ছে ৩ বাঘ

‘সেভ সুন্দরবনস টাইগার ল্যান্ডস্কেপ’ বা ‘বাঘের আবাসস্থল সুন্দরবন বাঁচান’ প্রতিপাদ্য নিয়ে রোববার পালন হচ্ছে বিশ্ব বাঘ দিবস। দিবসটি উপলক্ষে কয়েকটি পরিবেশবাদী সংগঠন খুলনা, বাগেরহাট ও ঢাকায় বর্নাঢ্য র্যালি করেছে।
এর আগে পরিবেশ ও বন মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ সকালে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিশ্ব বাঘ দিবসের সমাবেশ ও র্যালি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
উল্লেখ্য, ২০১০ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে বাঘ সমৃদ্ধ ১৪ টি দেশের রাষ্ট্র প্রধানদের সম্মেলনে বাঘ সংরক্ষণকে বেগমান করতে একটি ঘোষণাপত্র তৈরি করা হয়। এ ঘোষণাপত্রের আলোকে প্রতিবছর ২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবস পালন করা হচ্ছে।
সকালে র্যালি উদ্ধোধনের আগে পরিবেশ ও বন মন্ত্রী বলেন, “সরকার বিশেষ অগ্রাধিকার ও আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুসারে সুন্দরবনের বাঘ রক্ষার কাজ করে যাচ্ছে।”
তিনি বলেন, “সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা দিগুণ করার সুযোগ নেই। তবে আন্তর্জাতিক ঘোষণা অনুসারে সুন্দরবনের বাঘ ও হরিনের সংখ্যা ধারন ক্ষমতার মধ্যে রেখে অবৈধ হরিণ শিকার বন্ধ, আবসনস্থলের উন্নয়ন ও নিয়মিত টহলের মাধ্যমে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
মন্ত্রী বলেন, “বাঘ রক্ষার করতে ‘ন্যাশনাল টাইগার রিকভারি প্রোগ্রাম’ (এনটিআরপি) প্রণয়ন ও ২০০৯-২০১৭ বাঘ সংরক্ষণ কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বাঘ ও হরিণ শিকার বন্ধে অধিকতর শাস্তির বিধান রেখে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী আইন ২০১২ করা হয়েছে।”
ড. হাছান মাহমুদ বলেন, “এছাড়াও বৈধ পাস পারমিট নিয়ে বনে প্রবেশের পর বাঘের হামলায় নিহত হলে তার পরিবারকে ১ লাখ টাকা এবং আহত হলে চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হচ্ছে। বাঘের আক্রমণের শিকার ৪৮ টি পরিবারের মধ্যে ৪৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছে।”
“বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বাংলাদেশ, নেপাল ও ভূটান এরইমধ্যে “বনপ্রাণী সংরক্ষণ আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারকরণ প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন” বলেও জানান মন্ত্রী।
পরিবেশ সচিব মেছবাহ উল আলম বলেন, “২০১১-১২ অর্থবছরে ক্ষতিগ্রস্ত ২৯ পরিবারকে ২৫ লাখ টাকা দিয়েছে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগ। লোকালয়ে বাঘ চলে এলে তাকে হত্যা না করে বরং পটকা ফুটিয়ে, ঢোল বাজিয়ে, জাল দিয়ে ঘিরে ফেলে অথবা ট্রাংকুলাইজ করে বনে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এজন্য বন সংলগ্ন জনগোষ্ঠীকে সচেতন করা হচ্ছে। এসব কারণে চলতি বছর একাধিকবার বাঘ লোকালয়ে চলে এলেও হত্যার ঘটনা ঘটেনি।”
বন বিভাগের সূত্রমতে, বিশ্বের ১৩টি দেশের বনে বাঘের অস্তিত্ব আছে। আর ঘনত্বের দিক দিয়ে সুন্দরবনেই সবচেয়ে বেশি বাঘ বাস করে।
সুন্দরবনে প্রতিবছর প্রাণ হারাচ্ছে তিনটি করে বাঘ
প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খাদ্যাভাব, বয়সজনিত কারণ এবং চোরা শিকারিদের হাতে গড়ে তিনটি করে বাঘ মারা যাচ্ছে সুন্দরবনে। মাত্রাতিরিক্ত লবণপানি পানে নেক্সাসিস ও লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হচ্ছে বাঘ। চিকিৎসার অভাবে অনেক বাঘ রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ছে। গাছপালা কমে যাওয়ায় আবাসস্থল সঙ্কট ও খাদ্যাভাবের কারণে লোকালয়ে বাঘের অনুপ্রবেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। লোকালয়ে ঢুকে বাঘের হাতে মানুষসহ গরু, ছাগল ও গবাদিপশু হামলার শিকার হচ্ছে। মানুষও ক্ষুব্ধ হয়ে পিটিয়ে, কুপিয়ে বা গুলি করে বাঘ হত্যা করছে।
প্রতিনিয়তই চোরা শিকারিরা ফাঁদ পেতে ও বিষপ্রয়োগ করে বাঘ হত্যা করছে। বাঘের চামড়া, হাড়, চোখসহ শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রি হওয়ায় এ কাজের জন্য গড়ে উঠেছে একাধিক সিন্ডিকেট।
বন বিভাগের তথ্য অনুয়ায়ী, ২০০৮ সালে ১টি, ২০০৯ সালে ১টি, ২০১০ সালে ২টি, ২০১১ সালে ১টি এবং ২০১২ সালের জুন পর্যন্ত ১টি বাঘ মারা গেছে। বাঘের হামলায় ২০০৮ সালে ১৮ জন নিহত ও ৩ জন আহত, ২০০৯ সালে ২৯ জন নিহত ও ২ জন আহত, ২০১০ সালে ৩৩ জন নিহত ও ৮ জন আহত, ২০১১ সালে ২৭ জন নিহত ও ১১ জন আহত এবং ২০১২ সালের জুন পর্যন্ত ১৬ জন নিহত ও ৪ জন আহত হয়েছে।
২০০৯ সালে গণপিটুনিতে ১টি বাঘ এবং ২০১১ সালে অবৈধ চোরা শিকারিদের হাতে ৪টি বাঘ মারা গেছে। এছাড়া বাঘের হামলায় ২০০৮ সালে ৩ জন, ২০০৯ সালে ১ জন, ২০১০ সালে ৯ জন ও ২০১১ সালে ৪ জন নিহত হয়েছেন। চলতি ২০১২ সালের জুন পর্যন্ত ২ জন আহত হয়েছেন।
বন বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৮ সাল থেকে চলতি ২০১২ সালের জুন মাস পর্যন্ত ১১টি বাঘ বয়সজনিত কারণে, চোরা শিকারিদের হাতে কিংবা লোকালয়ে প্রবেশের পর গণপিটুনিতে মারা গেছে। একই সময় বাঘের হামলায় ১৪০ জন জেলে, বাওয়ালী, মৌয়াল মারা গেছেন। আহত হয়েছেন ৩২ জন।

বাঘ রক্ষায় পদক্ষেপ
এদিকে বাঘ রক্ষায় সুন্দরবন বিভাগ নানা উদ্যোগ নিয়েছে। স্থানীয় জনগণকে সচেতন করা, লোকালয়ে চলে আসা বাঘকে ট্রাংকুলাইজ করে বনে ফেরত পাঠানো, বাঘ-মানুষ দ্বন্দ্ব কমাতে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও নিয়েছে বন বিভাগ। তারপরও দিন দিন বাঘের সংখ্যা কমছে। এবার বিশ্ব বাঘ দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘সেভ সুন্দরবনস টাইগার ল্যান্ডস্কেপ’ বা ‘বাঘের আবাসস্থল সুন্দরবন বাঁচান’।
এদিকে সুন্দরবনের বাঘ নিয়ে সরকারি পর্যায়ে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো গবেষণা কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়নি। বিভিন্ন সময় বাঘশুমারি হলেও তার পদ্ধতিগত দিক নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।
বাঘবিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘ গড়ে প্রায় ১০-১২ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিচরণ করে এবং সেখান থেকে খাদ্য সংগ্রহ করে। সে হিসেবে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে (৬ হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটার) ৪০০ বাঘ থাকার কথা। ২০০৪ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩ মার্চ পর্যন্ত ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সহায়তায় চালিত বাঘশুমারি অনুযায়ী সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা ৪৪০টি। এর মধ্যে পুরুষ বাঘ ১২১টি, বাঘিনী ২৯৮টি এবং বাঘ শাবকের সংখ্যা ছিল ২১টি।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s