সুন্দরবন রক্ষায় নিধিরাম সর্দার

একে ফরটি সেভেন আর মেশিনগানের মতো আধুনিক মারণাস্ত্রের বিপরীতে এ যুগের জন্য অচল হয়ে পড়া চায়না আর থ্রি নট থ্রি রাইফেলই ভরসা বনরক্ষীদের। ডাকাতের বুলেট প্রুফ নৌকার সঙ্গে বৃথাই পাল্লা দিতে হয় জীর্ণ কাঠের নৌকোয়। গভীর বনে গোলপাতার পলকা ছাউনিতে প্রতিরোধ তো দূরের কথা, বসবাসই দায় হয়ে পড়ে বর্ষা-বাদলে। সব মিলিয়ে, সুন্দরবন রক্ষায় নিয়োজিত বনকর্মীরা যেন ঢাল-তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দার।
বিশ্বের বৃহত্তম এই ম্যানগ্রোভ বনে বনদস্যুর বিরুদ্ধে লড়াই তো দূরের কথা, জীবন বাঁচিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে উঠেছে বনরক্ষীদের। তাই অপর্যাপ্ত সরঞ্জাম আর পুরনো অস্ত্র নিয়েই চলছে নামমাত্র পাহারা, বনরক্ষা কার্যক্রম।ফলে শিকারীদের হাতে হরহামেশা মারা পড়ছে হরিণ, বাঘসহ আরো সব বণ্য প্রাণী। দেদারছে উজাড় হচ্ছে বন। ডাকাতের কবলে পড়ছে জেলে। আর এদের রক্ষার দায়িত্ব যাদের, সব দেখেশুনে হা-পিত্তেস করা যেন তাদের নিত্য নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কখনো সখনো তো আধুনিক অস্ত্রের মুখে ডাকাতদের কাছে বশ্যতাই মানতে হচ্ছে অসহায় বন কর্মকর্তাদের।
বনজীবীদের অভিযোগ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এমন ঢিলে-ঢালা হওয়ায় প্রতিনিয়তই বন চোর ও ডাকাতদের সংখ্যা বাড়ছে সুন্দরবনে। বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের বিভিন্ন স্টেশন ও টহল ফাঁড়ি ঘুরে জানা যায়, বন কর্মকর্তাদের কাছে যে কয়েকটি অস্ত্র আছে এদের মধ্যে সবচেয়ে আধুনিক চায়না রাইফেল। আছে ব্রিটিশ আমলের কয়েকটি থ্রিনটথ্রিও। তবে এসব অস্ত্র কেবল গ্রামের পাশে থাকা স্টেশনগুলোর জন্য। গভীর বনের টহল ফাঁড়িতে কোন অস্ত্রের বরাদ্দ নেই। সেখানে অস্ত্র রাখার মত নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নেই। ফলে সব অনিয়ম দেখেও ‘চুপ থাকাই’ তাদের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়।
এছাড়া ফাঁড়িগুলোর অবকাঠামোগত দিকও খুব নাজুক। ক্ষয়ে যাওয়া টিনের চালের ঘর। গভীর বনের ফাঁড়িগুলো আবার কাঠ ও গোলপাতার তৈরি। বৃষ্টি পড়ার আগেই যেখানে পানি পড়ে। শুয়ে আকাশের চাঁদ দেখা যায়। খাওয়া-দাওয়ার কোন সুব্যবস্থা নেই। নেই চিকিৎসা সুবিধাও। ঝড় বৃষ্টির দিনে পার্শ্ববর্তী গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
একাধিক বন কর্মকর্তা জানান, ডাকাতদের কাছে থাকা একে ফরটি সেভেন, মেশিনগানসহ আধুনিক সব অস্ত্রের কাছে বন কর্মকর্তাদের সনাতন অস্ত্রগুলো কোন কাজেই আসে না। ডাকাতরা ব্যবহার করে বুলেট প্রুফ ট্রলার, যাতে গুলি লাগলেও ফুটো হয়ে পানি ওঠে না।
বিপরীতে বন বিভাগের ব্যবহার করা ট্রলারগুলো যেন ধাক্কা লাগার আগেই ডুবে যায়। আর স্পিডবোট বরাদ্দ থাকে কেবল রেঞ্জ অফিসারদের জন্য। সেগুলোর অধিকাংশই আবার নষ্ট থাকে।
অনেকটা আক্ষেপ করেই বন বিভাগের কৈখালি স্টেশনের  কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, ‘শুধু বন কর্মকর্তাদের দোষই দেখা হয়। কিন্তু আমরা যে কি মানবেতর জীবন যাপন করি সে কথা কেউ ভাবে না। ফাঁড়িগুলো তো গরু বাসেরও উপযোগী না। কিন্তু দায়ি্ত্বের প্রয়োজনে আমাদের ঠিকই থাকতে হয়। বনের গভীরে ডাকাতের অত্যাচার বেশি হলেও নিরস্ত্র থাকায় আমরা কিছু বলতে পারি না।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক বন কর্মকর্তা বাংলানিউজকে বলেন, ‘ডাকাতদের কাছে আমরা এত অসহায় যে, ওরা যদি আমাদের ধরে নিয়ে রান্নার কাজ করে দিতে বলে, অস্ত্রের মুখে তাও আমাদের দিয়ে আসতে হবে। এজন্য ওদের চলাফেরা করতে দেখেও পাশ কাটিয়ে চলে আসতে হয়।’
‘তোমার পথে তুমি যাও, আমার পথে আমি- ওদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা এমন’ যোগ করেন তিনি।
বনের গভীরের ফাঁড়িগুলো থেকে গ্রামে আসার জন্য এ টহল ট্রলারগুলো ছাড়া আলাদা কোন ব্যবস্থাও নেই। ফলে সরকারি মামলায় হাজিরা দেওয়া, ছুটিতে বাড়িতে যাওয়াসহ প্রয়োজনীয় কাজে নানারকম অসুবিধায় পড়তে হয় এখানে অবস্থানরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।
বন বিভাগের এসব স্টেশন ও ফাঁড়িগুলোতে জনবল সংখ্যাও অতি সামান্য। মাত্র ৬-১২ জন জনবল দিয়েই কাজ চলছে দিনের পর দিন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভ্রমরখালি ফাঁড়ির এক মাঝি (বিএম) বাংলানিউজকে বলেন, ডাকাতদের দল থাকে ৩০-৪০ জনের। আমরা কয়েকজন কি তাদেরকে আটকাতে পারি?’
নিরাপত্তাহীনতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তারা (ডাকাত) যদি ফাঁড়ি বা স্টেশন ঘেরাও করে, তাহলে জীবন নিয়ে ফিরতে পারবো না আমরা। এজন্য একরকম মেনেই চলতে হয় ওদের।’
বন বিভাগের এসব দুর্বলতার কথা স্বীকার করে সাতক্ষীরার সহকারী বন কর্মকর্তা তৌফিকুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমাদের প্রধান সমস্যা অবকাঠামোগত দুর্বলতা। অস্ত্র বরাদ্দ থাকলেও দিতে পারছি না নিরাপত্তার কথা ভেবে। কারণ যে স্টেশন বা ফাঁড়িতে অস্ত্র দেওয়া হবে সেখানে অফিস বা ঘরগুলোতে অস্ত্র রাখার মত নিরাপত্তা নেই।
প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মত ট্রলার বা অন্যান্য সরঞ্জামও নেই। তবে খুব শিঘ্রই অবকাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠবে এখানকার বন বিভাগ। এরইমধ্যে কয়েক জায়গায় ইটের ঘর তোলা হয়েছে। অন্যান্য স্থানেও তোলার চেষ্টা চলছে।’
সাতক্ষীরা রেঞ্জের কয়েকটি ফাঁড়িতে অস্ত্র আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অবকাঠামোগত দুর্বলতা দূর করে অস্ত্র সংখ্যাও বাড়ানো হবে।’
নতুন নিয়োগের মাধ্যমে অতি দ্রুত জনবল সংকট মেটানোর চেষ্টাও চলছে বলে জানান তৌফিকুল ইসলাম।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s