Sultana Kamalসংখ্যালঘুদের জমি দখলে মন্ত্রী-এমপিসহ ক্ষমতাবানরা জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল। শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ (আসক) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ করেন। ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীতে সংসদ সদস্য দবিরুল ইসলাম ও তার সমর্থকদের দ্বারা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জমি দখল ও হামলার বিষয়ে তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সুলতানা কামাল বলেন, ‘সরকারের মন্ত্রী-এমপিসহ ক্ষমতাবানরা বিভিন্নভাবে দুর্বল সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখল করছে। সংখ্যালঘু পরিবারের ওপর হামলা চালাচ্ছে।’
বেশিরভাগ জায়গায় জমি দখলের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে বলেও জানান তিনি।
‘সংসদ সদস্য দবিরুল ছাড়া আর কোনো এমপি-মন্ত্রী সংখ্যালঘুদের ভূমি দখলের সঙ্গে জড়িত কি না’- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘সংসদ সদস্য দবির জড়িত থাকার সুষ্পষ্ট প্রমাণ তো আপনারা পেলেন। এ ছাড়া ফরিদপুরে মন্ত্রীর জড়িত থাকার কথাও এসেছে।’
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি কাজল দেবনাথ বলেন, ‘ঠাকুরগাঁও-ফরিদপুর ছাড়া গত কয়েকদিন আগেই দিনাজপুরের পার্বতীপুরে একজন মন্ত্রীর দ্বারা জমি দখল ও হামলার ঘটনা ঘটেছে।’
সাংবাদিকরা ওই মন্ত্রীর নাম জানতে চাইলে ‘প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার’-এর নাম উল্লেখ করেন তিনি।
এ সময় ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী থেকে আসা ভুক্তভোগী জিতেন চন্দ্র সিং তার ভাই ভাকারাম সিংয়ের ওপর সংসদ সদস্য ‘দবিরের ছেলে মাজহারুল ইসলামের নেতৃত্বে হামলার’ বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘তারা জমি দখল করতে এসেছিল। এক পর্যায়ে তারা আমাদের ভাকারামকে পায়ে-পিঠে চাপাতি দিয়ে কোপায়। তাকে ঘিরে ধরে কীভাবে হামলা চালানো হয়েছিল- তা বুঝাতে পারব না।’
ওই হামলার পর তার ছেলে অভিলাল সিং এখন দিল্লি গিয়ে বসবাস করছে বলে জানান জিতেন চন্দ্র সিং।
সংবাদ সম্মেলনে জিতেনের কথা প্রসঙ্গে সুলতানা কামাল বলেন, ‘সবলের অত্যাচারের কারণে দুর্বল ভাবছেন তারা দেশে থাকবেন না, এটা তো আমরা কোনোভাবে মেনে নিতে পারি না।’
অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের হামলা যেন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, ‘এটাতো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে আশা দেখানো সরকারের সময়ে এটা কোনোভাবে প্রত্যাশিত নয়। সংখ্যালঘুদের জমি দখলের যে অবস্থা সারাদেশে চলছে তার বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করছি।’
সংবাদ সম্মেলনে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীর ঘটনায় তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদনের সারাংশ উপস্থাপন করেন ‘অর্পিত সম্পত্তি আইন প্রতিরোধ আন্দোলন’-এর সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী।
জমি দখলকে কেন্দ্র করে গত ১৯ জুন সংসদ সদস্যের ছেলের নেতৃত্বে অন্তত ৩০ জন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী সংখ্যালঘু পরিবারের ওপর হামলা করে বলে জানান তিনি।
সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের হামলায় অকুলচন্দ্র তার পরিবার নিয়ে ভারতে পালিয়ে যায়। আর সন্ত্রাসীদের হামলায় ভাকারাম সিংহসহ ৮-১০ আহত হন, সন্ত্রাসীরা কয়েকজন নারীকেও মারধর করে।’
‘জমি দখল, সহিংস হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা একাধিকবার ঘটলেও পুলিশ ও স্থানীয়রা কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়নি’ বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জমি দখল নিয়ে বিরোধের কারণ ব্যাখ্যা করে সুব্রত চৌধুরী বলেন, “ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সরকার দলীয় সংসদ সদস্য দবিরুল ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যরা বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার পাড়িয়া ইউনিয়নে ‘রনবাগ ইসলাম টি এস্টেট কোম্পানি লিমিটেড’ নামে একটি চা-বাগান গড়ে তুলেছেন। তিনদিক দিয়ে ভারতীয় সীমানাবেষ্টিত দক্ষিণ পাড়িয়া মৌজার পশ্চিমাংশে এই চা বাগানের বেশিরভাগ অংশ পড়েছে।”
তিনি বলেন, ‘চারপাশে ১০৬ একর আয়তনের ওই অংশের মাঝখানে ১০টি হিন্দু পরিবারের প্রায় ৩৫ একর চা বাগান ও আবাদি জমি রয়েছে। এর মধ্যে অকুল চন্দ্র সিংয়ের এক বিঘা জমি অন্যদের জমিতে যাওয়ার পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। করিডোরের মতো এই এক বিঘা জমি দখল হয়ে গেলে সংখ্যালঘু ১০ পরিবারের লোকজন তাদের নিজ জমিতে যাওয়ার আর কোনো পথ পাবেন না। কারণ তাদের জমি ও বাগানের চারপাশ ঘিরে আছে সংসদ সদস্যের চা-বাগান।’
দবিরুলের ছেলে মাজহারুল ইসলাম সংখ্যালঘু পরিবারগুলোকে তাদের জমি সংসদ সদস্যের কাছে বিক্রি করার জন্য চাপ প্রয়োগ করার অভিযোগ ভুক্তভোগীরা করেছেন জানিয়ে সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘সংসদ সদস্যের লোকজনের বাধার কারণে ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের প্রয়াত নেতা হেলকেতু সিংয়ের ছেলে বধুরাম সিং তার ৯৩ নম্বর দাগে অবস্থিত ২৭ শতাংশ জমিতে চাষাবাদ করতে পারেন না। একই মৌজায় ২ নম্বর দাগের অধিকাংশ খাসজমি দখল করে রেখেছে সংসদ সদস্যের পরিবার। ৪ নম্বর দাগে নাগর নদী তীরে শ্মশানে যাওয়ার রাস্তার খাসজমি দখল করে চা বাগান করার চেষ্টাও করেছে সংসদ সদস্যের লোকজন।’
সংখ্যালঘু পরিবারের ওপর হামলার পাঁচ মাস পর গত ২৪ ও ২৫ নভেম্বর বালিয়াডাঙ্গীতে যায় ওই তথ্যানুসন্ধান দল।
এই দলে অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল ও সুব্রত চৌধুরীর সঙ্গে আরও ছিলেন সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট তবারক হোসেইন, এএলআরডি নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, ব্লাস্ট-এর অনারারী নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন এবং দিনাজপুরের সিডিএ নামক সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক শাহ ই মবিন জিননাহ।