Sisu_Nirjaton-special_1২০১৫ সালে শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো ছিল আলোচনার শীর্ষে। কারণ এ বছর দেশে বেশকিছু শিশুকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। হত্যার ঘটনাগুলো সামাজিক যোগাযোগ ও গণমাধ্যমের কল্যাণে খুব দ্রুত মানুষ জানতে পারে। এতে দেশে-বিদেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। খুনিদের আইনের আওতায় আনতে এগিয়ে আসে সাধারণ মানুষও।
২০১৫ সালের ৮ জুলাই সিলেটে শিশু রাজন, ৩ আগস্ট খুলনায় শিশু রাকিব হত্যা এবং ২ অক্টোবর গাইবান্ধায় একজন সংসদ সদস্যের হাতে চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র সৌরভ গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় দেশব্যাপী নিন্দা ও ক্ষোভের ঝড় ওঠে।
বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থার আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য মতে, ২০১৫ সালে শুধুমাত্র হত্যা করা হয়েছে ১৩৩ শিশুকে, আগের বছর যেখানে এ সংখ্যা ছিল ৯০। আসক আরও জানায়, ২০১৫ সালে প্রথম দেড় মাসে হরতাল-অবরোধে সহিংসতায় নিহত হয়েছে ১১ শিশু ও আহত হয় ১২ শিশু। বছরের মাঝামাঝিতে শিশু নির্যাতনের মাত্রা বেড়েছিল। নির্যাতনে মাত্রা ও ধরনে ছিল চরম নিষ্ঠুরতা।
এদিকে বাংলাদেশ পুলিশের হিসাব মতে, ২০১৫ সালে শিশু নির্যাতনের ঘটনায় সারাদেশে এক হাজার ৬১৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলাগুলো করা হয়।
২০১৫ সালের ৮ জুলাই চুরির অপবাদে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ড-সংলগ্ন শেখপাড়ায় নির্যাতন করে হত্যা করা হয় সিলেটের জালালাবাদ থানা এলাকার বাদেয়ালী গ্রামের সবজি-বিক্রেতা শিশু রাজনকে। লাশ গুম করার সময় ধরা পড়েন একজন। পরে পুলিশ বাদী হয়ে জালালাবাদ থানায় মামলা করেন। ফেসবুকে প্রচারের উদ্দেশ্যে নির্যাতনের ভিডিওচিত্র ধারণ করেন নির্যাতনকারীরা।
ঘটনার পরপরই মামলার প্রধান আসামি কামরুল ইসলাম সৌদি আরবে পালিয়ে গেলেও সেখানের বাংলাদেশিদের সহায়তায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। ইন্টারপোলের মাধ্যমে ১৫ অক্টোবর তাকে ফিরিয়ে আনা হয়। তার উপস্থিতিতে মামলার গুরুত্বপূর্ণ ১১ সাক্ষীর পুনরায় সাক্ষ্যগ্রহণের পর একটানা তিন দিন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত ৮ নভেম্বর রায়ের দিন ধার্য করেন। ঐ দিন মামলার প্রধান আসামিসহ চারজনের ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালত।
২০১৫ সালের ৩ আগস্ট বিকেলে খুলনা নগরীর টুটপাড়ায় শরীফ মটরসে কম্প্রেসার মেশিনের নল মলদ্বারে ঢুকিয়ে হাওয়া দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় শিশু রাকিবকে। ঘটনাটি মিডিয়াতে গুরুত্বসহকারে প্রচারিত হলে দেশে-বিদেশে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়।
ঘটনার পরের দিন রাকিবের বাবা মো. নূরুল আলম বাদী হয়ে তিনজনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। আর ঘটনার পরপরই এলাকাবাসী গণপিটুনি দিয়ে ঘাতক মো. শরিফ ও মিন্টু খানকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন। পুলিশ পরে শরিফের মা বিউটি বেগমকে আটক করে।
খুলনা মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) কাজী মোশতাক আহমেদ তদন্ত শেষে ২৫ আগস্ট মামলার তিন আসামিকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করেন। ১১ অক্টোবর থেকে এ মামলায় টানা ১০ কার্যদিবসে ৩৮ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্ত হয়। ১ নভেম্বর উভয় পক্ষের কৌঁসুলিদের শেষ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত ৮ নভেম্বর মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন।
গ্যারেজ মালিক মো. শরিফ এবং তার চাচা মিন্টু খানকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। অপর আসামি বিউটি বেগমকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। ঘটনার মাত্র তিন মাস পাঁচ দিনের মাথায় রায় প্রদান বাংলাদেশে এই প্রথম।
এদিকে, বছরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল জাতীয় দলের ক্রিকেটার শাহাদাত হোসেন কর্তৃক শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনা। গত ৬ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর কালশী থেকে শাহাদাতের গৃহকর্মী মাহফুজা আক্তার হ্যাপিকে (১১) উদ্ধার করে পুলিশ। হ্যাপি পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে শাহাদাত ও তার স্ত্রীর নির্যাতনের কথা বলে। ওই দিন রাতেই মিরপুর মডেল থানায় শাহাদাত দম্পতির বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন সাংবাদিক খন্দকার মোজাম্মেল হক। গত ১৩ সেপ্টেম্বর গৃহকর্মী হ্যাপি ঢাকার সিএমএম আদালতে তার ওপর নির্যাতনের বর্ণনা দেয়।
১৩ অক্টোবর তিন দিনের রিমান্ড শেষে শাহাদাতের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ঢাকা মহানগর হাকিম কাজী কামরুল ইসলাম। এরপর ১২ নভেম্বর আবারও আদালত জামিন না মঞ্জুর করে কারাগারে পাঠায়।
সবশেষে ৮ ডিসেম্বর শাহাদাতকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত জামিন দেন হাইকোর্ট। এর আগে ১ ডিসেম্বর শাহাদাত হোসেনের স্ত্রী জেসমিন জাহান ওরফে নিত্য শাহাদাতের জামিন আবেদন ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত মঞ্জুর করেছেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কামরুল হোসেন মোল্লার আদালত। এ বিষয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের শিশু অধিকার শাখার উপ-পরিচালক গীতা চক্রবর্তী দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘আমাদের অনেক ভালো শিশুবান্ধব আইন আছে। কিন্তু সরকার নিজের অবস্থান থেকে এসব প্রতিরোধে যত তাড়াতাড়ি কাগজপত্র প্রস্তুত করে তত তাড়াতাড়ি মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ হয় না। সরকারের এক একটা উইং একেক কাজ করে থাকে, কিন্তু তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভাবে আইনের প্রয়োগটা মাঠপর্যায়ে যায় না।’
সমাজে নৈতিক অবক্ষয় হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যারা নির্যাতন করছে এবং যারা নির্যাতিত হচ্ছে তাদের মধ্যে সামাজিক শ্রেণী বিন্যাসের পার্থক্য তেমন নেই। তাই যে যার ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারছে, তাকেই নির্যাতন করছে। এক ধরনের হতাশা ও দাম্ভিকতা থেকে এ ধরনের পৈশাচিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে।’
শিশু নির্যাতন নিয়ন্ত্রণে নতুন আইন নয় বরং বর্তমান আইনের-ই সুষ্ঠু প্রয়োগ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে যে শিশু আইন-২০১৩ রয়েছে তার প্রয়োগ বাস্তবায়ন করতে হবে। এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যবহারিক কিছু আইন দরকার এ মুহূর্তে।’
গত ১৭ আগস্ট পুরান ঢাকার হাজারীবাগের গণকটুলী এলাকায় মোবাইল চুরির অভিযোগ তুলে মো. রাজা (১৬) নামে এক শিশুকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। মুমূর্ষু অবস্থায় রাজাকে বিকাল ৫টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হাজারীবাগ থানার ছাত্রলীগের সভাপতি মো. আরজুর বিরুদ্ধে এই হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উঠে।
সে সময় রাজার স্বজনরা জানান, মো. আরজু তার বাসায় মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ চুরির অভিযোগে রাজাকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। ঘটনার পরদিন ১৮ আগস্ট ভোরে গ্রেফতার করতে গেলে হাজারীবাগে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন অভিযুক্ত হাজারীবাগ থানা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. আরজু মিয়া।
বছরের শেষের দিকে, গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের এমপি মো. মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন ২ অক্টোবর ভোরে গাড়িতে করে বামনডাঙ্গা থেকে সুন্দরগঞ্জ আসার সময় ব্র্যাক মোড়ের পশ্চিম পাশের গোপালচরণ এলাকায় পৌঁছলে এক ব্যক্তিকে তার গাড়িতে উঠতে বলেন। কিন্তু ওই ব্যক্তি ভয়ে গাড়িতে না উঠে দৌড় দিলে এমপি লিটন পর পর দুই রাউন্ড গুলি ছুড়লে শিশু শাহাদাত হোসেন সৌরভের (৯) দু’পায়ে গুলি লাগে।
ঘটনার পরদিনে ৩ অক্টোবর রাতে এমপি লিটনের বিরুদ্ধে সৌরভের বাবা মো. সাজু মিয়া বাদী হয়ে সুন্দরগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করলে আত্মগোপনে যান এমপি লিটন। সৌরভ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে ২৪ দিন চিকিৎসা নিয়ে গত ২৬ অক্টোবর বাড়ি ফেরে।
১২ অক্টোবর হাইকোর্টে আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইলে হাইকোর্ট জামিন আবেদন খারিজ করে তাকে গাইবান্ধার মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে ১৮ অক্টোবরের মধ্যে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন।
১৪ অক্টোবর সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত এমপি লিটনের আত্মসমর্পণের নির্দেশ স্থগিত করলে ওই দিন রাত ১০টার দিকে রাজধানীর উত্তরায় তার এক আত্মীয়ের বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
৮ নভেম্বর অন্তর্বর্তীকালীন জামিনে মুক্তি পেয়ে ২৪ নভেম্বর আবারও স্থায়ী জামিনের আবেদন করেন। কিন্তু বিচারক স্থায়ী জামিন নামঞ্জুর করে ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন জামিনের সময় বৃদ্ধি করলে পুনরায় ৮ ডিসেম্বর জামিন আবেদন করে ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত জামিনের সময় বৃদ্ধি করেন।
সমাজে অপরাধ প্রবণতা ঢুকে যাওয়ায় এ ধরনের নির্মম ঘটনাগুলো ঘটছে বলে মনে করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সেলিনা ফাতেমা বিনতে শহীদ।
দ্য রিপোর্টকে তিনি বলেন, ‘যারা এই ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে তারা কোথাও থেকে দেখে, শুনে অথবা জেনে অন্যের ওপর প্রয়োগ করছে। মানুষের ম্যুরাল ডেভেলপমেন্টের ঘাটতি থাকলে এ ধরনের ঘটনা ঘটায়। পরিবার, পরিবেশ ও সমাজের ভেতরে সঠিক শিক্ষা না থাকার ফলে এমনটি হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরিবার থেকে একটি সন্তান যখন একটি বাজে কাজ করলে তাকে যদি পুরস্কৃত করা হয়। যেমন— ছোটবেলা কেউ ছোট একটা চুরি করল তাকে যদি বলা হয় ভালো করেছ। সে কিন্তু ঐ শিক্ষাটাই পাবে।’
একটি ঘটনা মানুষের ছোটবেলা থেকেই মানসিক প্রভাব ফেলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এখানে মিডিয়ারও একটা ভূমিকার রয়েছে। মিডিয়াতে বিভিন্ন ক্রাইম দেখানো। বিভিন্ন সিরিয়াল বা অনেক মুভিতে নায়ককে ভিলেনের চরিত্রে দেখানো হচ্ছে। সেগুলো শিশুদের মানসিক প্রভাব ফেলে। শিশুটি বড় হলেও তার ভেতরে এই প্রভাবটা থেকে যায়।’
এ ছাড়া অন্যান্য সংস্কৃতিগুলো আমাদের ওপর প্রভাব পড়ে। তাই মিডিয়াতে সব ঘটনা দেখানোর ব্যাপারটিও নিয়ন্ত্রণে আনা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
এই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘প্রত্যেকটি পরিবারে সামাজিক ডেভেলপমেন্টে কী করণীয় এ নিয়ে আরও বেশি লেখালেখি হতে পারে। সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানীরা একসাথে বাবা-মাকে অনৈতিকতার ব্যাপারে সচেতন করা যেতে পারে। এ ছাড়া স্কুলগুলোতেও এ বিষয়ে আলাদা ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে পারে।’

দ্য রিপোর্ট