tobaco‘গেল বছর ইরি আর এ বছর আমন ধান আবাদ করি হামরা তো ন্যায্য দাম পাইনো না। দুইটা ফসলোত উঠিল না আবাদের খরচা। কিষষি ছাড়া হামার টাকা পাইসা ধরার কোনো আস্থা নাই। হামরাতো শ্যাষ হয়া গেইনো। বাধ্য হয়া এবার তাংকু আবাদোত ধচ্ছি। খচ্চা-বচ্ছা দিয়া দোনে (৩০ শতক) কম করি ১০/১২ হাজার টাকা নাভ থাইকবে। তাংকু ইঠে ওই ভুইয়োত পাটা আবাদ করমো। সেটেও ১৪/১৫ হাজার টাকা নাভ থাইকবে।’
এভাবেই বলছিলেন, ধানের ন্যায্য দাম না পেয়ে বাধ্য হয়ে তামাক চাষের দিকে ঝুকে পড়া নীলফামারী সদর উপজেলার লক্ষ্মীচাপ ইউনিয়নের কৃষক শ্রী হরেন্দ্র নাথ রায়, নলিনী মোহন রায় ও সন্তোষ কুমার।
শুধু হরেন্দ্র, নলিনী আর সন্তোষ কুমাররাই নয়, মানব শরীরের জন্য ক্ষতিকর জেনেও নিজেদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তামাক চাষে ঝুকে পড়ছে নীলফামারীর কৃষকরা। গত মৌসুমে বোরো আর এবারে আমনের লোকসান পুষিয়ে নিতে লাভজনক ফসল তামাককেই বেছে নিয়েছেন তারা। এখন ভালো ফলন ফলাতে সার প্রয়োগ, নিড়ানি আর তামাকের চারা পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন এখানকার কৃষক।
এই যখন দেশে উত্তরাঞ্চলের বিচিত্র কৃষিচিত্রের অবস্থা তখন ২০১৬ সালের শুরু থেকেই তামাক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলছে সভা, সেমিনার আর বিতর্ক প্রতিযোগিতা। সব মহলের আলোচ্য বিষয় এই একটাই, যে করেই হোক, তামাক নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে।
কারণ, গ্লোবাল ইয়থ টোবাকো সার্ভে ২০১৩ অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী স্কুলের ছেলে-মেয়েদের ৬ দশমিক ৯ শতাংশই তামাক ব্যবহার করছে। আর বাংলাদেশে প্রতিবছর তামাকজনিত রোগে মারা যায় ৫৭ হাজার মানুষ, পঙ্গুত্ব বরণ করে আরও ৩ লাখ ৮২ হাজার। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা এমন তথ্য দিয়েছিল সেই ২০০৪ সালে।
কিন্তু ক্ষতিকর এই তামাকের নিয়ন্ত্রণ কীভাবে সম্ভব? যখন খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দিকে এগিয়ে যাওয়া একটি দেশের কৃষদের কাছে তামাকই হয়ে উঠেছে লাভজনক ফসল।
এদিকে, সরকার তামাক কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে নিচ্ছে কর, যা জমা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। এই খাতে অর্জিত বিশাল অংকের টাকা, দেশের বিভিন্ন কাজে ব্যবহার হচ্ছে। তাই একদিকে যেমন তামাক ব্যবসা বৈধতা পাচ্ছে, আবার স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে এসব পণ্যের ব্যবহারে নিরুৎসাহিতও করছে সরকার। জাতির জন্য এটি একটি কঠিন সমস্যা।
এরই মধ্যে শহর থেকে শুরু করে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে মাদক। দেশব্যাপী মাদকের বিস্তার এতটাই যে সরকার তথা পুলিশ প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণেরও বাইরে। তাই পুলিশের আইজি একেএম শহিদুল হক বলেছেন, ‘সারা দেশে যেভাবে তামাক ছড়িয়ে পড়েছে তাতে শুধু আইন করে এর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, প্রয়োজন সবার মধ্যে সচেতনতা। শুধু জনসচেতনতাই পারে তামাক নিয়ন্ত্রণ করতে। তাই মাদকের কুফল সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করে তুলতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কমিউনিটি পুলিশিং কাজ করে যাচ্ছে।’
আর তথ্য সচিব মরতুজা আহমদ একটু ভিন্নভাবে বলেছেন, ‘ধূমপান ও মাদকের টাকা ভূতে যোগায়। আমরা এই ভূতকে তাড়াতে চাই।’

সচিবের ভূত তাড়ানোর পথকে সহজ করতে তথ্যমন্ত্রী মোক্ষম উপায় বাতলে দিয়েছেন। আর তা হলো, ‘তামাক নিয়ন্ত্রণে দেশে এর উৎপাদনই বন্ধ করে দিতে হবে। কারণ, একদিকে তামাক পণ্যের ব্যবসাকে বৈধতা দেয়া এবং অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়টিকে ‘বিব্রতকর এবং দ্বিচারিতা’ বলে মনে করেন তথ্যমন্ত্রী।

তাই ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইনের আধীন তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন ও প্রচার নিষিদ্ধ এবং পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ন্ত্রণে করণীয় শীর্ষক এক কর্মশালায়- তামাক ও তামাকজাত পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি তামাক সেবনকেও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দিয়েছেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।

তিনি বলেছেন, ‘যেহেতু আইনে তামাক সেবনকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, সেহেতু আমার এ প্রস্তাব অবশ্যই বিবেচনাযোগ্য।’

শুধু তাই নয়, সরকারের ভেতর থেকে, এমন কী সংসদ থেকেও দেশে তামাক চাষ নিষিদ্ধ করার দাবি উঠা উচিৎ বলে মত প্রকাশ করেন তথ্যমন্ত্রী ইনু।
এদিকে, খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেছেন, ‘যারা তামাকের পক্ষে, তারা তো খুব শক্তিশালী। তবে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যেখানে তামাকের বিপক্ষে সেখানে প্রতিপক্ষ যতই শক্তিশালী হোক না কেন তামাক নিয়ন্ত্রণ করা অবশ্যই সম্ভব।’
তারপরও সংসদে তামাকের বিরুদ্ধে কথা বলা সাংসদ অ্যাডভোকেট ফজিলাতুন নেসা বাপ্পি তামাক নিয়ন্ত্রণে পারিবারিক সচেতনতাকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন। পাশাপাশি তিনি আগামী মার্চ মাসের মধ্যে তামাকের মোড়ক আইনটি কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন।

ফজিলাতুন নেসা বাপ্পি বলেছেন, ‘জনস্বাস্থ্য রক্ষায় তামাক কোম্পানির আগ্রাসন রুখতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। ১৬ কোটি মানুষ হওয়ার পরও খাদ্য নিরাপত্তায় সরকারের সফলতা ধরে রাখতে এখন অস্বাস্থ্যকর ও ক্ষতিকর খাদ্য নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে হবে। তাই তামাক ও তামাজাতদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে সরকারকে দ্রুত কার্কর পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন এ সংসদ সদস্য।’

এদিকে, বাংলাদেশ ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) স্বাক্ষরকারী প্রথম দেশ হওয়া সত্ত্বেও বিড়ি-সিগারেটসহ তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে ছবিসহ সতর্কবাণী সংযুক্ত করা থেকে পিছিয়ে আছে। যা আন্তর্জাতিক অঙ্গণে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে। মূলত বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলো দেশের তরুণ সমাজকে নেশায় ধাবিত করতে ছবিসহ সতর্কবাণী দেয়ার বিষয়ে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। তামাক কোম্পানির এসব প্রতারণামূলক কার্যক্রম ও ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমকে আরো কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোট, জাতীয় যক্ষ্মা নিরোধ সমিতি (নাটাব) এবং ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডাব্লিউবিবি) ট্রাস্ট।

জনস্ হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথ ও দি ইনস্টিটিউশন ফর গ্লোবাল টোব্যাকো কন্ট্রোল (আইজিটিসি) প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, তামাক কোম্পানিগুলো সিগারেটের মোড়কে উদ্দেশ্যমূলকভাবে অপ্রয়োজনীয় শব্দ ব্যবহার করছে, যা তামাক নিয়ন্ত্রণের সংশ্লিষ্ট আইনটিকে করছে প্রশ্নবিদ্ধ। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন অনুয়ায়ী সিগারেটের মোড়কের ৩০ শতাংশ জায়গাজুড়ে সতর্কবাণী মুদ্রণের বিধান আছে, যা ৫৪ শতাংশ মোড়কের ক্ষেত্রেই মানা হচ্ছে না। এমনকি সিগারেটের মোড়ককেই কোম্পানিগুলো বিজ্ঞাপন হিসেবে উপস্থাপন করছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোটের সমন্বয়কারী সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘বাংলাদেশের চাইতে ৩ বছর পরে এফসিটিসি র‌্যাটিফাই এবং ৬ বছর পর ২০১১ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন করলেও তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে ছবিসহ সতর্কবাণী যুক্ত করার ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে গেছে পার্শ্ববর্তী দেশ নেপাল। বর্তমানে সব তামাকের মোড়কে ৯০ ভাগ স্থানজুড়ে স্বাস্থ্য সতর্কবাণী দেয় নেপাল। অথচ বাংলাদেশ আইন প্রণয়নের ১১ বছর পর যখন আইন অনুযায়ী ১৯ মার্চ থেকে তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে ছবিসহ স্বাস্থ্য সতর্কবাণী যুক্ত করতে যাচ্ছে, তখন মৃত্যুর ফেরিওয়ালা ধূর্ত তামাক কোম্পানিগুলো প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছে।

জাতীয় যক্ষ্মা নিরোধ সমিতির (নাটাব) সহ-সভাপতি ও প্রবীন রাজনীতিক মোজাফফর হোসেন পল্টু বলেছেন, ‘তামাক নিয়ন্ত্রণ শুধু আন্তর্জাতিক নয়, এটি সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারও। তাই প্রধানমন্ত্রী তামাক নিয়ন্ত্রণে কঠোর, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমও দায়িত্ব নিয়ে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের বিধিমালা প্রণয়ন করেছেন। কিন্তু সরকারের চলমান তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে প্রতিহত করতে নানাভাবে ষড়যন্ত্র করছে কোম্পানিগুলো। এখন সরকারের উচিৎ কোম্পানিগুলোর ষড়যন্ত্রকে এমনভাবে রুখে দেয়া, যেন কোনোভাবেই রাষ্ট্রের আইন অমান্য করার দুঃসাহস তারা না পায়।’

উল্লেখ্য, যেসব তামাক কোম্পানি বাংলাদেশে তামাকের মোড়কে ছবিসহ স্বাস্থ্য সতর্কবাণী সংযুক্ত করা প্রতিহত করতে ষড়যন্ত্র করছে, সেসব কোম্পানি অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নেপালসহ পৃথিবীর প্রায় ৮০টির অধিক দেশে তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে ছবিসহ সতর্কবাণী দিয়ে যাচ্ছে।

বাংলামেইল২৪ডটকম