Bapex (quik rentel)কুইক রেন্টাল বিদ্যু প্রকল্পে বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। আর এ ক্ষতির মূলে রয়েছে কানাডার তেল-গ্যাস কোম্পানি নাইকো। তাই কোম্পানিটির কাছেই আদায় করা হবে ক্ষতিপূরণ। আন্তর্জাতিক আদালতে নাইকোর মামলার শুনানিতে এ দাবি জানানো হবে বলে জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।
পেট্রোবাংলার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বাংলামেইলকে বলেন, ‘নাইকোর গাফিলতিতে বিস্ফোরণ ঘটে টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রটি ধ্বংস হয়েছে। এতে সুলভ জ্বালানি হিসেবে পরিচিত গ্যাসের সঙ্কট দেখা দেয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ ঘাটতি মেটাতে বাংলাদেশ ব্যয়বহুল ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণে বাধ্য হয়, যেগুলো তেলচালিত। এতে সরকারকে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। যেহেতু নাইকো এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী তাই তাকেই একটা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।’ আদালতে এমন যুক্তিই তুলে ধরা হবে বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা।
আগামী ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউট (ইকসিড) এই শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ে প্রতিনিধি দল এজন্যে প্যারিসে যাবেন।
নসরুল হামিদ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আদালতে মামালার শুনানিতে অতীতে গাফিলতি হয়েছে। এবার নতুন আইনজীবী প্যানেলে জোরালোভাবে দেশের স্বার্থ তুলে ধরবে।’ এর আগে গত বছরের ২ থেকে ৭ নভেম্বর ইকসিডে নাইকো মামলার শুনানি চলে।
সুনামগঞ্জের টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে কূপ খননকালে ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি ও ২৪ জুন দু’দফায় প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে। এতে আগুনে ওই ক্ষেত্রের বিপুল পরিমাণ গ্যাস পুড়ে যায়।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিস্ফোরণের প্রভাব সস্পর্কে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) একজন কর্মকর্তা বাংলামেইলকে বলেন, ‘টেংরাটিলা বিস্ফোরণের দু’বছরের মাথায় বিদ্যুতে সরকারে ভর্তুকির পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে।’
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৬-২০০৭ সালে যেখানে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকি ছিল ৩শ কোটি টাকা, তা ২০০৮-২০০৯ সালে তিনগুণেরও বেশি বেড়ে ১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। এ সময় থেকেই রেন্টাল কুইক-রেন্টাল প্রকল্প চালু হয়। গত অর্থবছর (২০১৪-২০১৫) ভর্তুকির পরিমাণ  ৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর প্রধান কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে গেছে।
বিস্ফোরণের আগে সুলভ জ্বালানি গ্যাস দ্বারা বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল মোট উৎপাদনের ৮০ শতাংশ। বিস্ফোরণের পর তা কমে গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৬৩ শতাংশ। একই সঙ্গে তেলভিত্তিক বিদ্যুতের উৎপাদন বেড়ে হয় ৩০ শতাংশ, যা টেংরাটিলা দুর্ঘটনার আগে ৫ শতাংশের কম ছিল।
গ্যাসে এক ইউনিট (কিলোওয়াট-ঘণ্টা) বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ এক থেকে দেড় টাকা আর তেলে এ খরচ হয় ৮ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত।
সূত্র জানিয়েছে, শুনানিতে উপস্থাপনের জন্য পিডিবি’র কাছে গ্যাস, তেল ও কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয়ের একটি তুলনামূলক চিত্র চেয়েছে পেট্রোবাংলা। এছাড় কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলোর কারণে উৎপাদন ব্যয় কত বেড়েছে, একই সঙ্গে এ কারণে সরকারে ভর্তুকি বৃদ্ধির তথ্যও চাওয়া হয়েছে।
গত মহাজোট সরকারের সময় নাইকো মামলার আইনজীবীর দায়িত্ব থেকে ড. কামাল হোসেনকে সরিয়ে আইনজীবী তৌফিক নেওয়াজকে (সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির স্বামী) নিয়োগ দেয়া হয়। আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে এই আইনজীবীর যোগ্যতা নিয়ে সে সময়ই প্রশ্ন ওঠে। জোট সরকারে এই আমলে তৌফিককে অব্যাহতি দেয়া হয়। মামলার বিষয়টি দেখভালের দায়িত্বে নিয়োজিত পেট্রোবাংলার সাবেক সচিব ইমাম হোসেনকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে।
নতুন করে মামলা পরিচালনার জন্য ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ল’ ফার্ম ফলে হগ এলএলপিকে (ওয়াশিংটন ডিসি) নিয়োগ দেয়া হয়। আর সার্বিক আইনি সহায়তার জন্য সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ইমতিয়াজ উদ্দিন আহমদ আসিফকে দায়িত্ব দিয়েছে সরকার।
উল্লেখ্য, ১৯৯৯ সালে নাইকো টেংরাটিলা, ফেনী ও কামতা গ্যাসক্ষেত্রের ইজারা পায়। অভিযোগ আছে, এ ইজারা দেয়ার প্রক্রিয়াতেও দুর্নীতি হয়। ‘প্রান্তিক’ (বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন সম্ভব নয়) দেখিয়ে এ গ্যাসক্ষেত্রগুলো ইজারা দেয়া হয়। যদিও গ্যাসক্ষেত্রগুলো সম্ভাবনাময় ছিল। সে সময় জ্বালানি সচিব ছিলেন বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক ই ইলাহী চৌধুরী।
২০০৩ সালে টেংরাটিলায় কূপ খননের জন্য বাপেক্স ও নাইকোর মধ্যে চুক্তি হয়। কূপ খননকালে ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি ও ২৪ জুন দুই দফায় প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে। এতে অগ্নিকাণ্ডে বিপুল পরিমাণ গ্যাস পুড়ে যায়। আশপাশের পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ধামাচাপা দিতে নাইকোর কাছ থেকে দামি গাড়ি নেয়ার অভিযোগে সে সময় পদ ছাড়তে হয় তৎকালীন বিএনপি সরকারের জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসেনকে। ২০০৫ সালে গাড়ি কেলেঙ্কারির ঘটনা এদেশের পত্রিকায় ফাঁস হলেও সে সময় নাইকো অভিযোগটি স্বীকার করেনি। তবে পরে কানাডার একটি আদালতে মন্ত্রীকে ঘুষ দেয়ার কথা স্বীকার করে কোম্পানিটির কর্তারা। মোশাররফ হোসেনকে দামি গাড়ি ছাড়াও ভ্রমণব্যয় বাবদ ৫ হাজার ডলার ঘুষ দেয় কোম্পানিটি। এজন্য ২০১১ সালে কানাডার আদালত নাইকোকে ৯৭ লাখ ৫০ হাজার ৭৯৪ মার্কিন ডলার জরিমানা করে।
দুর্ঘটনার কারণে নাইকোর কাছে ৭৪৬ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে পেট্রোবাংলা। এ বিষয়ে সরকার ও নাইকোর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চলে। কিন্তু তা ব্যর্থ হলে ২০০৮ সালে ঢাকার দ্বিতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে ক্ষতিপূরণের দাবিতে মামলা করে পেট্রোবাংলা। এ মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে। মামলায় গতি আনতে সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কামরুল হক সিদ্দিকীকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ক্ষতিপূরণ দাবিতে নাইকোর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে একটি মামলা দায়ের করে পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। নাইকোর সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিলের দাবিও ছিল তাদের। হাইকোর্ট চুক্তি বাতিলের কোনো নির্দেশনা না দিলেও টেংরাটিলার ক্ষতিপূরণ আদায় না হওয়া পর্যন্ত ফেনী ক্ষেত্রের গ্যাস বিক্রি বাবদ নাইকোর পাওনা পরিশোধে নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং কোম্পানিটির বাংলাদেশে পরিচালিত সব ধরনের ব্যাংক হিসাব সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। পরে অবশ্য নাইকোর ব্যাংক হিসাব খুলে দেয়া হয়।
এ অবস্থায় নাইকো আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে ২০১০ সালের ১২ এপ্রিল এবং ১৬ জুন দুটি মামলা দায়ের করে। মামলা দুটি হলো- গ্যাসের বকেয়া বিল আদায় সংক্রান্ত (আরবি/১০/১৮) মামলা এবং অন্যটি টেংরাটিলা বিস্ফোরণের ক্ষতিপূরণ থেকে অব্যাহতি চেয়ে মামলা (আরবি/১০/১১)। এরমধ্যে ২০১৪ বছরের ১১ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় মামলার একটি রায় ঘোষণা করে ইকসিড, যাতে নাইকোর আটকে রাখা গ্যাস বিল সুদসহ পরিশোধ করতে বলা হয়। ফেনীর গ্যাসবিল বাবদ নাইকোর আসল পাওনা প্রায় ২১৬ কোটি টাকা (২০০৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০১০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সরবরাহ করা গ্যাসের দাম)। একই সঙ্গে এ পাওনার ওপর ২০০৭ সালের ১৪ মে থেকে পরবর্তী সময়ের জন্য নির্ধারিত হারে সুদ পরিশোধ করতে হবে।
বাংলামেইল২৪ডটকম