traffic-special-Rizvyদিন দিন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে নগরীর যানজট সমস্যা। রাস্তায় নামলে কখন গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে এর নিশ্চয়তা নেই। নিত্য দুর্ভোগ রাস্তায়-রাস্তায়। অপেক্ষা ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এদিকে যানজট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পগুলো যথাসময়ে শেষ হচ্ছে না। এতে দুর্ভোগ আরও বাড়ছে।
রাজধানী ঘুরে দেখা যায়, গুলিস্তান, পল্টন, শাহবাগ, কাকরাইল, মালিবাগ, মগবাজার, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, কলাবাগান, ধানমণ্ডি, ফার্মগেট, তেজগাঁও, কল্যাণপুর, মিরপুর, গুলশান, বনানী, উত্তরাসহ বেশির ভাগ এলাকায় প্রতিদিনই যানজট লেগেই থাকে। এমনকি শুক্রবার জুমার নামাজের আগে যানজট না থাকলেও দুপুরের পর থেকে তা বৃদ্ধি পেতে থাকে। নিজ গন্তব্য স্থানে পৌঁছাতে নগরবাসীদের অন্তত দেড় থেকে দুই ঘণ্টা আগে রওনা দিতে হয়। সেটা সকাল হোক আর রাত হোক।
বেগুনবাড়ী এলাকার আজমেরী হোটেলের সামনে দিয়ে হাতিরঝিলে প্রবেশের রাস্তাটির একেবারেই বেহালদশা। এখানে প্রচুর পরিমাণে যানবাহনের যাতায়াত। পুরো রাস্তায় রয়েছে অসংখ্য খানাখন্দ। ফলে গাড়ি চলাচলে সমস্যা হয়। ধানমণ্ডি-পান্থপথ সংযোগ সড়কের শমরিতা হাসপাতাল লিমিটেডের সামনে থেকে স্টাফ কোয়ার্টার পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশ অবৈধ দোকানে পরিপূর্ণ।
অপরদিকে মগবাজার ফ্লাইওভার এখনো নির্মাণাধীন। এ কারণে সাতরাস্তা থেকে মগবাজার মোড় পর্যন্ত সড়কে যানজট সব সময়ই প্রকট আকারে থাকছে।
প্রতিদিন (ছুটির দিন ছাড়া) সকাল ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অফিসে যাওয়ার জন্য বের হয়ে চাকরিজীবীদের হন্ত-দন্ত হয়ে ছুটতে দেখা যায়। কারণ অফিসে যাওয়ার জন্য তারা যে সকল যাত্রীবাহী পরিবহনে করে রওনা দিয়েছিলেন, যানজটের জন্য তা মাঝ রাস্তাতেই আটকে থাকে। একই দৃশ্য দেখা যায় বিকেল ৫টা থেকে রাত ৯টার সময়।
রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের (আইইবি) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ আয়োজিত এক সেমিনারে গত ১৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘রাজধানীতে যানজটের ফলে ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষের দৈনিক ২ কোটি ৪০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ায় দিনে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। এতে মহানগরীর ৭৩ ভাগ মানুষের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
রমনা এলাকা দিয়ে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বাস থেকে নেমে তাড়াহুড়া করে ছুটছিলেন জাহাঙ্গীর হোসেন। হাতে খাবারের হটপট। দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, ‘৯টার মধ্যে ফার্মগেটে অফিস পৌঁছাতে হবে। প্রায়ই যানজটের জন্য বাস থেকে নেমে এভাবে শাহবাগ অথবা রমনা দিয়ে হেঁটে রওনা দিই। বাসে বসে থাকলে বসদের গরম কথা মিস হবে না।’
যানজট নিরসনে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা শহরে প্রতিদিন ৩ লাখ ২৫ হাজার যান্ত্রিক যান এবং ৭ লাখ রিকশা চলাচল করে। এসব রিকশার মধ্যে ৬ লাখ ২০ হাজারই অবৈধ। চলাচলকারী যানবাহনের সংখ্যা ব্যবহৃত রাস্তার ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অনেক গুণ বেশি। প্রতিদিন ৩১৭টি নতুন যান্ত্রিক যান রাস্তায় নামছে। ঢাকা মহানগরীর রাস্তায় প্রায় ৩০ প্রকার যান চলাচল করে থাকে। রাস্তায় দ্রুতগতি ও ধীরগতিসম্পন্ন যানবাহন এবং একই সঙ্গে যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল করার ফলে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।
মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মোবাশ্বের হোসেন দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘বিকেলে অফিস শেষে হেঁটেই বাড়িতে চলে যাই। কারণ বাসে গেলে ধানমণ্ডি পৌঁছাতে ২-৩ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। আর হেঁটে রওনা দিলে এর আগেই পৌঁছাতে পারি।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল (ট্রাফিক) জোনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার মো. আবু ইউছুফ দ্য রিপোর্টকে বলেন, “রাস্তায় পড়ে থাকা ময়লার স্তূপ এবং রাস্তার মধ্যে খানাখন্দ যানজট সৃষ্টির অন্যতম কারণ। সিটি করপোরেশন থেকে সড়কের বিভিন্ন স্থানে ময়লার কন্টেইনার স্থাপন করলে সড়কের পরিবেশ ভালো থাকবে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দ মেরামতের জন্য সিটি করপোরেশন কর্তৃক ‘কুইক সার্ভিস টিম’ রাখা দরকার। শুধু তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকাতেই নয়, একই ধরনের সমস্যা রাজধানীজুড়েই।”
তিনি আরও বলেন, ‘সাতরাস্তা-মগবাজার সড়ক ব্যবহারকারী ছোট গাড়িকে অপেক্ষাকৃত অর্ধেক সময়ে গন্তব্যে যেতে ট্রাকস্ট্যান্ড-কারওয়ানবাজার রুট ব্যবহার করার পরামর্শ দিচ্ছি। মগবাজার মালিবাগ রাস্তায় গমনকারী ছাড়া সকল গন্তব্যে যেতে এ রুট ব্যবহার করুন। এ রুট দিয়ে কম সময়ে বেইলী রোড, কাকরাইল, পল্টন, বাংলামোটর, শাহবাগসহ পশ্চিমের যে কোনো গন্তব্যে যাওয়া যায়। তেজগাঁও সাতরাস্তা ট্রাকস্ট্যান্ড পার্কিং মুক্ত হওয়ার পর থেকে ট্রাকস্ট্যান্ড ও কারওয়ানবাজার পর্যাপ্ত ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এতে ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে এটিএন নিউজ বা প্রথম আলো পত্রিকার সামনে দিয়ে হোটেল সোনারগাঁও পৌঁছানো সম্ভব।’
‘এমন গাড়িও পেয়েছি যারা কারওয়ানবাজার, শাহবাগ, পাস্থপথ যাবেন কিন্তু অজ্ঞতার জন্য ট্রাকস্ট্যান্ড-কারওয়ানবাজার সড়ক ব্যবহার করছেন না’ বলেও মন্তব্য করেন সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. আবু ইউছুফ।
দ্য রিপোর্ট