mashrafiমাশরাফির নেতৃত্বে বাংলাদেশ পাচ্ছে একের পর এক সাফল্য। এতে চমকে যাচ্ছে ক্রিকেট দুনিয়া। কিন্তু বাংলাদেশ দলে তার নেতৃত্বের ভারও এসেছে চমক নিয়েই। গত ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগে ব্যাটিংয়ে ফর্মে থাকা মুশফিকুর রহিমের ওপর চাপ কমাতে অধিনায়কত্বের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। দায়িত্ব বর্তায় অভিজ্ঞ পেসার মাশরাফি বিন মুর্তজার কাঁধে। দায়িত্ব পেয়ে বিশ্বকাপেই চমক দেখান তিনি। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে তোলেন অধিনায়ক মাশরাফি। এগিয়ে যাওয়ার শুরুটা তখন থেকেই। এরপর তো নিজেকে নিয়ে যান অনন্য উচ্চতায়।
এশিয়া কাপে দাপুটে জয়ে ফাইনালে উঠেছে বাংলাদেশ। এই জয়ে ভারত মিডিয়া অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজাকে যে বিশ্লেষণ করেছেন, তা চোখে পড়ারই মতো। মাশরাফিকে তারা কেমন চোখে দেখছেন, তা ফুটে উঠেছে এই বিশ্লেষণে। ভারতের জনপ্রিয় দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা লিখেছে,  ‘মাশরাফি মুর্তজাকে বাংলাদেশ ক্রিকেট মহল আর দেশজ মিডিয়া যেমন প্রশ্নাতীত আনুগত্যের সঙ্গে দেখে, সে ভাবে রানাতুঙ্গাকেও শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট দেখে কি না সন্দেহ! বা সৌরভকে ভারত!’
বিশ্লেষণে আরো বলা হয়, মাশরাফি শুধু টিমের অধিনায়কই নন, দলের পিতা। বলা যেতে পারে বাংলাদেশ ক্রিকেটের মাইক ব্রিয়ারলি। তার বলের গতি এখন এক শ তিরিশের আশপাশে ঘোরাফেরা করে। ব্যাটেও নিয়মিত প্রচুর রান করে দেন, এমন নয়। তবু মাশরাফিকে বাদ দিয়ে টিম নামানো যায় না। কারণ গোটা দলের রিমোট সব সময় তারই হাতে। তিনি প্লেয়িং আবার এক অর্থে নন-প্লেয়িং ক্যাপ্টেনও। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে আজ অবধি কেউ এমন লোকগাথার নায়ক হয়ে উঠতে পারেননি। তাকে ঘিরে অতিমানবীয় রূপকথার প্রলেপে বুধবার আর একপ্রস্ত আবির লাগিয়ে দিলেন মাশরাফি। কার্যত ম্যাচের কঠিনতম সময়ে পরপর দুটো বাউন্ডারি মারলেন বিপক্ষের ভয়ংকরতম মোহাম্মদ আমিরকে।
বিশ্লেষণের মন্তব্যে বলা হয়, শহীদ আফ্রিদির দেশের জন্য যদি আজকের (বুধবারের) রাত কলঙ্কের হয়, বাংলাদেশের জন্য মায়াবী ইতিহাস! একটা টিম যাদের টি-টোয়েন্টি র‌্যাঙ্কিং বিশ্বে দশ নম্বর। যারা পরপর দুটো দেশকে কখনো এই ফরমেটে হারাতে পারেনি। যাদের টি-টোয়েন্টি খেলা মানে সমর্থকেরাও জানে বেশি আশা করে লাভ নেই। তারা কী চমকপ্রদভাবে না এশিয়া কাপের ফাইনালে! বাড়ি পাঠিয়ে দিল মালিঙ্গার শ্রীলঙ্কা আর আফ্রিদির পাকিস্তানকে। পড়ে থাকলেন শুধু রোববারের ধোনিরা।
মন্তব্যে বলা হয়, ফাইনাল বাকি রয়েছে তো কী? এই রকম সংঘাতের তো একটা আবেগ আছে। মাহমুদউল্লাহর শটটা শেষ ওভারে ডিপ মিড উইকেট বাউন্ডারিতে অদৃশ্য হয়েছে কী হয়নি, উচ্ছ্বসিত গোটা বাংলাদেশ টিম মাঠে ঢুকে একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। বড় ফাইনাল জিতলে যেমন হয়। এ দিন শূন্য রানে আউট হয়ে নিজের অধিনায়কত্বকে চূড়ান্ত সংকটে নিয়ে ফেলা আফ্রিদি তখন নতমস্তকে দাঁড়িয়ে আর তার সামনেই কিনা উৎসব শুরু!
বিশ্লেষণে বলা হয়, ম্যাচ ঘোরানো শট মাশরাফির। আঠারোতম ওভারে তার শেষ অস্ত্র মোহাম্মদ আমিরকে নিয়ে এসেছিলেন পাক অধিনায়ক। তার তো এই একটাই ঘোড়া। তিনি টপ স্কোরার সৌম্য সরকারকে ফিরিয়েছেন। বাংলাদেশ স্ট্র্যাটেজি তখন অবশ্যই আমিরকে সাবধানে খেলে শেষ দুই ওভারে ঝুঁকি নেওয়া। ১৮ বলে ২৬ করতে হবে। অনেক সুযোগ। ঠিক এই সময় গোটা বাংলাদেশের হৃদয় খানখান করে সাকিব আউট হয়ে গেলেন। তার বোধ হয় সাময়িক ব্রেন ফ্রিজ হয়ে গিয়েছিল। নইলে জীবিত অথবা মৃত কোনো ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ আমিরকে এই সময় স্কুপ করে!
মাশরাফি ঠিক এই সময় আবির্ভূত হলেন মহাকাব্যিক চরিত্র হিসেবে। পাকিস্তানের সঙ্গে তার বোলিং রেকর্ড খুব সাদামাটা। ৭ ম্যাচে মাত্র ২ উইকেট। কিন্তু আজ তো এশিয়া কাপ সেমিফাইনাল। আজ বড় ম্যাচ। খুকুদের খেলা নয়। পরপর দুটো বল এরপর অবিস্মরণীয় হয়ে থাকল। একটা আমিরকে ড্রাইভ মারলেন। একটা ফাইন লেগ দিয়ে চালিয়ে দিলেন। দুই বল ৮ রান এবং রূপকথায় সেই তার নতুন অধিষ্ঠান!