narir dokkhota cover.jpgবিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে অর্ধেক তার নর – কিন্তু বাংলাদেশের বিনোদন জগতে এর প্রতিফলন কতোটুকু? চলচ্চিত্রে এখনো নারীর ক্ষমতায়ন হয়নি বলে মনে করেন চলচ্চিত্র র্নিমাতা নার্গিস আক্তার। তিনি বললেন,“স্বাধীনতার ৪৪ বছরেও আমাদের চলচ্চিত্রে নারীর ক্ষমতায়ন হয়নি। আমার নিজের প্রোডাকশন ও আমি নিজেই নির্মাতা বলেই ১৫ বছর ধরেই এই শিল্পে টিকে আছি। তবে এই কাজটা অনেক বেশি কষ্টসাধ্য বলেই অনেকেই আসে কিন্তু তারা আবার হারিয়েও যায়। এক্ষেত্রে পরিবারের সহযোগিতা খুবই কাম্য। সত্যি বলতে নারীর ক্ষমতায়ন হলো প্রথমে নিজের ক্ষমতায়ন, তারপরে সমাজের এবং সবশেষে সার্বিক ক্ষমতায়ন। নিজের ক্ষমতায়নের জায়গাটাই আমাদের নারীরা তৈরি করতে পারে না। আমাদের অনেক নারী নির্মাতা শিক্ষিত কিন্তু নির্মাণের ওপর যথেষ্ট পড়াশোনা করে আসেননি। দীর্ঘদিন অভিনয়ের অভিজ্ঞতার কারনে নির্মাণে কাজ করছেন। তাই নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে একজন নারীকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ নিয়ে সেই কাজের দক্ষতা অজর্নের পরে সেই কাজ করা উচিত।”
অন্যদিকে ঢাকাই সিনেমায় নায়িকার তুলনায় নায়কের আধিপত্য বেশি বলেই মনে করেন ঢাকাই সিনেমার অভিনেত্রী বিপাশা কবির। তিনি বললেন,“ সিনেমাশিল্পে আমাদের নারীদের প্রাধান্য এখনো অনেক কম। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরুষদের প্রাধান্যই বেশি থাকে। সত্যি বলতে আমাদের পুরো সিনেমাশিল্পটাই নায়ক র্নিভর।বেশিরভাগ সিনেমাতেই একজন নায়িকা শুধুমাত্র সহযোগি শিল্পী হিসেবেই থাকে বলা যায়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই আমরা বৈষম্যের স্বীকার হচ্ছি। যদিও এই বিষয়টি অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। আমাদের শিল্পে হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন মহিলা র্নিমাতা ও প্রযোজক আছেন। তাই অভিনয়, পরিচালনা ছাড়াও সকল ক্ষেত্রে আমাদের নারীদেরকে পুরুষদের মতো সমান অধিকার দিয়ে কাজ করার সুযোগ করে দেওয়া উচিত। এছাড়াও সিনেমার গল্পে নায়ক ও নায়িকার প্রাধান্য সম পরিমানে দেয়া উচিত বলে আমি মনে করি। তবে এটাও ঠিক যে পর্রিবতন হচ্ছে। কিন্তু যতেটুকু হওয়া প্রযোজন ছিলো সেই পরিমান পর্রিবতন এখনো হয়নি।”
তবে নারীর ক্ষমতায়নের জায়গায় আমাদের গণমাধ্যম বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে বলে বিশ্বাস করেন টিভি অভিনেত্রী ও উপস্থাপিকা দীপা খন্দকার। তিনি বললেন, “মিডিয়ায় নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার ব্যাপারে না বলে বরং আমরা কতোদূর অগ্রসর হয়েছি সেই ব্যাপারে অভিমত দিতে আমি বেশি ভালোবাসি। আমি প্রায় সময় শুটিং শেষে নিজের গাড়িতে করেই গভীর রাতে যখন বাসায় ফিরে আসি। তখন প্রায়শই দেখি রাস্তায় মেয়েরা কাজ শেষে গণপরিবহনে বাসায় ফিরছে, যা আজ থেকে একযুগ আগে চিন্তা করাই যেতো না। আর আমাদের মিডিয়াতে মেয়েরা যথেষ্ট ভালো অবস্থানেই রয়েছে। কোনো ক্ষেত্রে মেয়েরা কোনো নেতিবাচক বিষয়ের সম্মুখীন হলে সেক্ষেত্রে মেয়েদের দোষেই এমনটা তাদের সাথে হচ্ছে বলে আমার মনে হয়। হয়তো কিছু মেয়ে খারাপ কিছুর সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে অন্য মেয়েদের উপর এর প্রভাব পড়ছে। আমি প্রায় ১৭ বছর ধরে মিডিয়ায় কাজ করছি। কাজ করতে গিয়ে কখনোই আমি এখানে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগিনি। নারীর উন্নতির দিক থেকে মিডিয়ায় যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে।”
কিন্তু এ বিষয়ে ছোট পর্দার প্রতিষ্ঠিত নির্মাতা ও অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনের মত একেবারেই ভিন্ন। তিনি বললেন,“একটা সময় ছিলো যখন কোট করে ‘নারী র্নিমাতা’ বলা হতো। কিন্তু এখন শুধু ‘র্নিমাতা’ বলেই সম্বোধন করা হয়। মিডিয়ায় আমরা যথেষ্ট ভালো অবস্থানে রয়েছি এটা ঠিক। কিন্তু যে বেসিক সম্যস্যাটা রয়েছে তা হলো, শুটিং স্পটে টানা চার-পাঁচদিন কাজ করার সময় প্রথমদিকে কাজের ক্ষেত্রে কলাকুশলীসহ সবার কাজের যেমন গতি থাকে পরবর্তীতে ক্লান্তির কারণে সেই গতি কিছুটা কমে যায়। তবে ইউনিটের ক্রুদের মধ্যে বোধ হয় বিশেষ করে লাইটের ক্রু, প্রোডাকশন বয়ের মধ্যে একটি জিনিস কাজ করে – ম্যাডাম তো আর বকুনী দিবে না কিংবা বেশি রাত অবধি কাজও করবে না, নারী র্নিমাতা তো! আমার কাজের ক্ষেত্রে আমি এমনটি অনুভব করেছি। এছাড়াও আউটডোর শুটিংয়ের সময় সেলফি তোলাকে কেন্দ্র করে অনেক সময়ই অভিনেত্রী ও র্নিমাতা বেশ ঝামেলার মধ্যে পড়ে যাই। আমার এমন ধরনের অভিজ্ঞতাও হয়েছে।”
তবে নারীর ক্ষমতায়ন নয় বরং নারীদের দক্ষ সংগঠক হয়ে ওঠার উপরই বেশি জোর দিলেন অভিনেত্রী ও র্নিদেশক নূনা আফরোজ। তিনি বললেন,“মঞ্চে নারীর ক্ষমতায়ন শব্দটি ব্যবহার না করে আমি মঞ্চের সংগঠক শব্দটি ব্যবহার করতে চাই। সেদিক থেকে নারীর ক্ষমতায়ন নয় বরং সংগঠক হিসেবে নারী সে অর্থে দাড়াচ্ছে না। হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন নায়িকা ও র্নিদেশক থাকলেও মঞ্চের অন্যান্য শাখাগুলোতে যেমন আলোকসজ্জা, পোশাক ডিজাইন ইত্যাদি সেক্টরে নারীর উপস্থিতি একেবারেই নেই। এক্ষেত্রে আমাদের অগ্রজদের উচিত সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে যার ভেতরে প্রতিভার আগুন রয়েছে সেই আগুন জ্বালিয়ে দেয়া। এখানে কাজটাকে কুক্ষিগত করে রাখলে তো লাভ হবে না। আমরা এখনো কিন্তু সেভাবে তৈরি হইনি, যেখানে দাড়িয়ে আমরা নারীরা নিজেরাই সৃজনশীল কাজগুলো সহজে করতে পারবো। এক্ষেত্রে অবশ্যই সহযোগিতা দরকার। কাজের জায়গা থেকে একজন ছেলের চেয়ে একজন মেয়েকে বেশি যোগ্য হতে হবে। যোগ্য হবে না অথচ তার পথটি সুগম হয়ে যাবে, অন্যের সহযোগিতায় এগিয়ে যাবে। আমি মোটেও এমন ধরনের সহযোগিতায় বিশ্বাসী না।”