nangeliক্যালেন্ডারের পাতা বেয়ে হাজির আরো একটা আন্তর্জাতিক নারী দিবস। নারীর সমানাধিকারের দুনিয়াজোড়া প্রতিশ্রুতি আর উদ্‌যাপনের মাঝে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে নানগেলির নাম। প্রতি বছর মহা সমারোহে পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস | কিন্তু নিরুচ্চারিত থেকে যায় নাঙ্গেলির কথা | শতাধিক বছর আগে অমানবিক রীতির প্রতিবাদে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন তিনি | নারীত্বের অন্যতম প্রতীক নিজের স্তনযুগল কেটে ফেলেছিলেন এই যুবতী | কেরলের চেরথালা জনপদে |
আজ থেকে ১৫০ বছর আগে ব্রিটিশ ভারতের কেরলে ছিল ত্রাভাঙ্কোর রাজবংশের শাসন | তাদের অধীনে প্রতিপালিত হত এক জঘন্য সমাজিক রীতি | তা হল‚ নিম্নবর্গীয় মহিলারা প্রকাশ্যে ঢাকতে পারবেন না দেহের ঊর্ধ্বাংশ | উচ্চবর্গের মহিলারা অবশ্য এই রীতির বাইরে ছিলেন |
নিম্নবর্গের যে মহিলারা এই রীতি পালন করতে রাজি হতেন না‚ তাঁদের কপালে জুটত নির্মম অত্যাচার | এর বিরুদ্ধে ব্রিটিশ শাসনে তৈরি হয় আন্দোলন | এই রীতি বন্ধ করার তীব্র দাবি ওঠে | কিন্তু তাতেও রীতি পাল্টাতে রাজি হল না রাজবংশ | বরং বসানো হল কর | নির্মম এবং অমানবিক এই ব্রেস্ট ট্যাক্সের স্থানীয় নাম ছিল ‘ মুলাক্করম ‘ | জারি হল নতুন নিয়ম ‚ নিম্নবর্গের মহিলারা স্তন প্রকাশ্যে আবৃত করতে চাইলে দিতে হবে এই কর | বেশিরভাগ দরিদ্র পরিবারের মহিলা এই কর দিতে পারতেন না | ফলে লজ্জার মাথা খেয়ে খোলা রাখতে হত দেহের ঊর্ধ্বাংশ |
এই রীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন নাঙ্গেলি | কেরলের উপকূলীয় জনপদ চেরথালার বাসিন্দা এই যুবতী জানিয়ে দেন তিনি দেহের ঊর্ধ্বাংশ খোলা রাখবেন না | এবং কোনও করও দেবেন না | তাঁর বাড়ির দরজায় মাঝে মাঝেই হানা দিত রাজপরিবারের কর আদায়কারী |
সেরকমই একদিন নাঙ্গেলির দরজায় দাঁড়িয়েছিল কর আদায়কারী | মেটাতে হবে বকেয়া কর | নয়তো তাঁকে বন্দি করা হবে | শান্ত স্বরে তাদের অপেক্ষা করতে বললেন নাঙ্গেলি | ঘরের মেঝেয় রাখলেন কলাপাতা | তার পাশে প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রার্থনায় বসলেন | তারপর ধারাল অস্ত্রের কোপে কেটে ফেললেন তাঁর দুই স্তন | সেই আঘাত সহ্য করতে পারেননি সদ্য তিরিশের কোঠায় পা রাখা এই বিবাহিত যুবতী | অতিরিক্ত রক্তপাতে প্রাণ হারান তিনি |
আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগের এই নারী অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে যান। যার সামনে ঝুঁকতে হয় খোদ রাজাকেও। নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে নারীদের সঙ্গে হয়ে চলা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি।
চেরথালা গ্রামের যেখানে বাড়ি ছিল নাঙ্গেলির‚ তার নাম এখন হয়েছে ‘ মুলচিপা রাম্বু‘ | অর্থাৎ ‘মেয়েদের স্তনের দেশ‘ | কিন্তু নাঙ্গেলির আত্ম বলিদান শুধু থেকে গেছে লোককথায় | তাঁর স্মরণে নেওয়া হয়নি কোনও পদক্ষেপ | নাঙ্গেলি নিঃসন্তান ছিলেন | বিস্মৃতপ্রায় এই বীরাঙ্গনার বংশধররা আজও আছেন চেরথালার আশেপাশে | তাঁরাও মুখে মুখে শুনেছেন নাঙ্গেলির এই বলিদান | তাঁদের প্রার্থনা‚ নাঙ্গেলির প্রতিবাদ যেন বিফলে না যায় | কারণ তাঁর প্রতিবাদ-আন্দোলন শুধু নারীত্বের বিরুদ্ধে নয় | ছিল মানবিকতার বিরুদ্ধে | তাই‚ মানবাধিকার‚ সম্ভ্রম রক্ষার প্রহরী হিসেবে মনে রাখা হোক নাঙ্গেলিকে‚ যিনি নাকি নিজেই ছিলেন নারী দিবসের মূর্ত প্রতীক |