abdul hamidনানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে দেশে আজ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেও মহান স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরেও অর্থনৈতিক মুক্তি আসেনি বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ। একই সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নে প্রকৌশলীসহ সকলকে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
সোমবার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় সমাবর্তনে সভাপতির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ও রাষ্টপতি আব্দুল হামিদ এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘ইতোমধ্যে আমাদের স্বাধীনতার পঁয়তাল্লিশ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক মুক্তির যে লক্ষ্য ছিল তা আজ আমরা পুরোপুরি অর্জন করতে পারিনি। এর বহুবিধ কারণও রয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে আমাদের গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক পথ রুদ্ধ হয়। বন্ধ হয় মানুষের বাক, মতামত ও মুক্তচিন্তার স্বাধীনতা। নানা চড়াই উৎরায় পেরিয়ে দেশে আজ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত।’
‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীকে সামনে রেখে তথ্য প্রযুক্তি নির্ভার একটি জ্ঞানভিত্তিক সুখী সমৃদ্ধ দেশ গঠনে রূপকল্প ২০২১ ঘোষণা করেছেন। এ রূপকল্প বাস্তবায়নে আমাদের নিরলস চেষ্টা চালাতে হবে। আজকের শিক্ষিত তরুণরাই এ কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।’ বলেন আব্দুল হামিদ।
চুয়েটের আচার্য আব্দুল হামিদ বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি অপার সম্ভাবনার দেশ। এদেশে রয়েছে বিপুল মানবসম্পদ, উর্বর কৃষিভূমি এবং সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক সম্পদ। জনবহুল এ দেশকে সমৃদ্ধিশালী করতে হলে প্রয়োজনে পরিকল্পিত উপায়ে বিদ্যামান সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার। প্রকৌশলীগণ উন্নয়নের কারিগর। তাদের মেধা, মনন ও চিন্তাশীল চেতনা থেকে বেরিয়ে আসে টেকসই উন্নয়নের রূপরেখা। তাই প্রকৌশলীদের চিন্তা ও চেতনায় থাকবে দূরদৃষ্টির সুস্পষ্ট প্রতিফলন।’
তিনি বলেন, ‘আগামী ২০৫০ সালে ২১০০ সালে বাংলাদেশের উন্নয়ন কেমন হওয়া উচিত বা বাংলাদেশের অবস্থান কোন স্তরে পৌঁছাবে তা বিবেচনায় রেখেই উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিকেও যথাযতভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্বায়নের এই যুগে প্রতিযোগিতায় ঠিকে থাকতে আমাদের জ্ঞান ও দক্ষতাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নতি করতে হবে।’
‘মনে রাখতে হবে, আমরা আজ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের নাগরিক। আমাদের আত্মমর্যাদা সমুন্নত রাখতে অর্থনৈতিকবাবে স্বাবলম্বী হতে হবে। আমরা আশা করি, আজকের নীবন প্রকৌশলীরা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে উপলব্ধি করবে, তাদের সৃজনশীল চিন্তা ও লব্ধ জ্ঞান এ লক্ষ্যে কাজে লাগাবে।’- যোগ করেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ।
নবীন প্রকৌশলীদের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে জাতি গঠনের শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান ; যেখানে মেধা বিকাশের সবপথ উন্মুক্ত থাকে। কেবল পুঁথিগত বিদ্যা নয়, দেশ বিদেশের সর্বশেষ তথ্য সমৃদ্ধ শিক্ষা, গবেষণা এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যাতে শিক্ষার্থীরা সম্পৃক্ত হতে পাওে তার দ্বার উন্মোচন করবে বিশ্ববিদ্যালয়। প্রকৌশল শিক্ষা যদিও হাতে কলমে শিক্ষা, তা সত্ত্বেও সৃজনশীলতার প্রচুর সুযোগ রয়েছে। প্রকৌশলীদের জ্ঞানের ভিত্তি সুদৃঢ় করতে যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম এবং উন্নত পাঠনদানের ব্যবস্থা থাকতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরিতে ছাত্র-শিক্ষের মাঝে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকা আবশ্যক। শিক্ষকদের হতে হবে স্নেহপ্রবণ ও অভিভাবকতুল্য। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মহান উদ্দেশ্যে বাস্তবায়নে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে এবং একটি জ্ঞান ভিত্তিক সমাজ বির্নিমাণে রাখবে এটাই সকলের প্রত্যাশা।’
ডিগ্রীধারীদের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘সেবা, সততা, নিষ্ঠা ও দেশপ্রেম দিয়ে এ সনদের মান সমুজ্জ্বল রাখতে হবে। তোমাদের এ অর্জনে দেশের মানুষের অনেক অবদান রয়েছে। নিজেদের মেধা, মনন ও কর্মের মাধ্যমে তা পরিশোধ করবে। কর্মক্ষেত্রে পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকনা কেন, মাতৃভূমি এবং দেশের জনগণের কথা কখনো ভুলবে না।’
সম্প্রতি চুয়েটে সিভিল অ্যান্ড ওয়াটার রিসোর্সেস ইঞ্জিনিয়ারিং এবং মেকাট্রনিক্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ চালু হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানিয়ে  রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে পানি সম্পদ রক্ষা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি, রোবটিক্স, ন্যানোটেকনোলজিসহ নতুন নতুন গবেষণায় এ বিভাগ দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছি।’
সমাবর্তন বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুর। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান, চুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রফিকুল আলম।
সমাবর্তন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চুয়েটের পুরকৌশল অনুষদের ডিন ড. মো. হজরত আলী, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন ড. আশুতোষ সাহা, যন্ত্রকৌশল অনুষদের ডিন ড. মো. মাহবুবুল আলম, তড়িৎ ও কম্পিউটার কৌশল অনুষদের ডিন ড. মাহমুদ আব্দুল মতিন ভূঁইয়া, স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন ড. মোস্তাফা কামাল ও রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. ফারুক-উজ-জামান চৌধুরী।
এবারের সমাবর্তনে ডিগ্রি প্রদান করা হয় মোট ১ হাজার ৬০৩ জনকে। এর মধ্যে স্নাতক রয়েছেন ১ হাজার ৫৬৪ জন, মাস্টার্স ৩২ জন, পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমাধারী চারজন এবং পিএইচডিধারী তিনজন। কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের জন্য সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি চারজনকে গোল্ড মেডেল প্রদান করেন।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৮ সালে প্রথম এবং ২০১২ সালে দ্বিতীয় সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। চুয়েটের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হিসেবে। শুরুতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টির অধীন কলেজটি পরিচালিত হতো।
১৯৮৬ সালে দেশের চারটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (বিআইটি) রূপান্তর করলে চুয়েটও বিআইটিতে রূপান্তরিত হয়। সর্বশেষ ২০০৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিআইটি, চট্টগ্রামকে প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হয়।