indiaভারতকে হারিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে যেতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের তিন বলে প্রয়োজন তিন রান। ধারাভাষ্যের দায়িত্বে থাকা সুনিল গাভাস্কার সরল মনেই বলে ফেললেন, ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজকে জিততে তিন বলে প্রয়োজন তিন রান।  আবারো ঘুরে ফিরে তিন বল। বাংলাদেশও এ অবস্থায় ছিল। তবে তিন বলে তাদের লাগত মাত্র ২ রান। কিন্তু তারা পারেনি। দেখা যাক ওয়েস্ট ইন্ডিজ কি করে?’
গাভাস্কারের অঘোষিত চ্যালেঞ্জ ২২ গজের ক্রিজে থেকে হয়ত শুনতে পেয়েছিলেন ‘দানব’ আন্দ্রে রাসেল। নয়ত কি ওভাবে ম্যাচ শেষ করেন! আগের বলে ৪ মেরে ব্যবধান ৩ এ নামিয়ে নিয়ে আসায় রাসেল ছিলেন বেশ আত্মবিশ্বাসী। আইপিএল, বিপিএল, বিগ ব্যাশ ও পিএসএল চষে বেড়ানো রাসেলের কাছে তিন বলে তিন রান নেওয়া কিছুই না। কিন্তু কিভাবে ম্যাচটি জেতাবেন সেটাই ছিল বড় প্রশ্ন।
শেষ ওভারে ভারতের অধিনায়ক বল দিয়েছিলেন কোহলিকে। তৃতীয় বলে বাউন্ডারি হজম করা কোহলি স্নায়ুচাপে ভুগছিলেন।  চতুর্থ বল করার আগে ধোনি, নেহরা, কোহলির আলোচনা। কিন্তু কোনো কিছুতেই কাজ হলো না। চতুর্থ বল আন্দ্রে রাসেল ওয়াংখেড়ের গ্যালারিতে পাঠালেন। সঙ্গে সঙ্গে ভারতের পুরো স্টেডিয়ামে শুনশান নিরাবতা।  শচীন টেন্ডুলকার, অনিল কাপুর, মুকেশ ও নিতা আম্বানি, সাক্ষ্মীর চোখে মুখে বিষন্নতা। বোঝাই যাচ্ছিল আকাশ ভেঙে পড়েছে তাদের ওপর!
তাহলে কী এ পরাজয়ের পিছনে ‘অভিশাপ’ ভর করেছিল? অভিশাপ ওই ‘৩ বলের’!  বাংলাদেশ নিশ্চিত জয়ের ম্যাচ হেরেছিল শেষ ৩ বলে। যেখানে ৩ বলে ২ রানের প্রয়োজনে ব্যাটিং করে বাংলাদেশ এক রানও নিতে পারেনি। উল্টো শেষ ৩ বলে ৩ উইকেট হারায় টাইগাররা। তবে ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচে এরকম কোনো চিত্রনাট্য রচনা হয়নি। তবে যেটা হয়েছে সেটা বাস্তবতাকেও হার মানাবে। ভারতকে সেমিফাইনালে হারিয়েছে চলতি বিশ্বকাপে একটি ম্যাচ খেলা লেন্ডল সিমন্স। বিশ্বকাপ দলে ছিলেন না সিমন্স।  আন্দ্রে ফ্লেচারের ইনজুরিতে রোববার রাতে ভারতের বিমানে ওঠেন সিমন্স দুটি ফ্লাইট পরিবর্তন করে বুধবার ভারতে পৌঁছান তিনি। একদিন পরই নেমে যান ওয়াংখেড়েতে। বনে যান সেমির রাজা। ফাইনালে ৫১ বলে ৮২ রানের ইনিংস খেলে ভারতকে বিশ্বকাপ থেকে ঘরের টিকেট করে দেন ডানহাতি এ ব্যাটসম্যান। কিন্তু সিমন্সের ইনিংসেও ছিল চরম নাটকীয়তা।  তার খেলা ৫১ বলের ইনিংসের ৩টি বল তাদের জন্যে ম্যাচ উইনিং। কিন্তু  ভারতের জন্যে আজীবন হয়ে থাকবে ‘অভিশপ্ত’।  স্পিনার রবিচন্দ্রন অশ্বিনের করা ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংসের সপ্তম ওভারের পঞ্চম বল মিড অনের উপর দিয়ে মারতে চেয়েছিলেন সিমন্স। কিন্তু ব্যাটের কানায় লেগ বল চলে যায় শর্ট থার্ড ম্যান অঞ্চলে। বুমরাহ সামনে লাফিয়ে ক্যাচটি নিয়ে হৈ-চৈ শুরু করে দেন। পুরো স্টেডিয়ামও তখন টিম ইন্ডিয়ার গর্জনে উত্তাল। কিন্তু আম্পায়ার রিচার্ড কেটেলবারোহ অশ্বিনকে জানান, ‘দুক্ষিত অশ্বিন। তোমার পা বাইরে ছিল, নো বল। ফ্রি হিট পাচ্ছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।’ ব্যক্তিগত ১৮ রানে প্রথমবারের মত বেঁচে যান সিমন্স।
একই ঘটনা ১৫তম ওভারে। এবারের নাটকে শুধু বোলার পরিবর্তন। অশ্বিনের বদলে হার্দিক পান্ডে।  কিন্তু ব্যাটসম্যান সিমন্স ও আম্পায়ার রিচার্ড কেটেলবারোহ ঠিকই ছিলেন। হার্দিকের করা ১৫তম ওভারের শেষ বল (ফুলটস) কভারের ওপর দিয়ে মারতে গিয়ে অশ্বিনের তালুবন্দি হন সিমন্স। ৫০ রানে থাকা সিমন্স ক্যাচ দিয়ে সাজঘরের পথ ধরেন। কিন্তু রিচার্ড কেটেলবারোহ তাকে থামিয়ে দেন। নো বল চেক করার জন্যে তৃতীয় আম্পায়ারের শরণাপন্ন হন মাঠের আম্পায়ার। কি পোড়া কপাল ভারতের! দ্বিতীয়বারের মত ‘অভিশাপের’ শিকার তারা। এবারও নো বলে বেঁচে যান সিমন্স।
নাটকের তখনও বাকি ছিল।  বুমরাহের করা ১৮তম ওভারের চতুর্থ বল ওয়াইড লং অন দিয়ে হাওয়ায় ভাসিয়ে দেন সিমন্স। সীমানার প্রহরীর দায়িত্বে থাকা জাদেজা ওই বল কোনোমতে তালুবন্দি করে বাউন্ডারির ভিতরে ছুঁড়ে দেন। বল মাটিতে পড়ার আগে তালুবন্দি করেন বিরাট কোহলি। আউটের আবেদন করেন কোহলি, টিম ইন্ডিয়া। এবারও মাঠের আম্পায়ার তৃতীয় আম্পায়ারের স্মরণাপন্ন। টিভি রিপ্লেতে দেখা যায় বল ছুঁড়ে দেওয়ার আগেই বাউন্ডারি দঁড়ির বিজ্ঞাপণ বোর্ডে জাদেজার পা আলতা চুমু খায়।  তাতেই সর্বনাশ। মাঠের আম্পায়াররা ছয়ের সংকেত দিতে একটুও ভুল করেননি।
সেমিফাইনালের নায়ক সিমন্সের এমন ৩ ডেলিভারিতে কপাল পুড়ে ভারতের। নিজেদের মাটিতে এভাবে শেষ চার থেকে বিদায় নিতে হবে তা কোনো সময় স্বপ্নেও ভাবেনি তারা। বাংলাদেশের বিপক্ষে ভারত জিতেছিল বাংলাদেশের জন্যে ‘অভিশপ্ত’ হয়ে থাকা শেষ ৩ বলে। এবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তারা হারল ‘অভিশপ্ত’ ৩ বলে।