telivision-nattokar 1st sommelon copy‘এখন নাটক নির্মাণ হচ্ছে বিজ্ঞাপন প্রচারের অজুহাতে৷ শিল্পের মধ্যে বাণিজ্য এসে সঠিক নাটকের মান নষ্ট করে দিচ্ছে৷ নাটক হারিয়ে যাচ্ছে বিজ্ঞাপনের ভিড়ে৷ কারণ আমরা সবকিছুই বাণিজ্যিকভাবে দেখি৷ এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন ভালো নাটক’- বলছিলেন ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। টেলিভিশন নাট্যকার সংঘ নামের নতুন একটি সংগঠনের প্রথম সম্মেলনে তিনি এসব বলেন।
শনিবার (২ এপ্রিল) সকালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সেমিনার কক্ষে অনুষ্ঠিত হয় এ সম্মেলন। এখানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আরও বলেন, ‘এখন নাটকে সবচেয়ে বেশি সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে এর ভাষা ও সংলাপ৷ একই নাটকে অনেক ভাষার ব্যবহার নাটকের মানকে উন্নত করতে পারে না৷’ তার সঙ্গে সুর মিলিয়ে নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ বলেন, ‘এখন অভিনেতারা সংলাপ নির্মাণ করছেন এবং ভাষাগতও পরিবর্তন হচ্ছে। নাটকে চলে এসেছে প্রমিত ভাষার সংলাপের বদলে আঞ্চলিক ভাষার সংলাপ। আবার এক নাটকে শুধু যে আঞ্চলিক ভাষা ও সংলাপই ব্যবহার হচ্ছে তা নয়, নাটকে একই সঙ্গে বিভিন্ন ভাষার ব্যবহার হচ্ছে।’
এদিনের সম্মেলনে সভাপতি ছিলেন মামুনুর রশীদ৷ শুরুতে তিনি বলেন, ‘নাটক এখন সম্পূর্ণভাবে মার্কেটিং ও পুঁজিবাদীদের হাতে চলে গেছে। আগে মানুষ নাটকের ফাঁকে বিজ্ঞাপন দেখতো। এখন মানুষ বিজ্ঞাপনের মাঝে নাটক দেখে। পৃথিবীর সব দেশেই পুঁজিবাদীদের বিরুদ্ধে গিয়েই নাটক হচ্ছে।’
মামুনুর রশীদ আরও বলেন, ‘নাট্যকারদের নিজেদেরকেই নিজেদের মূল্যায়ন অর্জন করে নিতে হবে৷ নাটক বা অনুষ্ঠানের মান বাড়াতে হবে। মানুষ নাটক দেখে, হয়তো সেটা টিভিতে না-ও হতে পারে। এখন মানুষের হাতে অনেক মাধ্যম হয়েছে নাটক দেখার। সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করলে অবশ্যই ভালো কিছু করা সম্ভব।’
সম্মেলনে নাট্যকার পেশাটি সরকারিভাবে নথিভুক্ত করার দাবি জানান বক্তারা। পাশাপাশি নাট্যকারদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আফজাল হোসেন, মাসুদ আহমেদ, ড. ইনামুল হক, বৃন্দাবন দাস, এজাজ মুন্না প্রমুখ। পুরো অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন নাট্যকার মাসুম রেজা৷ সম্মেলন সাজানো হয় দুটি পর্বে৷ শুরুতে বক্তব্য ও আলোচনা হয়। পরের পর্বে সংগঠনের অবকাঠামোগত দিক ও কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়।

নাট্যকার সংঘের নথিভুক্ত হতে হবে
নাট্যকার সংঘের সম্মেলনে রাষ্ট্রীয় চ্যানেল বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) নাটক নিয়ে নানান নেতিবাচক কথা শোনা যায়। তবে বিটিভির মহাপরিচালক হারুনুর রশীদ বলেন, ‘অনেকের মুখে শুনি, বিটিভির নাটকের জন্য নাট্যকারদের ডাকলে নাট্যকারেরা আসেন না। কিন্তু আমি যখন যাকে ডেকেছি তাকেই পেয়েছি। আসলে ভালো নাটক পেতে হলে ভালো নাট্যকার দরকার। অনেকেই মনে করেন, বিটিভিতে বাজেট কম। কিন্তু আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, বিটিভিতে বাজেটের কোনো সমস্যা নাই। যে কোনো ভালো কাজ বিটিভি গ্রহণ করে।’
বক্তব্যের পর ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিটিভিতে তালিকাভুক্ত হওয়া নাট্যকারদের তালিকায় মামুনুর রশীদের কাছে তুলে দেন বিটিভির মহাপরিচালক হারুনুর রশীদ। পরে বেসরকারি টিভি চ্যানেল বাংলাভিশনের অনুষ্ঠান প্রধান শামীম শাহেদ নাট্যকারদেরকে সহযোগিতা করবেন বলে আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, ‘নাটক এখন হুমকির মুখে। এ নিয়ে চ্যানেল কর্তৃপক্ষও চিন্তিত। তবে এখন থেকে চ্যানেলগুলোতে যেসব নাটক দেখানো হবে সেগুলোর নাট্যকারকে অবশ্যই নাট্যকার সংঘের নথিভুক্ত নাট্যকার হতে হবে।’

নাট্যকারদের প্রস্তাবনা
টেলিভিশন নাট্যকার সংঘের পক্ষ থেকে বেশকিছু প্রস্তাবনা এসেছে। এগুলো হলো- নাট্যকারদের অবস্থান সমুন্নত রাখা, নিজেদের আত্মউন্নয়ন ও স্বার্থ সংরক্ষণ করা, সংঘের অফিস, লাইব্রেরি, ই-লাইব্রেরি ও আর্কাইভ প্রতিষ্ঠা করা, সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের বই প্রকাশ ও সংরক্ষণ করা, নাটক লেখা ও চিত্রনাট্য তৈরির কর্মশালার আয়োজন করা, নাট্যকারদের আর্থিক সাহায্য প্রদান, নাট্যকারদের মরণোত্তর স্মরণসভা ও সম্মাননা প্রদান করা, বার্ষিক আনন্দ ভ্রমণ এবং আন্তঃ যোগাযোগ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা, সামাজিক প্রয়োজনে কর্মসূচি গ্রহণ করা।

নাট্যকার ক্লাব
সম্মেলনে একটি নাট্যকার ক্লাব খোলার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। যে ক্লাবে এসে অন্ততপক্ষে সপ্তাহে দু’দিন নাট্যকাররা তাদের সুবিধা-অসুবিধা ভাগাভাগি করতে পারবে। এ প্রসঙ্গে গিয়াস উদ্দিন সেলিম বলেন, ‘ক্লাব হলে লাইব্রেরি ও দরকার আছে, যেখানে নবীন-প্রবীণের ছবি বা নাটক দেখানো হবে ও নাটকগুলো আর্কাইভ করা থাকবে। এতে করে অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে নাটকের ভালোমন্দ দিকগুলো খুঁজে পাওয়া যাবে।’ নাট্যকারদের একটি নির্দিষ্ট সভা করার জায়গা থাকার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন অংশগ্রহণকারীরা।

টেলিভিশন নাট্যকার সংঘের কমিটি
সম্মেলনে টেলিভিশন নাট্যকার সংঘের ২২ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। নামগুলো পড়ে শোনান অভিনেতা-নির্মাতা আফজাল হোসেন। কমিটির সদস্যরা হলেন : সভাপতি- মাসুম রেজা, সহ-সভাপতি-গিয়াস উদ্দিন সেলিম, চয়নিকা চৌধুরী ও বৃন্দাবন দাস। সাধারণ সম্পাদক-মেজবাহ উদ্দিন সুমন। যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক-শফিকুর রহমান শান্তুনু ও জাকির হোসেন উজ্জ্বল। সাংগঠনিক সম্পাদক-হামেক হাসান নোমান ও আশরাফুল চঞ্চল। অর্থ সম্পাদক-আহসান আলমগীর। প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক-ইফফাত আরেফীন তন্বী। অনুষ্ঠান বিষয়ক সম্পাদক-সাধনা আহম্মেদ। প্রচার সম্পাদক-আজম খান। প্রকাশনা সম্পাদক-রেজাউর রহমান রিজভী। দপ্তর সম্পাদক-স্বাধীন শাহ। গবেষণা সম্পাদক-মহিউদ্দিন আহমেদ। কার্যকরী সদস্য-আজাদ আবুল কালাম, এজাজ মুন্না, শিহাব শাহীন, প্রজ্ঞা নিহারীকা, উৎপল সর্বজ্ঞ ও কচি খন্দকার।
সংগঠনের নবনিযুক্ত সাধারণ সম্পাদক মেজবাহ উদ্দিন সুমন জানান, ১৯৯৮ ও ২০০১ সালেও সম্মেলনের মাধ্যমে নাট্যকাররা একত্রিত হয়েছিলেন। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যে এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। তবে এখন থেকে নিয়মিত সভা ও সেমিনার করে সংগঠনটিকে সচল রাখার প্রতিশ্রুতি দেন তারা। জানা গেছে, ১১ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ৭০ জন নাট্যকার এই সংঘে যোগ দিয়েছেন।