pill-app১৭ বছর বয়স থেকে জন্মবিরতিকরণ পিল খান ক্লেয়ার কোহেন। পিল খুব কার্যকর। তবে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তার স্তন সৌন্দর্য হারাতে থাকে এবং যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যেতে থাকে। এভাবে টানা ১৪ বছর ধরে তিনি পিল খেয়েছেন। ৩২ বছর বয়সী এই ব্রিটিশ নারী প্রায়ই ভাবতেন, ইউকে’র ৩.৫ মিলিয়ন নারীর জন্যে কি আর কোনো ব্যবস্থাই নেই?
বিগত কয়েক মাস ধরে একটি অ্যাপ ব্যবহার করছেন তিনি। জন্মবিরতিকরণের কাজে অ্যাপ ব্যবহার করার বিষয়টি সত্যিই অদ্ভুত শোনায়। কিন্তু এর সঙ্গে পিরিয়ডের একটা গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
সুইজারল্যান্ডের এক ফিজিসিস্ট ড. এলিনা বার্গলান্ড এবং তার স্বামী পোস্টডক্টোরাল রিসার্চার ড. রাউল শেরউইটজল বানিয়েছেন ‘নেচারাল সাইকেল’। ২০১৩ সালে অ্যাপটি বাজারে ছাড়া হয়। গোটা বিশ্বে বর্তমানে ১০ হাজার নারী এটি ব্যবহার করছেন। বিভিন্ন গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, এই অ্যাপটি জন্মবিরতিকরণে পিলের মতোই কাজ করে। কিন্তু নেই কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।
সুইডেনের বিখ্যাত মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট এক গবেষণায় জানায়, অ্যাপটি সে দেশের ৪ হাজার ৫৪ জন নারীকে গর্ভধারণ হতে বাঁচিয়েছে। তারা বছরের পর বছর অ্যাপটির ব্যবহারে গর্ভধারণ থেকে বিরত আছেন।
গত গ্রীষ্মে ব্রিটেনে জন্মবিরতিকরণ পিল তুল দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ক্যাম্পেইনের আয়োজন করে টেলিগ্রাফ ওয়ান্ডার ওম্যান। সেখানে বহু নারী এর পক্ষে মত দেন। ১৬-৪৫ বছর বয়সী ১ হাজার নারীকে প্রশ্ন করা হলে জবাবে তারা জন্মবিরতিকরণ পিলকে আতঙ্কের কারণ বলে মন্তব্য করেছেন। পিল দেহের যে ক্ষতি করে তা নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় থাকেন।
গত বছর জন্মবিরতিকরণ পিল তার ৫৫তম জন্মবার্ষিকী পালন করেছে। গর্ভধারণ থেকে বিরত রাখতে পিল ৯৯ শতাংশ সফল বলে দাবি করা হয়। তবে বাস্তবে তা ৯২ শতাংশ সফলতা অর্জন করেছে। কিন্তু যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়া বা দৈহিক সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন নারীরা। এ ছাড়াও বহু নারীর মাঝে অবসাদ, ওজন বৃদ্ধি, বমি ভাব আসা, স্তনের সজীবতা নষ্ট হওয়া ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়।
নেচারাল সাইকেল এক ধরনের নেচারাল ফ্যামিলি প্ল্যানিং মেথড যা নারীর দেহের তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ করে তার সাইকেল শনাক্ত করে থাকে। এর মাধ্যমে বলা যায়, দিনটিতে কেউ গর্ভবতী হবেন কি হবেন না। ড. এলিনা এটি বানিয়েছিলেন নিজের ব্যবহারের জন্যে। খুব স্পর্শকাতর কোনো কাজ নেই এর। বাজারে অন্যান্য অ্যাপ রয়েছে। তবে ওগুলো মূলত পিরিয়ড ট্র্যাকার।
বছরে ৬০ ইউরো খরচ পড়বে ‘ন্যাচারাল সাইকেল’-এর সুবিধা নিতে। খুব সহজ এর ব্যবহার। প্রতিদিন সকালে দেহের তাপমাত্রা নিয়ে অ্যাপটিতে লগ ইন করতে হবে। এর পেছনের বিজ্ঞানটা অতি সহজ। ডিম্বোস্ফোটনের পর প্রোজেস্টেরন হরমোন নারীর দেহের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে ০.৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো। অ্যাপের ক্যালেন্ডারে লাল রং দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দিনগুলো চিহ্নিত করে দেওয়া হয়। আর সবুজ রংয়ে বোঝানো হয় নিরাপত্তা। দিনটি লাল না সবুজ হবে তা তাপমাত্রা পরীক্ষা করে ৯৯.৯৫ শতাংশ নিশ্চিত না হয়ে অ্যাপটি কোনো ফলাফল দেবে না। যদি সন্দেহ থেকেই যায়, তবে ফলাফল হবে লাল।
যে কেউ অ্যাপটি ব্যবহার করতে পারবেন। যদি কারো অনিয়মিত পরিয়ড আর পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম থাকে, তবে লাল চিহ্নিত দিন বেশি আসবে। অ্যাপটি বাজারে আসার পর থেকে এবং ব্যবহারের পর একজন মাত্র নারী সবুজ চিহ্নিত দিনেও গর্ভধারণ করেছিলেন।
ক্লেয়ার কোহেন জানান, কোনো নারী এটি ব্যবহার শুরু করার পর থেকে এর ওপর না নির্ভর করে আর থাকতে পারবেন না। জন্মবিরতিকরণ পিলের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার হাত থেকে বাঁচতে এর চেয়ে সুন্দর পন্থা আর হতে পারে না বলে মনে করে তিনি।
বার্টস সেক্সুয়াল হেলথ সেন্টারের বিশেষজ্ঞ অ্যানি ম্যাকগ্রেগর জানান, কোনো নারী অ্যাপটির ব্যবহারে যদি গর্ভধারণ থেকে নিরাপদ থাকতে পারেন, তবে সেখান কোনো সমস্যা নেই। বরং পিলের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার হাত থেকে রেহাই মিললো। তবে যে শুক্রাণু প্রবেশ করে তা গর্ভে ৭ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। কনডম ছাড়া যৌনতা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তখন বোঝা যায় না, ওই দিনটিতেই ডিম্বোস্ফোটন ঘটবে, নাকি ওই মাসিক চক্রে ঘটবে? যদি ডিম্বোস্ফোটন আগেই ঘটে যায়, তবে বিপদ হতে পারে।
ডিম্বোস্ফোটন ঘটে যাওয়ার পর অ্যাপটির ব্যবহার কার্যকর হবে ভালোমতো। আবার এ ঘটনা নিয়মবহির্ভুত হয়ে ঘটলে শুক্রাণু দেহে থেকেই যাচ্ছে। তা ছাড়া হরমোনগত পরিবর্তনে দেহের তাপমাত্রা বদলাতে পারে। এমনিতেও দেহের তাপমাত্রা এদিক-ওদিক হতে পারে। আবার তাপমাত্রা পরিমাপের পদ্ধতি সঠিক না হলেও ভুল ফলাফল আসতে পারে।
তবে বার্গলান্ডের বানানো অ্যাপটি সত্যিই নারীদের ব্যাপক কাজে দিচ্ছে। তারা লাল চিহ্নিত দিনেই গর্ভধারণ করেছিলেন। তার আগে টানা ১৮ মাস ব্যবহার করে কোনো উল্টো রেজাল্ট পাননি। তা ছাড়া পিল ছেড়ে অন্তত নিজ দেহের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার ঘটনা অনেক বড় পাওয়া।
সূত্র : টেলিগ্রাফ

Advertisements