mashrafiআন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে ঘরোয়া ক্রিকেট সব জায়গায়ই সাফল্যের ছাপ মাশরাফি বিন মর্তুজার। বাংলাদেশের অধিনায়কদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাফল্য দেখিয়েছেন তিনি। অথচ ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগে বেশিরভাগ ক্লাবই মাশরাফিকে দলে নিতে আগ্রয় দেখায়নি। শেষ পর্যন্ত কলাবাগান ক্রীড়া চক্র দলে ভিড়িয়েছে এই তারকাকে। এতে মাশরাফি মোটেও হতাশ নন, বরং কলাবাগান নিয়েই খুশি তিনি।
মিরপুর একাডেমি মাঠে এখন প্রতিটি সকালেই বসে ক্রিকেটারদের মেলা। সকাল থেকেই পর্যায়ক্রমে চলতে থাকে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলোর অনুশীলন। রোববার সকালে অনুশীলন শেষে মাঠেই গোল হয়ে বসলেন কলাবাগান ক্রীড়া চক্রের ক্রিকেটাররা। ব্যাট-বলের ঠুকঠাক শেষে তখন আলোচনা পর্ব। বক্তার নাম মাশরাফি বিন মুর্তজা।
দূর থেকে কথাগুলো শোনা ভার। তবে ভাষাটা অনুমান করে নিতে সমস্যা হয় না একটুও। অনুপ্রেরণাদায়ী অধিনায়ক শোনাচ্ছিলেন নিশ্চয়ই অনুপ্রেরণাদায়ক কথাই।
দলের গড়ন আর শক্তিতে কলাবাগান মাঝারি। তবে একটা জায়গায় তারা টেক্কা দিতে পারে সব দলকে। তাদের আছে একজন মাশরাফি! তিনি যে দলে থাকেন, সেই দল টিম স্পিরিট দিয়েই আড়াল করে দেয় অনেক ঘাটতি, জয় করে অনেক কিছু। এখানেও ব্যতিক্রম নয়। দুদিন হলো নতুন দলের সঙ্গে অনুশীলন করছেন মাশরাফি, শুরু হয়ে গেছে টিম স্পিরিটের পাঠ।
অনুপ্রাণিত মাশরাফি নিজেও। বাড়তি অনুপ্রেরণার রসদ খুঁজে পেয়েছেন ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের প্লেয়ার্স ড্রাফটে। গত দেড় বছরে নিজেকে যে উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তাতে ঘরোয়া ক্রিকেটেও তাকে নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে যাওয়ার কথা। হয়েছে উল্টো। ‘আইকন’ ও ‘এ প্লাস’ গ্রেডের ক্রিকেটারদের দল বাছাইয়ে ১২ ক্লাবের প্রথম ১০টিই ডাকেনি মাশরাফিকে। শেষ পর্যন্ত লটারিতে ১১ নম্বরে থাকা কলাবাগান নিয়েছে তাকে।
ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে মাশরাফির জন্য এটি খুব সুখকর হওয়ার কথা নয়; হয়ওনি। প্লেয়ার্স ড্রাফটের সময় পরিবার নিয়ে ছিলেন ভারতে। ১০ ক্লাবের উপেক্ষার খবরে ধাক্কামতো খেয়েছিলেন। তবে দ্রুতই সামলে নিয়েছেন নিজেকে। জানালেন, সেই ধাক্কাটাকেই করে নিয়েছেন শক্তি।
“আমার কাছে এই সব ব্যাপার সব সময়ই অনুপ্রেরণা জোগায়। বিপিএলের প্রথম নিলামেও আমি আনসোল্ড ছিলাম। পরে শেষ দিকে ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটর্স আমাকে নিয়েছিল। আগের বারের ঢাকা লিগেও এ রকমই। কেউ যখন নিচ্ছে না, মোহামেডান শেষ মূহূর্তে নিয়েছিল। আল্লাহর রহমতে সব জায়গাতেই ভালো খেলেছি। মোহামেডান যখন একদমই ভালো করছিল না, টানা চারটি ম্যাচ জিতে আমরা সুপার লিগে খেলেছিলাম।”
“বিপিএলে কুমিল্লা দলে নেওয়ার পর কিছু কথা হয়েছিল আমাকে নিয়ে, আমি কিন্তু রাগ করিনি। একটা কথাই ভেবেছি যে মাঠে খেলে প্রমাণ করে দিতে হবে। সেটাই চেষ্টা করেছি। তো এসব ব্যাপার আমাকে অনুপ্রাণিতই করে।”
শেষ পর্যন্ত যে ক্লাব তাকে দলে নিল, তাদের প্রতি দায়িত্বের ব্যাপার তো আছেই। সঙ্গে আছে চ্যালেঞ্জও। দেশের ক্রিকেটের সম্ভবত সবচেয়ে বড় নাম হয়েও মাঝারি ক্লাবে খেলার চ্যালেঞ্জ। মাশরাফিও রোমাঞ্চিত নতুন চ্যালেঞ্জে।
“খুবই রোমাঞ্চিত কলাবাগানে খেলব বলে। এর আগে একবার সিটি ক্লাবে ছিলাম, দুটি ম্যাচ খেলেই চোট পেয়ে বাইরে। ইন্দিরা রোডে একটি ম্যাচ খেলেছিলাম প্রস্তুতির জন্য। এছাড়া সবসময়ই বলতে গেলে প্রথাগত বড় দলে খেলেছি; আবাহনী, মোহামেডান, বিমান। এবার কলাবাগানে খেলছি, এজন্য রোমাঞ্চিত।”
“কিছু ব্যাপার আছে না, বলে বোঝানো যায় না! অনেকটা সেরকমই, ভেতরে রোমাঞ্চ অনুভব করতে পারছি। এই ধরনের ক্লাবে খেললে চ্যালেঞ্জ অবশ্যই আছে। এই চ্যালেঞ্জটা নিয়ে ভালো করতে পারলে মজাটাও বেশি।”
এই ‘ভালো করতে পারা’ আসলে কতটা ভালো তার প্রকাশ্য ঘোষণাও দিতে চান না মাশরাফি। তবে মনে ভাবনার আনাগোণা আছে ঠিকই।
“এই দল নিয়ে আমি ঘোষণা করে দেব না যে আমরা চ্যাম্পিয়ন হব। তবে মনের ভেতর ইচ্ছাটা অবশ্যই আছে। আমি চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কথা বলছি না। এই দল নিয়ে হয়ত কেউ খেলতে চাইবে না। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে, ভালো কিছু করা সম্ভব।”
লক্ষ্য পূরণে মাশরাফি যথারীতি সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছেন দলীয় ঐক্যে।
“হয়ত অন্য দলে দুজন ভালো খেললেই হবে, আমার দলে চার জনকে ভালো খেলতে হবে। সেটা খুবই সম্ভব। আমাদের লক্ষ্য থাকবে, দলকে ভালো একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়া।”
নতুন ক্লাব যেভাবে তাকে বরণ করেছে, তাতেও আপাতত দারুণ খুশি জাতীয় দলের অধিনায়ক।
“সবাই খুব ভালো। ১৬ বছর ক্রিকেট খেলার পর আপনি কি চাইবেন? টাকার চেয়ে বেশি চাইবেন সম্মান। সেটা আমি কলাবাগানে পাচ্ছি। আবাহনী-মোহামেডানেও পেয়েছি, এখানেও পাচ্ছি।”
তবে ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ, ক্লাবের লক্ষ্য এসবের সঙ্গে কিন্তু আবার গুলিয়ে ফেলছেন না দলের তরুণ ক্রিকেটারদের ভবিষ্যতটাকে। নিজ ক্লাবের তরুণদের ঠিকই দেখাচ্ছেন আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন।
“আমি সবসময়ই তরুণ ক্রিকেটারদের যখন স্বপ্ন দেখাই। সব সময় বলি জাতীয় দলে খেলতে হবে এবং অনেক দিন খেলতে হবে। এই বিপিএল, ঢাকা লিগ, খেলতে পারবে সবাই; জাতীয় দলে খেলতে হবে। ভালো করতে হবে। আমি ওদের বড় স্বপ্ন দেখাই।”
“এই যে আমার দলে সাদমানরা (বাঁহাতি ওপেনার সাদমান ইসলাম) আছে, ২০-২২ বছর বয়সী আরও কয়েকজন। ওরা আরও ১২-১৪ বছর খেলবে। প্রস্তুত হয়ে আসুক। ৩-৪ বছর পরে হলেও জাতীয় দলে খেলুক। ক্লাবের জন্য নয়, আমি চাই ওরা জাতীয় দলের জন্য প্রস্তুত হোক। জাতীয় দল যেভাবে চায়, সেভাবে প্রস্তুত হয়ে আসুক।”
এটাই এখনকার মাশরাফি। ক্লাব অধিনায়কের দায়িত্বটুকু জানেন। তবে ক্লাবেও ঠিকই বড় পরিচয় হয়ে ওঠে জাতীয় অধিনায়ক। আবার স্রেফ অধিনায়ক ছাপিয়ে তিনি অভিভাবকও!