ali (janaja)কিংবদন্তির মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মাদ আলীর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকির লুইভিলের ফ্রিডম হলে এই জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।এতে অংশ নিতে সেখানে জড়ো হয়েছে হাজারও মানুষ। ইসলাম গ্রহণ করা এই মহান যোদ্ধার মৃত্যুশোকে কাতর কয়েক হাজার মানুষ প্রার্থনা করেছে তার জানাজায়। এই ফ্রিডম হলেই ১৯৬০ সালে তিনি প্রথম পেশাগত ভাবে বক্সিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন।
মোহাম্মদ আলীর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তিনি মুষ্টিযুদ্ধের রিংয়ে আজীবন আগ্রাসী লড়াই করেছেন। প্রতিপক্ষ বুঝে ওঠার আগেই ধরাশায়ী করেছেন তাকে। কিন্তু রিংয়ের বাইরে তিনি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম মানুষ, যে কিনা মানুষের শান্তি ও মঙ্গল চান। এটা অতি দুর্লব এক বৈশিষ্ট্য তার।
বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের প্রায় ১৪ হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিলেন সেরা এই ক্রীড়াবিদের জানাজায়। মানুষের চোখে তিনি শুধু মুষ্টিযুদ্ধে একজন বিজয়ী বীর নন, তিনি জনমানুষের হৃদয়ের একজন বিজয়ীও।
মোহাম্মদ আলী তিনবার হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। একাধারে একজন দক্ষ ও চতুর খেলাড়ি, রাজনৈতিক কর্মী এবং মানবতাবাদী আলী গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের একটি হাসপাতালে ৭৪ বছর বয়সে সেপটিক শকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
বক্সিং খেলাটিকে বিশ্বের আপামর মানুষের কাছে যিনি জনপ্রিয় করেছিলেন তিনি আলী। বক্সিং রিংয়ে প্রজাপতির মত নেচে নেচে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার দৃশ্য মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মত উপভোগ করত। এই বাংলাদেশেও তার অসংখ্য ভক্ত তৈরি হয়েছিল।
আশির দশকে বিটিভিতে যখন তার ম্যাচ প্রচারিত হত তখন নাকি রাস্তাঘাট খালি হয়ে যেত। কোনো ম্যাচে তিনি হেরে গেলে কেঁদে বুক ভাসাতো বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে ছটিয়ে থাকা তার লক্ষ কোটি ভক্ত।
তিনি তিন বারের ওয়ার্ল্ড হেভিওয়েট চ্যাপিয়ন এবং অলিম্পিক লাইট-হেভিওয়েট স্বর্ণপদক বিজয়ী। ৬১টি বক্সিং প্রতিযোগিতার মধ্যে ৫৬টিতেই জয়ী হন তিনি। এটি বক্সিং খেলার ইতিহাসে অনন্য একটি রেকর্ডও। পরাজিত হয়েছিলেন মাত্র পাঁচটিতে।
এ কারণেই ১৯৯৩ সালে আমেরিকার ৮০০ জীবিত অথবা মৃত অ্যাথলেটের মধ্যে বেইব রুথের সঙ্গে তাকে যুগ্মভাবে সেরা ঘোষণা করা হয়। ১৯৯৯ সালে বিবিসি এবং স্পোর্টস ইলাসট্রেটেড তাকে স্পোর্টসম্যান অব দ্য সেঞ্চুরী অর্থাৎ শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড় হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
তার মৃত্যুর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাসহ বিশ্বের অনেক খ্যাতনামা মানুষ শোক জানিয়েছেন। এমনকি মোহাম্মদ আলীর নামে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে। মঙ্গলবার মেডিসন স্কয়ার গার্ডেনের ওয়েস্ট থার্টি থার্ড স্ট্রিটকে অস্থায়ীভাবে ‘মোহাম্মদ আলী ওয়ে’ হিসেবে ঘোষণা দেন নিউ ইয়র্কের মেয়র বিল ডি ব্লাসিয়ো।
আলী এবং তার পরিবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা আগামি ১০ বছর যাবত আলির শেষকৃত্য পালন করবেন। যাতে করে একই সঙ্গে আলীর ইসলাম বিশ্বাস এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতির জনপ্রিয়তা দুটোকেই রক্ষা করা যায়।
মোহাম্মদ আলী ১৯৬৪ সালে ইসলামিক নাম গ্রহণ করে প্রথম চমকে দেন পশ্চিমা বিশ্বকে। দ্বিতীয় চমক ছিল ১৯৭০ সালে সরাসরি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা। পরবর্তীতে তিনি সূফীবাদের চর্চাও করেছেন।
মোহাম্মদ আলী একই সঙ্গে দ্বৈত জীবন যাবন করেছেন। সেটা যেমন মুষ্টিযুদ্ধের ময়দানে, তেমনি বাস্তব জীবনেও। তিনি প্রমাণ করেছেন তিনি নির্দিষ্ট কোন জাতি বর্ণের নন। তিনি সারা বিশ্বের মানুষের। তার ভেতরে কোমলতা এবং কঠোরতার আশ্চর্য সন্নিবেশ ছিল। তিনি এমন একজন বিজয়ী যিনি কিনা পরাজিতের কথা জানতেন। যে কারণে তিনি হতে পেরেছেন জনমানুষের বিজয়ী।