sadaqah-and-zakat.jpgমমতা জড়িত সেবার নামই সাদাকা। ‘সাদাকা’ শব্দটির সাধারণ বাংলা অর্থ হল ‘দান’। জুরজানী বলেন: পারিভাষিক অর্থে সাদাকা বলা হয়, এমন দানকে যার মাধ্যমে আল্লাহর নিকট সওয়াব আশা করা হয়। [আত্ তা’রীফাত/১৩৭]

তবে শরীয়তে দান সাধারণত: দুই ভাগে বিভক্ত; একটি এমন দান যা বিশেষ কিছু শর্তে মুসলিম ব্যক্তির বিশেষ কিছু সম্পদে ফরয হয়, যা থেকে একটি নির্দিষ্ট অংশ দান করা তার উপর অপরিহার্য হয়। এমন দানকে বলা হয় যাকাত। আর অন্য দানটি এমন যে, মুসলিম ব্যক্তিকে তা করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে কিন্তু তার উপর অপরিহার্য করা হয়নি। এমন দানকে বলা হয় সাদাকা। তবে শরীয়ার ভাষায় অনেক ক্ষেত্রে ফরয যাকাতকেও সাদাকা বলার প্রচলন আছে।

সাদাকা  স্বেচ্ছা দানকে বোঝানো হয়। এটি অতিরিক্ত দান। যাকাতের মত সাদাকা বাধ্যাতামূলক নয়। যাকাত প্রদানের বাইরে ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে সাদাকা করা হয়। শরিয়তের দৃষ্টিতে উত্তম যেকোনো কাজে সাদাকার অর্থ ব্যয় করা যায়।

অপরদিকে যাকাত ইসলামের পাঁচটি ফরযের একটি। কালিমায়ে শাহাদাত ও সালাতের পর যাকাতের স্থান। কুরআন-হাদিস ও মুসলিমের ইজমা দ্বারা এর ফরযিয়্যাত প্রমাণিত। যাকাতের ফরযিয়্যাত অস্বীকারকারী কাফের ও ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত মুরতাদ। আর যাকাতের ব্যাপারে যে কৃপণতা করল অথবা কম আদায় করল সে যালেমদের অন্তর্ভুক্ত ও আল্লাহর শাস্তির উপযুক্ত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿وَلَا يَحۡسَبَنَّ ٱلَّذِينَ يَبۡخَلُونَ بِمَآ ءَاتَىٰهُمُ ٱللَّهُ مِن فَضۡلِهِۦ هُوَ خَيۡرٗا لَّهُمۖ بَلۡ هُوَ شَرّٞ لَّهُمۡۖ سَيُطَوَّقُونَ مَا بَخِلُواْ بِهِۦ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِۗ وَلِلَّهِ مِيرَٰثُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۗ وَٱللَّهُ بِمَا تَعۡمَلُونَ خَبِيرٞ ١٨٠﴾ [سورة آل عمران:180]
“আর আল্লাহ যাদেরকে তাঁর অনুগ্রহ থেকে যা দান করেছেন তা নিয়ে যারা কৃপণতা করে তারা যেন ধারণা না করে যে, তা তাদের জন্য কল্যাণকর। বরং তা তাদের জন্য অকল্যাণকর। যা নিয়ে তারা কৃপণতা করেছিল, কিয়ামত দিবসে তা দিয়ে তাদের বেড়ি পরানো হবে। আর আসমানসমূহ ও যমীনের উত্তরাধিকার আল্লাহরই জন্য। আর তোমরা যা আমল কর সে ব্যাপারে আল্লাহ সম্যক জ্ঞাত”। সূরা আলে-ইমরান: (১৮০)
সহিহ বুখারিতে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আল্লাহ যাকে সম্পদ দান করেছেন, অতঃপর সে তার যাকাত প্রদান করল না, কিয়ামতের দিন তার জন্য বিষধর সাপ সৃষ্টি করা হবে, যার দুটি চোঁয়াল থাকবে, যা দ্বারা সে তাকে কিয়ামতের দিন পেঁছিয়ে ধরবে, অতঃপর তার দু’চোয়াল পাকড়ে বলবে: আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার সঞ্চিত ধন”। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿وَٱلَّذِينَ يَكۡنِزُونَ ٱلذَّهَبَ وَٱلۡفِضَّةَ وَلَا يُنفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ فَبَشِّرۡهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٖ ٣٤ يَوۡمَ يُحۡمَىٰ عَلَيۡهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكۡوَىٰ بِهَا جِبَاهُهُمۡ وَجُنُوبُهُمۡ وَظُهُورُهُمۡۖ هَٰذَا مَا كَنَزۡتُمۡ لِأَنفُسِكُمۡ فَذُوقُواْ مَا كُنتُمۡ تَكۡنِزُونَ ٣٥﴾ [سورة التوبة: 34، 35]
“এবং যারা সোনা ও রূপা পুঞ্জীভূত করে রাখে, আর তা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে না, তুমি তাদের বেদনাদায়ক আযাবের সুসংবাদ দাও। যেদিন জাহান্নামের আগুনে তা গরম করা হবে, অতঃপর তা দ্বারা তাদের কপালে, পার্শ্বে এবং পিঠে সেঁক দেয়া হবে। (আর বলা হবে) ‘এটা তা-ই যা তোমরা নিজদের জন্য জমা করে রেখেছিলে, সুতরাং তোমরা যা জমা করেছিলে তার স্বাদ উপভোগ কর”। [সূরা আত-তওবা: (৩৪-৩৫)]
সহিহ মুসলিমে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«ما من صاحب ذهب ولا فضة لا يؤدِّي منها حقَّها إلا إذا كان يوم القيامة صُفِّحت له صفائح من نار فأحمي عليها في نار جهنم فيكوى بها جنبهُ وجبينه وظهرهُ كلما بردت أُعيدت في يوم كان مقدارهُ خمسين ألف سنة حتى يقضى بين العباد»
“স্বর্ণ ও রূপার এমন কোন মালিক নেই, যে এর হক প্রদান করে না, যার জন্য কিয়ামতের দিন আগুনের পাত তৈরি করা হবে না, যা জাহান্নামের আগুনে তাপ দিয়ে অতঃপর তার পার্শ্ব, কপাল ও পৃষ্ঠদেশ সেক দেয়া হবে। যখন যখন তা ঠাণ্ডা হবে গরম করা হবে, সে দিনের পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছর, যতক্ষণ না বান্দাদের ফয়সালা সমাপ্ত হয়”।
সাদাকার ফযীলতঃ
আল্লাহ তায়ালা বলেন: “যারা রাতে-দিনে গোপনে ও প্রকাশ্যে তাদের মাল-সম্পদ খরচ করে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট বদলা রয়েছে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।” [সূরা বাকারাহ/২৭৪]
১-সাদাকা ধন-সম্পদ ও রিজিক বৃদ্ধির কারণ: আল্লাহ তায়ালা বলেন: (আল্লাহ তায়ালা সুদকে বিলুপ্ত করেন এবং সাদাকাকে বৃদ্ধি করেন।) [বাকারাহ/২৭৬] এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “সাদাকা কোনও মালকে হ্রাস করে না”। [মুসলিম, নং ২৫৮৮]
২-সাদাকা রোগ থেকে আরোগ্যে পাওয়ার কারণ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “সাদাকার মাধ্যমে রোগীদের চিকিৎসা করো”। [স্বাহীহ আল জামি, শাইখ আলবানী হাসান বলেছেন]
৩-সাদাকা সাদাকারীর সঠিক ঈমানের প্রমাণ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “সাদাকা হচ্ছে প্রমাণ”। [মুসলিম, স্বহীহ আল জামি নং ৩৯৫৭]
৪-সাদাকা পুণ্য ও তাকওয়া অর্জনের উপায়: আল্লাহ তায়ালা বলেন: (তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তু খরচ না করা পর্যন্ত কক্ষনো পুণ্য লাভ করবে না) [আল্ ইমরান/৯২]
৫-সাদাকা আত্মাকে পাক ও পরিশুদ্ধ করে: আল্লাহ তায়ালা বলেন: (তাদের সম্পদ থেকে সাদাকাহ গ্রহণ করবে যাতে তা দিয়ে তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করতে পার।) [তাওবা/১০৩]
৬-সাদাকা কিয়ামত দিবসে সাদাকাকারীকে সূর্যের তাপ থেকে ছায়া করবে: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “প্রত্যেক ব্যক্তি তার সাদাকার ছায়াতলে থাকবে যতক্ষণে লোকদের মাঝে ফয়সালা শেষ না হয়”। [আহমদ, শাইখ আলবানী স্বহীহ বলেছেন, স্বহীহ আল জামি নং ৪৫১০] অন্য হাদীসে সাত প্রকারের লোক আরশের ছায়াতলে স্থান পাবে বলে উল্লেখ হয়েছে, তন্মধ্যে এক ব্যক্তি সে যে, “গোপনে এমন ভাবে সাদাকা করে যে, তার ডান হাত যা খরচ করে তার বাম হাত জানতে পারে না”। [বুখারী, (১৪২৩) মুসলিম(১০৩১)]
৭-সাদাকা করা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বৈশিষ্ট: ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন এবং তাঁর দানশীলতা আরও বৃদ্ধি পেত, যখন রামাযান মাসে ফেরেশতা জিবরীল তাঁর সাথে সাক্ষাত করত”। [বুখারী, নং (৬) মুসলিম]
৮-সাদাকা হচ্ছে আত্মীয়তা বজায় রাখা: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “কোনও এক মিসকিনকে সাদাকা করা একটি সাদাকা আর তা আত্মীয়কে করা একটি সাদাকা ও একটি আত্মীয়তা”। [আহমাদ, নাসাঈ, তিরমিযী, নং (৬৫৮) ইবনে কাসীর হাদীসটির সূত্রকে স্বহীহ বলেছেন]
৯-সাদাকা বিপদ থেকে নিরাপদে রাখে এবং আল্লাহর ক্রোধ নিভিয়ে দেয়: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “ সওয়াবের কাজ বিপদাপদ থেকে নিরাপদে রাখে, গোপন ভাবে সাদাকা করা প্রতিপালকের ক্রোধ নিভিয়ে দেয় এবং আত্মীয়তা বজায় রাখা বয়স বৃদ্ধি করে”। [স্বহীহুত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব]
১০-সাদাকা অন্তরের নিষ্ঠুরতার চিকিৎসা: একদা এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট তার অন্তরের কঠোরতার অভিযোগ করলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেন: “ইয়াতীমের মাথায় হাত বুলাও এবং মিসকিনদের খাদ্য দান করো”। [আহমদ, নং (৭৫৬৬, হাসান স্বহীহ আল জামি নং ১৪১০]
১১-সাদাকা কিয়ামতের দিনে জাহান্নাম থেকে বাঁচার কারণ: (আর তারা আল্লাহর প্রতি তাদের ভালবাসার কারণে মিসকিন, ইয়াতীম ও কয়েদীকে খাবার খাওয়ায়। …. যার ফলে আল্লাহ তাদের সে দিনের অনিষ্ট হতে রক্ষা করবেন আর তাদের দিবেন সজীবতা ও আনন্দ।) [সূরা দাহর/৯ ও ১১] হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, জাহান্নাম থেকে বেঁচে থাক যদিও অর্ধেক খেজুরও সাদাকা করে হয়”। [মুত্তাফাক আলাইহি]
১২-সাদাকা পাপ মোচন করে এবং তা গুনাহের কাফফারা স্বরূপ: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “এবং সাদাকা পাপ মুছে দেয় যেমন পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়”। [তিরমিযী বর্ণনা করেছেন এবং আলবানী স্বহীহ বলেছেন, স্বহীহ আল জামি নং ২৯৫১]
১৩-সাদাকা আল্লাহর ভালবাসার কারণ: আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “আল্লাহর নিকট পছন্দনীয় সৎ কাজ হচ্ছে, মুসলিম ব্যক্তিকে খুশী করা কিংবা তার কষ্ট দূর করা কিংবা তার ক্ষুধা নিবারণ করা কিংবা তার ঋণ পরিশোধ করা”। [স্বহীহুত তারগীব ওয়াত্ তারহীব]
১৪-সাদাকাকারীর জন্য প্রত্যেক দিন ফেরেশতা দুআ করেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “প্রতিদিন মানুষ যখন সকাল করে, তখন দুই জন ফেরেশতা অবতরণ করে। তাদের একজন বলে: হে আল্লাহ! তুমি (সৎ কাজে) ব্যয়কারীকে তার প্রতিদান দাও। আর দ্বিতীয় জন বলে: হে আল্লাহ! (আল্লাহ যা জরুরি করেছেন তা) ব্যয় না কারীর (সম্পদকে) ধ্বংস করে দাও”। [বুখারী, যাকাত অধ্যায়/১৩৭৪]
১৫-সাদাকার সওয়াব মৃত্যুর পরেও অব্যাহত থাকে: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “আদম সন্তান মারা গেলে তার সৎ আমল সমাপ্ত হয়ে যায় তিনটি ব্যতীত: ১-সাদাকায়ে জারিয়া ২-উপকারী ইলম ৩-সৎ সন্তান যে তার জন্য দুআ করে”। [মুসলিম, অসিয়ত অধ্যায়]
১৬-সাদাকা জান্নাতে প্রবেশের কারণ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “হে লোকেরা! আপসে সালাম বিনিময় কর, অন্যকে খাবার খাওয়াও, আত্মীয়তা বজায় রাখ এবং রাত্রে নামায আদায় কর যখন লোকেরা নিদ্রায় থাকে, তাহলে অভিবাদনের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করবে”। [হাদীসটি তিরমিযী বর্ণনা করেছেন, নং (২৪৯০) এবং শাইখ আলবানী স্বহীহ বলেছেন]
পরিশেষে প্রিয়/প্রিয়া পাঠক/পাঠিকাদের নিকট আবেদন করব, স্বল্প হলেও নফল সাদাকা করুন এবং করার অভ্যাস করুন। কারণ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ (অর্ধেক খেজুর সাদাকা করে হলেও জাহান্নাম থেকে বেঁচে থাক)
মহান আল্লাহ আমাদেরকে যাকাত আদায়ের পাশাপাশি অধিক পরিমাণে দান-সদকা করে তার প্রিয়ভাজন বান্দাদের অন্তর্ভূক্ত করে নিন। আমীন।

আল্লাহর পথে সদাকা/ব্যয় করার গুরুত্ব
আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘আমি তোমাদের যে রিজিক দিয়েছি তোমরা তা হতে ব্যয় করবে তোমাদের কারো মৃত্যু আসার পূর্বে; অন্যথায় মৃত্যু এলে সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে কিছু কালের জন্য অবকাশ দিলে আমি দান করতাম এবং সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। কিন্তু নির্ধারিত সময় যখন উপস্থিত হবে, আল্লাহ কখনো কাউকে অবকাশ দেবেন না। তোমরা যা কর আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত’ ( সূরা মুনাফিকুন, ১০-১১)।
অনেকেই অর্থসম্পদ আল্লাহর পথে খরচ করতে চায় না এ আশঙ্কায় যে সে গরিব হয়ে যাবে। কিন্তু জীবনসায়াহ্নে এসে যখন সে দেখে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে শ্রীহীন ধূসর পৃথিবী; সব কোলাহল মিথ্যা মরীচিকা ছাড়া কিছু নয়, তখন সে বিভীষিকাময় অনাগত জীবনের কথা স্মরণ করে সহসা দানে উৎসাহী হয়ে ওঠে। এ সম্পর্কে হজরত আবু সাঈদ খুদরি রা: বর্ণিত হাদিসে রাসূল সা: বলেন, ‘মানুষের জীবদ্দশায় এক দিরহাম দান করা, তার মৃত্যুকালে এক শত দিরহাম দান করা অপো উত্তম’ (আবু দাউদ, মিশকাত)। হজরত আবু হুরাইরা রা: থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূল সা: আরো বলেন, ‘দান সম্পদ কমায় না, তা দ্বারা আল্লাহ পাক বান্দার সম্মান বৃদ্ধি ছাড়া হ্রাস করেন না। কেউ আল্লাহর ওয়াস্তে বিনয় প্রকাশ করলে আল্লাহ পাক তাকে উন্নত করেন’ (মুসলিম, মিশকাত)।
আল্লাহ পাক কৃপণতা পছন্দ করেন না। কল্যাণকর কাজে অর্থ বিনিয়োগ না করে যারা তা পুঞ্জীভূত করে রাখে তারা যে সত্যিকারার্থে পরকালের বিপুল প্রাপ্তি থেকে নিজেদের বঞ্চিত করছে তা উপলব্ধি করা তাদের পে সম্ভব হয়ে ওঠে না। আল্লাহ পাকের খাজাঞ্চিতে সম্পদের অভাব নেই। অর্থশালীরা জনগণের কল্যাণে খরচ না করলে তাদের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে আল্লাহ পাক এমন কাউকে সে জায়গায় প্রতিস্থাপিত করবেন যারা জনহিতৈষী কাজে অগ্রগামী হবে। আল্লাহ পাক বলেন, ‘দেখ, তোমরাই তো তারা, যাদের আল্লাহর পথে ব্যয় করতে বলা হচ্ছে অথচ তোমাদের অনেকে কৃপণতা করছে; যারা কার্পণ্য করে তারা তো কার্পণ্য করে নিজেদের প্রতি। আল্লাহ অভাবমুক্ত এবং তোমরা অভাবগ্রস্ত; যদি তোমরা বিমুখ হও, তিনি অন্য জাতিকে তোমাদের স্থলবর্তী করবেন, তারা তোমাদের মতো হবে না’ (মুহাম্মাদ, ৩৮)।
দাতা ব্যক্তির মঙ্গলের জন্য ফেরেশতারা দোয়া করে। আর কৃপণ এবং সঙ্কীর্ণচেতার জন্য তারা ধ্বংস ও বরবাদের প্রার্থনা করে। হজরত আবু হুরাইরা রা: থেকে বর্ণিত। রাসূল সা: বলেছেন, ‘এমন কোনো দিন বিগত হয় না যে দিন দু’জন ফেরেশতা পৃথিবীতে আগমন করেন না, তাদের একজন দানশীল ব্যক্তির জন্য দোয়া করতে থাকেন এবং বলেন, হে আল্লাহ! আপনি দানশীল ব্যক্তিকে উত্তম বদলা দিন। দ্বিতীয় ফেরেশতা কৃপণের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে বদদোয়া করে বলেন, হে আল্লাহ! কৃপণকে ধ্বংস ও বরবাদ করুন’ (বুখারি-মুসলিম)।
আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তার বান্দার প্রতি দয়ার বশবর্তী হয়ে সামান্য কাজ করলেও তাতে অনেক পুণ্য লাভ হয়। হজরত আনাস রা: হতে বর্ণিত। তিনি বলেন : রাসূল সা: বলেছেন, ‘কোনো মুসলমান একটি গাছ রোপণ করবে অথবা শস্য বপন করবে অতঃপর তা হতে মানুষ অথবা পশুপাখি কিছু খাবে, নিশ্চয়ই এটি দানরূপে গণ্য করা হবে। হজরত জাবির রা: থেকে সহিহ মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে, ‘যা চুরি হয়ে যায় তা-ও তার জন্য দান হিসেবে লিখা হয়। (মিশকাত)
মুসলমানের কল্যাণার্থে খাদ্য এবং পোশাক দান করা প্রশংসনীয় কাজ। আল্লাহ পাকের কাছে এর জন্য আছে সম্মানজনক প্রতিদান। হজরত আবু সাঈদ খুদরি রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন : রাসূল সা: বলেছেন, ‘কোনো মুসলমান বিবস্ত্র মুসলমানকে বস্ত্র পরিধান করালে কিয়ামতের দিন আল্লাহ পাক তাকে বেহেশতের সবুজ পোশাক পরাবেন। কোনো মুসলমান তার ক্ষুধার্ত ভাইকে অন্ন দান করলে এবং তাকে পিপাসায় পান করালে আল্লাহ পাক তাকে বেহেশতের মোহর করা শরাব পান করাবেন। (আবু দাউদ, তিরমিজি, মিশকাত)
কিয়ামতের কঠিন দিনে যখন কোথাও একটু ছায়া থাকবে না, সে দিন দানকারীর জন্য তার দান শীতল ছায়া হবে। পার্থিব জীবনে আর্থিক সঙ্কটের মধ্যেও যারা অন্যের প্রতি বদান্যতার হাত প্রসারিত করে তাদের জন্য অপো করছে কঠিনতম দিনে শান্তির ব্যবস্থা। হজরত মারছাদ বিন আবদুল্লাহ রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন : আমার কাছে রাসূল সা: জনৈক সাহাবি বর্ণনা করেছেন যে, তিনি রাসূল সা:-বলতে শুনেছেন : ‘নিশ্চয়ই কিয়ামতের রৌদ্রময় দিবসে মুমিনের জন্য ছায়া হবে তার দান। (আহমদ, মিশকাত)
আল্লাহর পথে ধনসম্পদ ব্যয়ের একটি উপমা পবিত্র কুরআনে এসেছে যে: ‘যারা নিজেদের ধনৈশ্বর্য আল্লাহর পথে ব্যয় করে তাদের উপমা একটি শস্যবীজ, যা সাতটি শীষ উৎপাদন করে, প্রত্যেক শীষে থাকে এক শ’ শস্যকণা। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বহু গুণে বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ (সূরা বাকারা : ২৬১)

যাকাতের চারিত্রিক ফায়দা:
১. যাকাত ব্যক্তিকে দানশীল ও বদান্যদের কাতারে শামিল করে।
২. যাকাত প্রমাণ করে, যাকাত আদায়কারী অভাবীদের প্রতি রহম, দয়া ও অনুগ্রহশীল, আর আল্লাহ দয়াশীলদের উপর দয়া করেন।
৩. আমাদের অভিজ্ঞতা যে, মুসলিমদের উপর আর্থিক ও শারীরিক সেবা প্রদান অন্তঃকরণকে প্রশস্ত ও প্রফুল্ল করে এবং মানুষের নিকট যাকাত দাতাকে প্রিয় ও ঘনিষ্ঠ করে তুলে।
৪. যাকাতে রয়েছে লোভ ও কৃপণতা থেকে মুক্তি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿خُذۡ مِنۡ أَمۡوَٰلِهِمۡ صَدَقَةٗ تُطَهِّرُهُمۡ وَتُزَكِّيهِم بِهَا ١٠٣﴾ [التوبة: 103]
“তাদের সম্পদ থেকে সদাকা নাও। এর মাধ্যমে তাদেরকে তুমি পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবে”। [সূরা তওবা: (১০৩)]
যাকাতের সামাজিক উপকারিতা:
১. যাকাতের ফলে অভাবীদের অভাব দূর হয়, দুনিয়ার অধিকাংশ জায়গায় যাদের সংখ্যাই বেশী।
২. যাকাতের ফলে মুসলিমদের শক্তি অর্জন হয় ও তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়, কারণ যাকাতের একটি খাত জিহাদ।
৩. যাকাত গরীবদের অন্তর থেকে ধনীদের প্রতি হিংসা ও বিদ্বেষ দূর করে দেয়। কারণ গরীবরা যখন দেখে ধনীরা তাদের সম্পদ দ্বারা যাবতীয় প্রয়োজন পুরো করে, কিন্তু তাদের সম্পদ থেকে তারা কোনভাবে উপকৃত হয় না, এ কারণে অনেক সময় ধনীদের প্রতি তাদের অন্তরে হিংসা ও বিদ্বেষের জন্ম নেয়, যেহেতু ধনীরা তাদের অধিকার রক্ষা করে না, তাদের কোন প্রয়োজনে তারা সাড়া দেয় না, কিন্তু ধনীরা যদি বছর শেষে গরীবদের যাকাত দেয়, তাহলে তাদের অন্তর থেকে এসব বিষয় দূরীভূত হয় এবং উভয় শ্রেণীর মধ্যে মহব্বত ও ভালবাসার সৃষ্টি হয়।
৪. যাকাতের ফলে সম্পদ বৃদ্ধি পায় ও তাতে বরকত হয়। যেমন হাদিসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«ما نقصت صدقة من مال»
“কোন সদকা সম্পদ হ্রাস করেনি”।
অর্থাৎ সদকার ফলে যদিও সম্পদের অংক কমে, কিন্তু তার বরকত ও ভবিষ্যতে তার বৃদ্ধি কমে না, বরং আল্লাহ তার সম্পদে বরকত দেন ও তার বিনিময়ে অধিক দান করেন।
৫. যাকাতের ফলে সম্পদে বরকত হয় ও তা বৃদ্ধি পায়। কারণ সম্পদ যখন খরচ করা হয়, তখন তার পরিধি বৃদ্ধি পায় ও মানুষ উপকৃত হয়, ধনীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ও গরীবরা তা থেকে বঞ্চিত হলে যা হয় না।
অতএব এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় ব্যক্তি ও সমাজ বিনির্মাণে যাকাত অপরিহার্য।
যাকাত নিদিষ্ট সম্পদের উপর ওয়াজিব হয়, যেমন স্বর্ণ ও রূপা, শর্ত হচ্ছে এর নিসাব পূর্ণ হতে হবে। স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ, আর রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা বা তার সমপরিমাণ অর্থের মালিক হলে যাকাত ওয়াজিব হবে। স্বর্ণ ও রূপা অলংকার বা যে অবস্থাতে থাক, তাতে যাকাত ওয়াজিব হবে। অতএব নারীর পরিধেয় অলংকারের উপর যাকাত ওয়াজিব যদি তা নিসাব পরিমাণ হয়, সে নিজে পরিধান করুক বা অন্যকে পরিধান করতে দিক। কারণ দলিলের ব্যাপকতা এটাই প্রমাণ করে। দ্বিতীয়ত কতক নির্দিষ্ট দলিল আছে, যা থেকে প্রমাণিত হয় অলংকারের উপর যাকাত ওয়াজিব, যদিও তা ব্যবহারের হয়, যেমন আব্দুল্লাহ ইবন আমর ইবন আস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, জনৈক নারী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আগমন করে, তার হাতে ছিল স্বর্ণের দু’টি চুড়ি, তিনি বললেন: “তুমি এগুলোর যাকাত দাও?”। সে বলল: না। তিনি বললেন: “তুমি কি পছন্দ কর আল্লাহ এগুলোর পরিবর্তে তোমাকে জাহান্নামের দু’টি চুড়ি পরিধান করান?। সে তা নিক্ষেপ করে বলল: এগুলো আল্লাহ ও তার রাসূলের জন্য।
আরো যেসব জিনিসের উপর যাকাত ওয়াজিব তন্মধ্যে রয়েছে: ব্যবসায়ী সম্পদ, অর্থাৎ ব্যবসার জন্য রক্ষিত সম্পদ যেমন জমিন, গাড়ি, চতুষ্পদ জন্তু ও অন্যান্য সম্পদ। এগুলোতে এক-দশমাংশের চার ভাগের এক ভাগ যাকাত ওয়াজিব, অর্থাৎ চল্লিশ ভাগের একভাগ। বছর শেষে হিসাব কষে তা বের করবে, তখন তার মূল্য কেনার দামের চেয়ে কম হোক অথবা বেশী হোক অথবা সমান সমান।
কিন্তু যেসব সম্পদ সে নিজের প্রয়োজন অথবা ভাড়া দেয়ার জন্য রেখেছে, তাতে যাকাত ওয়াজিব হবে না, কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “মুসলিমের উপর তার গোলাম ও ঘোড়ার সদকা নেই”। তবে ভাড়ার উপার্জনে যাকাত আসবে, যদি বছর পূর্ণ হয়।
অনুরূপভাবে স্বর্ণ বা রৌপ্যের অলঙ্কারেও যাকাত আসবে, যেমনটি পূর্বে বর্ণিত হয়েছে।
যাকাত ও সাদাকার মধ্যে পার্থক্য:
• ১-ইসলাম নির্দিষ্ট কিছু জিনিসে যাকাত জরুরি করেছে, তা হল: স্বর্ণ-রৌপ্য, খাদ্যশস্য, ব্যবসার সামগ্রী এবং চতুষ্পদ পশু –উট, গরু এবং ছাগল-। কিন্তু সাদাকা বিশেষ কিছুতে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষ তার সাধ্যানুযায়ী বিভিন্ন কিছুর মাধ্যমে তা দিতে পারে।
২-যাকাতের কিছু শর্ত রয়েছে, তা বিদ্যমান থাকলেই যাকাত জরুরি হয়। যেমন এক বছর অতিক্রম করা, নিসাব পরিমাণ হওয়া এবং বিশেষ পরিমাণে তা বের করা। কিন্তু সাদাকার এমন কোনও শর্ত নেই, তা যে কোনও সময়ে এবং যে কোনও পরিমাণে দেওয়া বৈধ।
৩- আল্লাহ তায়ালা যাকাতের খাদ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন তাই যাকাত কেবল তাদেরই দিতে হবে। আর তারা হচ্ছেন যথাক্রমে: ফকীর, মিসকিন, যাকাত উসুল কারী কর্মচারী, যাদের মন জয় করা উদ্দেশ্য (যেমন ইসলামে আগ্রহী কিংবা নওমুসলিম), দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত, জিহাদ এবং মুসাফির। [সূরা তাওবা/৬০] কিন্তু সাদাকা বর্ণিত উপরোক্তদেরও দেওয়া বৈধ এবং এছাড়া অন্যদেরও।
৪-যাকাত জরুরি ছিল এমন ব্যক্তি মারা গেলে তার ওয়ারিশদের উপর জরুরি হয় যে, তারা তার সম্পদ বণ্টনের পূর্বে সেই সম্পদ থেকে প্রথমে যাকাতের অংশ বের করবে অতঃপর বাকী সম্পদ বণ্টন করবে কিন্তু তাদের উপর সাদাকা স্বরূপ কিছু বের করা জরুরি হয় না।
৫-যাকাত আদায় না কারীরর জন্য শাস্তির বর্ণনা এসেছে। (সহীহ মুসলিম নং ৯৮৭) কিন্তু সাদাকা বর্জনকারীর শাস্তির কথা উল্লেখ হয় নি।
৬-ইমাম চতুষ্টয়ের ফতোয়ানুযায়ী যাকাত উসুল ও ফুরূকে (মূল ও গৌণদের) দেওয়া নিষেধ। মীরাছের অধ্যায়ে কোনও ব্যক্তির উসুল বলতে তার মাতা, পিতা, দাদা ও দাদীদেরকে বুঝায় এবং ফুরূ বলতে নিজের সন্তান ও সন্তানদের সন্তানকে বুঝায়। কিন্তু সাদাকা উসুল ও ফুরূ সকলকে দেওয়া বৈধ।
৭-যাকাত ধনী এবং শক্তিশালী রোজগারকারী ব্যক্তিকে দেওয়া নিষেধ। (আবু দাঊদ নং ১৬৩৩, নাসাঈ, নং ২৫৯৮) কিন্তু সাদাকা তাদেরও দেওয়া বৈধ।
৮-কাফের মুশরিককে যাকাত দেওয়া অবৈধ কিন্তু সাদাকা তাদেরও দেওয়া যায়। (সূরা দাহরের ৮ নং আয়াতের তফসীরে ইমাম কুরতুবীর তফসীর দ্রষ্টব্য)।
৯-যাকাত নিজ স্ত্রীকে দেওয়া অবৈধ। ইবনুল মুনযির এ সম্পর্কে ঐক্যমত্য বর্ণনা করেছেন। কিন্তু সাদাকা নিজ স্ত্রীকেও দেওয়া বৈধ… ইত্যাদি পার্থক্য প্রমাণিত।

আল্লাহ আমাদের বেশি বেশি দান-সাদাকা করার তাওফিক দিন। আল্লাহুমা আমিন।