ফরাসিদের কাঁদিয়ে ইউরোপের সিংহাসনে পর্তুগাল


partugal euro16.JPG১৯৭৫ সালের পর ফ্রান্সের বিরুদ্ধে নেই কোন জয়। পরিসংখ্যান, ইতিহাস সবই ছিল বিপক্ষে। আবার স্বাগতিক ফ্রান্সের মাঠেই খেলা। সব দিক থেকে পিছিয়েই ইউরোর ফাইনালে মাঠে নেমেছিল পর্তুগাল। ২৫ মিনিটের মধ্যে আরও দুঃসংবাদ। ইনজুরির কারণে কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়লেন পর্তুগাল অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। পর্তুগালের শিরোপা জয়ের আশা তখন অনেকেই ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু না, রোনালদোর কান্নাই যেন সাহস যোগালো সতীর্থদের। শোক পরিনত হলো শক্তিতে। ৯০ মিনিট দাতে দাত চেপে লড়াই করল ন্যানি শিবির। অতিরিক্ত ত্রিশ মিনিটের খেলায় জয়ের নায়ক এডার। বুলেট গতির শট লক্ষ্যভেদ করল ফ্রান্সের গোলপোস্ট। প্রথমবারের মতো ইউরো চ্যাম্পিয়ন পর্তুগাল (১-০)।
ম্যাচের ২৫ মিনিটে যে কান্না চোখে নিয়ে মাঠ ছেড়ে গিয়েছিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, তার সঙ্গে ম্যাচ শেষের কান্নার কোনো মিল আছে? এর চেয়ে সুখের কান্নাও কি কখনো কেঁদেছেন পর্তুগিজ যুবরাজ? এ তো কান্না নয়, এ বরং দুচোখ ছাপিয়ে যাওয়া সুখের অনুভূতি। সেন্ট ডেনিসে আজ অতিরিক্ত  সময়ের একমাত্র গোলে যে ফ্রান্সকে হারিয়ে ইউরোর শিরোপা জিতেছে পর্তুগাল। ঘুচেছে দেশটির প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপার আক্ষেপ, রোনালদোর একটি আন্তর্জাতিক শিরোপা না পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস।
২০০৪ সালে ঘরের মাটিতে প্রথমবারের মতো ইউরোর ফাইনালে উঠে গ্রীসের কাছে হেরেছিল পর্তুগাল। ঐ ম্যাচে ছিলেন তরুণ রোনালদো, চোখে জল। এক যুগ পর সেই রোনালদোর চোখে জল ঝড়ল ম্যাচের পুরোটা সময়। ম্যাচ শেষে তা পরিণত হলো আনন্দ অশ্রুতে। বিশ্বকাপ তো বটেই, মহাদেশীয় টুর্নামেন্টেও এতদিন বড় কোন ট্রফির দেখা পায়নি পর্তুগাল। এবার ফ্রান্সকে হারিয়ে সেই আরাধ্যের স্বপ্নটা পুরুণ হলো পর্তুগিজদের। সেরা হওয়ার পথে এগিয়ে গেলেন রোনালদোও।
ম্যাচটা তাঁর জন্য ইতিহাস লেখার সবচেয়ে সুবর্ণ সুযোগ হয়ে এসেছিল। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পায়েই ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন দেখছিল পর্তুগাল। ইতিহাস পর্তুগাল ঠিকই গড়ল। তবে সেটিতে রোনালদো ছিলেন দর্শক হয়ে। চোট পেয়ে যে ম্যাচের ২৪ মিনিটেই মাঠ ছাড়তে হয় পর্তুগাল অধিনায়ককে। রোনালদোকে বরং ইউরো ‘উপহার’ দিয়েছে পর্তুগাল।
উপহার দিয়েছেন এডার। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের পর অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধের পরও গোল দেখেনি ম্যাচ, মনে হচ্ছিল টাইব্রেকারেই নির্ধারিত হবে ম্যাচের ভাগ্য। এই সময়ই দৃশ্যপটে এডার। ফ্রান্স বক্সের একটু সামনে বল পেয়েছিলেন। একটু জায়গা করে নিয়ে প্রায় ২০ গজ দূর থেকে যে শট নিয়েছিলেন, সেটি ফ্রান্স গোলকিপার হুগো লরিসকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেল জালে। নিশ্চিত হলো পর্তুগালের ইতিহাস।
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব সোয়ানসি সিটির হয়ে ফ্লপ একটি মৌসুম কাটিয়েছেন এডার। ১৩ ম্যাচে মাঠে নেমে একটি গোলও করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ইংলিশ ক্লাবটি দলে রাখেনি তাকে। ধারে দিয়ে দেয় ফরাসি ক্লাব লিলেকে।
ভাগ্য খারাপ ফ্রান্সের। গোটা টুর্নামেন্টে দাপটে খেলে এসেও ফাইনালে খেই হারিয়ে ফেলল দুইবারের ইউরো চ্যাম্পিয়নরা। পুরো আসরে নজড় কাড়া গ্রিজম্যানও যেন নিজের ছায়া হয়ে রইলেন। যাদের গ্রুপ পর্বই পার হওয়ার কথা ছিল না, সেই পর্তুগাল শিবির শিরোপায় চুমু একে নতুন ইতিহাসই সৃষ্টি করল।
ম্যাচের শুরু থেকে আধিপত্য ছিল ফ্রান্সেরই্। বেশকটি আক্রমণ করে তারা। কিন্তু সব আক্রমনই ছিল অগোছালো। ১০ মিনিটে গোলের দেখা পেতে পারত স্বাগতিক শিবির। তবে ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল না। বা প্রান্ত থেকে উড়ে আসা বলে কৌশলী হেড নিয়েছিলেন ফ্রান্সের তুরুপের তাস গ্রিজম্যান। তবে পাখির মতো উড়িয়ে গিয়ে বল বারপোস্টের উপর দিয়ে পাঠিয়ে দেন পর্তুগিজ গোলরক্ষক।
ম্যাচের বয়স তখন ৮ মিনিট। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে চার্জ করেন ফ্রান্সের দিমিত্রি পায়েট। দৃশ্যত আঘাত গুরুতর ছিল না। ফলে রেফারি বাঁশিও বাজাননি। কিন্তু ভালোমতোই বা হাটুর উপর আঘাত হয়তো পেয়েছিলেন রোনালদো।
তাৎক্ষনিক চিকিৎসা শেষে আবার খেলা শুরু করেন রোনালদো। কিন্তু বেশীক্ষণ সম্ভব হয়নি। চলে আসেন মাঠের বাইরে। চলে অনেকক্ষণ সেবা। বেশ চনমনে মনে আবার মাঠে নামেন রোনালদো ২২ মিনিটে। পর্তুগিজদের মুখে হাসির রেখা। কিন্তু মিনিট তিনেক পর আবারো ব্যথা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে।
২৪ মিনিটে হাতের আর্ম ব্যান্ড ছুড়ে ফেলে দিয়ে মাটিতে বসে পড়েন রোনালদো। সতীর্থদের বলেন তিনি খেলা চালিয়ে যেতে পারবেন না। আনা হয় স্ট্রেচার। ততক্ষনে রোনালদোর চোখে জল। কাঁদতে কাদতে মাঠ ছাড়েন সিআরসেভেন। তার বদলি হিসাবে নামেন কোরেসমা।
রোনালদো বিহীন পর্তুগাল তখন ধাক্কা সামাল দেয়ায় ব্যস্ত। তবে প্রথমার্ধ শেষ হয় গোলশূন্য সমতায়। এই অর্ধে বলতে গেলে কোন দলই নজড়কাড়া ফুটবল উপহার দিতে পারেনি। অনেকটাই ম্যাড়ম্যাড়ে ছিল ফাইনালের শুরুটা। তবে দ্বিতীয়ার্ধে পাল্টে যায় ম্যাচের চিত্র। আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে জমে উঠে ইউরোর ফাইনাল। কখনো ফ্রান্স, কখনো পর্তুগাল শাণিয়েছে আক্রমণ। রোনালদোর পরিবর্তে অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পালন করা ন্যানি খেলেছেন দুর্দান্ত। তার অন্তত দুটি গোলের প্রচেষ্টা নস্যাত করে দিয়েছেন ফ্রান্স গোলরক্ষক লরিস। ফ্রান্সের হয়ে সিসোকো নিয়েছেন দূরপাল্রার কিছু শট, যা ছিল সত্যিই দেখার মতো। লক্ষ্যে যাওয়া এমন শট বারবারই দক্ষতার সঙ্গে প্রতিহত করেন পর্তুগাল গোলরক্ষক।
নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা শেষ। চলছে ইনজুরি টাইম। এই সময়েই শিরোপা জেতার উল্লাস করতে পারত ফ্রান্স। কিন্তু বাধা হয়ে দাড়ালো সাইড পোস্ট। বক্সের ভেতর থেকে শট নিয়েছিলেন ফ্রান্সের গিন্যাক। পরাস্ত হয়েছিলেন পর্তুগাল অধিনায়ক। কিন্তু বল চলে আসে সাইড পোস্টে লেগে। ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত ত্রিশ মিনিটে। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা আধিপত্য বেশী ছিল ফ্রান্সের। বল পজিশনের পাশাপাশি গোল পোস্টে মোট সাতবার শট নিয়েছে তারা। সেখানে পর্তুগাল পেরেছে মাত্র একবার।
অতিরিক্ত সময়ে শুরু থেকেই গোলের সুযোগ পেয়ে আসছিল পর্তুগাল। ১০৩ মিনিটে কর্নার থেকে এডারের হেড কোনমতে রক্ষা করেন ফ্রান্স গোলরক্ষক। এর মিনিট পাচেক পর ফ্রি কিক থেকে গোল পেতে পারত পর্তুগাল। তবে গুয়েরিয়েরোর দুর্দান্ত শট ফিরে আসে বার পোস্টে লেগে।
এর মিনিট খানেক পরই পর্তুগিজ শিবিরকে উল্রাসে মাতান এডার। বক্সের অনেক বাইরে থেকে কয়েকজনকে ডজ দিয়ে দারুণ এক শটে ফ্রান্সের জাল কাঁপান তিনি। ১-০তে লিড নেয় পর্তুগাল। শেষ অবধি এই গোলেই চ্যাম্পিয়নের আনন্দে বিভোর পর্তুগিজ শিবির।
ডাগ আউটে সতীর্থদের সঙ্গে কান্না ভেজা চোখে আনন্দে বিহ্বল যেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। অন্যদিকে স্বাগতিক ফরাসি শিবিরে বেদনা আর হতাশার হাহাকার।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s