Dhaka.jpgঘণবসতিপূর্ণ হওয়ায় ভূগর্ভের মাটির স্তরে যে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে তাতে ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত হতে পারে বাংলাদেশ। এ ভূকম্পন ৮ দশমিক ২ থেকে ৯ মাত্রার কিংবা তার চেয়েও বেশি মাত্রায় হতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানিদের এক গবেষণা প্রতিবেদনে। ভূমিকম্প বিপর্যয়ে দেশটির প্রায় ১৪ কোটি মানুষের জীবন ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। ন্যাচার জিওসায়েন্স সাময়িকীতে ভূমিকম্প নিয়ে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে  এ আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে।
দেশটির বুক চিরে প্রবাহিত বড় দুই নদী গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্রের দুই পাড়ের ২০ কি.মি পর্যন্ত বর্ষায় আসা বালি এবং কাঁদা মাটিতে ভরাট হয়ে গেছে। বিপুল পলিতে দুই নদীর প্রবাহ সংকুচিত হয়ে পানির আধার বিলীন হয়ে পড়েছে, যা ভূমিকম্পের একটি আগাম লক্ষণ। গবেষকরা বলছেন, ২০০৪ সালে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রায় ইতিহাসের ভয়াবহ যে সুনামি আঘাত হানে তা বাংলাদেশের একই ফল্ট লাইনে অবস্থিত। সুমাত্রার ওই সুনামিতে প্রাণ হারায় ২ লাখ ৩০,০০০ মানুষ।
‘A giant megathrust earthquake is building beneath Bangladesh that could annihilate Dhaka’—শিরোনামে ১১ জুলাই তারিখে Hannah Osborne-এর লেখা এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষজ্ঞরা এই মর্মে নিশ্চিত প্রমাণ পেয়েছেন যে, বিগত ৪০০ বছর ধরে বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ অঞ্চল বলে বিবেচিত বাংলাদেশের ভূ-স্তরের নিচের সাবডাকশন জোনে টেকটোনিক প্লেটগুলোতে প্রবল চাপ জমা হচ্ছে। আর তা এক প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে রূপ নিতে চলেছে। অল্পকালের মধ্যেই সেই ভূমিকল্প আঘাত হানবে ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায়। ভূকম্পনটি হবে ৯ মাত্রার।
বিশেষজ্ঞদের এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে, Nature Geoscience পত্রিকায়। বাংলাদেশের মাটির নিচে এক বড় বিপদ জন্ম নিচ্ছে বলে দীর্ঘদিন ধরেই যে আশঙ্কা করা হচ্ছিল, এই গবেষণা সে আশঙ্কারই প্রতিধ্বনি। ধারণা করা হচ্ছিল, বাংলাদেশ অঞ্চলের নিচের টেকটোনিক প্লেটের পরিসীমাটি ভূ-পৃষ্ঠের খুব কাছাকাছি জায়গায় ক্রমশ আনুভূমিকভাবে স্থানচ্যুত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা এই সাবডাকশন জোনটির নিচে অবস্থিত টেকটোনিক প্লেটের ওপর গবেষণা চালিয়ে এই মর্মে নিশ্চিত হয়েছেন যে,  ২০০৪ সালে ভারত মহাসাগর অঞ্চলে যে ভূমিকম্প হয়েছিল সেটিও এই বিচ্যুতিরই ফল।
তারা বলছেন, এই বিশাল সাবডাকশন জোনটি হচ্ছে মূলত এক অতিকায় টেকটোনিক প্লেট যা কোটি কোটি বছর ধরে উত্তর-পূর্ব দিকে এশিয়াপানে একটু একটু করে সরে আসছে। টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষজনিত বিপুল চাপের কারণেই একদা হিমালয় পর্বতের সৃষ্টি হয়েছিল। এই চাপটি ভূস্তরের নিচে ঘড়ির কাঁটার দিকে আবর্তিত হয়ে বাংলাদেশের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, সাবডাকশন জোন (Subduction zones) হচ্ছে সেইসব এলাকা যেখানে একটি টেকটোনিক প্লেট অন্য একটি টেকটোনিক প্লেটের উপরে উঠে যায়। এর ফলে সেখানে প্রবল ধাক্কাধাক্কি চলতে থাকে। এরপর এরা যখন হঠাৎই একটি অন্যটির থেকে সবেগে সরে আসে তখনই ভূমিকম্পের সূচনা হয়।
বিজ্ঞানীরা ২০০৩ সাল থেকেই জিপিএস-এর সাহায্যে ছোট ছোট ভূ-আন্দোলনের ওপর নজর রাখছিলেন। সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে তারা দেখেছেন, বাংলাদেশের প‍ূর্বাঞ্চল এবং পূর্ব ভারতের একাংশ ক্রমশ মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলের দিকে সরে যাচ্ছে। এই সরে যাওয়ার গতি বছরে ৪৬ মিলিমিটার। এর ফলে যে বিপুল চাপ তৈরি হচ্ছে তা মিয়ানমারের ভূপৃষ্ঠের ওপরের ফল্টে জমা হচ্ছে। আর বাকি যে চাপ তা বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দূরত্বকে কমিয়ে আনছে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, ‘সাবডাকশন তৈরি হচ্ছে’। তা হিসাব করে দেখেছেন, এর ফলে ২৪ হাজার বর্গমাইল এলাকায় তার প্রভাব পড়ছে। আর বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাও এর আওতাধায় পড়ে। যেখানে দেড়কোটির বেশি মানুষের বসবাস।
গবেষক দলটির প্রধান মাইকেল স্টেকলার (Michael Steckler)। যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের Lamont-Doherty Earth Observatory –র বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক। তাঁর ভাষায়: ‘আমাদের মধ্যে কেউ কেউ বহুদিন ধরেই এমন বিপদের আশঙ্কা করে আসছিলাম। কিন্তু আমাদের হাতে পর্যাপ্ত ড্যাটা বা মডেল ছিল না।’
কিন্তু যদি তা ঘটেই যায় তাহলে এর ফল হবে ভয়াবহ। এই গবেষক দলে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ূন আখতার। তিনি এ বিষয়ে বলেন, ‘‘বাংলাদেশ এ মুহূর্তে কোনো প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প (megathrust earthquake) মোকাবেলার জন্য প্রস্তত নয়। দুর্বল কাঠামোর বাড়িঘর-স্থাপনা, বিপুল জনসংখ্যা আর বিপুল গতিতে চলা অবকাঠামো নির্মাণযজ্ঞই বলে দেয় এমন ভূমিকম্প হলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হবে।’’
তিনি আরও বলেন:  ‘‘ বাংলাদেশের সর্বত্রই জনসংখ্যার ঘনত্ব মাত্রাতিরিক্ত। সবকটি প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র, ভারী শিল্প কারখানা, সবক’টি বিদ্যুৎকেন্দ্রই সম্ভাব্য ভূমিকম্পস্থলের খুব কাছে অবস্থিত। ভূমিকম্প হলে এসবকিছুই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। আর ঢাকায় ধ্বংসলীলা যে কি ভয়াবহ হবে তা আমাদের কল্পনারও বাইরে। এটি আর বসবাসযোগ্য থাকবে না। ’’