Dhaka chek poast.jpgরাজধানীর গুলশান-২ এর ৭৯ নম্বর রোডের রক্তাক্ত হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্ট এবং কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় ঈদগাহে হামলার ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নগরীজুড়ে বাড়তি পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি মাঠে রয়েছে র‌্যাপিড এ্যাকশান ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ও আনসার বাহিনী।
তিন শতাধিক চেকপোস্টের পাশাপাশি নগরীর মোড়ে মোড়ে অবস্থান করছে বাড়তি পুলিশ সদস্য। র‌্যাব-পুলিশের মোবাইল পেট্রোল ও বাইক পেট্রোল টিম নজর রাখছেন শহরজুড়ে। বিদেশিদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কূটনীতিক পাড়াসহ বিদেশি নাগরিকদের নজরদারি করতে কাজ করছে পুলিশের বিশেষ টিম।
সরেজমিন দেখা যায়, নগরীর মোড়ে মোড়ে ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বসানো হয়েছে র‌্যাব-পুলিশের চেকপোস্ট। চেকপোস্টগুলোতে পুলিশের বাড়তি নজরদারি লক্ষ্য করা গেছে। যাকেই সন্দেহ হচ্ছে তাকেই তল্লাশি করছেন পুলিশ সদস্যরা। চেকপোস্টে পুলিশদের অনগার্ড দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ৬টি বিভাগকে অর্ধশতাধিক জোনে ভাগ করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোড়দার করা হয়েছে। শহরজুড়ে র‌্যাব-পুলিশের ৩ শতাধিক চেকপোস্টে যানবাহন ও জনসাধারণকে তল্লাশি করা হচ্ছে। গত ১ জুলাই গুলশানে ও ঈদের দিন শোলাকিয়ার ময়দানে জঙ্গি হামলার ঘটনার পর চেকপোস্টগুলোতে যেন ‘অন গার্ড’ দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা আসে।
অর্থাৎ চেকপোস্টগুলোতে পুলিশ সদস্যরা যখন সন্দেহভাজনদের তল্লাশি করবেন, তখন তাদের পিছনে আরও একজন পুলিশ সদস্য আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে দাঁড়িয়ে থাকবেন এবং আরও পিছনে অন্য একজন পুলিশ সদস্য লাঠি বা অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত থাকবেন। যদি তল্লাশির সময় সন্দেহভাজনদের কেউ পালানোর বা হামলার চেষ্টা করে তাহলে পিছনে থাকা পুলিশ সদস্য তাকে গুলি করবেন। কেউ যদি গাড়ি বা মোটরসাইকেল করে পালাতে যায় তাহলেও তাদের থামানোর জন্য গুলি করবেন পিছনে থাকা ওই পুলিশ সদস্য। শেষে দাঁড়িয়ে থাকা লাঠি বা অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত পুলিশ সদস্যের দায়িত্ব থাকবে, সামনে থাকা পুলিশ সদস্যদের কেউ এড়িয়ে যেতে সক্ষম হলে তাকে যে কোনোভাবে আটকানো।
গুলশান, শোলাকিয়াসহ সম্প্রতি কয়েকটি জঙ্গি হামলায় বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য হতাহতের ঘটনা ঘটে। সূত্র জানায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিজেদের মধ্যে আর কোনো ক্ষতি দেখতে চান না। বিপদজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেই সরাসরি গুলি করার নির্দেশনা দেওয়া আছে সদস্যদের।
চেকপোস্টে পুলিশের বাড়তি নজরদারিতে রাজধানীবাসী সন্তুষ্ট হলেও অনেকে এ নিয়ে আরেকটু সতর্ক হওয়ার কথা বলছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি মোটরসাইকেলে করে যাচ্ছিলাম। আমার কাঁধে ব্যাগ ছিল। পুলিশ আমাকে থামিয়ে ব্যাগ দেখতে চায়। আমি ব্যাগ খুলছি আর এক পুলিশ সদস্য পেছন থেকে বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাকে দেখে খুব চিন্তিত মনে হচ্ছিল। যা রীতিমত ভয় পাওয়ার মত। এভাবে সারাদিনে অসংখ্যবার আমাকে তল্লাশির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।’
র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান জানান, শুধু রাজধানীতে নয়, দেশব্যাপীই র‌্যাবের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। নাশকতা ও জঙ্গি তৎপরতা রোধে গোয়েন্দা কার্যক্রম বাড়ানোসহ র‌্যাবের টহলও বৃদ্ধি করা হয়েছে।
চেকপোস্টের পাশাপাশি নগরীর মোড়ে মোড়ে অবস্থান করছে বাড়তি পুলিশ সদস্য। গাড়িতে র‌্যাব-পুলিশের মোবাইল পেট্রোল টিমের রয়েছে কড়া নজরদারি। এ ছাড়া পুলিশের বাইক পেট্রোল টিম রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে পুলিশের একসঙ্গে দুইটি মোটরসাইকেল ঘুরে ঘুরে নজরদারি করতে দেখা গেছে। প্রতিটি মোটরসাইকেলে রয়েছেন ২ জন করে পুলিশ সদস্য।
ডিএমপি তেজগাঁও জোনের উপ-কমিশনার (ডিসি) বিপ্লব কুমার সরকার জানান, প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এলাকা ভিত্তিক সকল ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া রয়েছে। পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি পুলিশের মোবাইল পেট্রোল টিম, মোটরবাইক পেট্রোল, চেকপোস্ট, ফুট পেট্রোল টিম কাজ করছে সারা শহরজুড়ে। চেকপোস্ট অনেকগুলো জোনে ভাগ করে বসানো হয়েছে।
রাজধানীর প্রবেশপথ গাবতলী, উত্তরা, আবদুল্লাহপুর ও যাত্রাবাড়ী এলাকাতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কমলাপুর রেল স্টেশন ও সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে যাত্রীদের পুলিশের তল্লাশির মধ্য দিয়ে যেতে দেখা গেছে। নাশকতার উদ্দেশ্যে ঢাকায় প্রবেশ বা ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া এড়াতেই এই বাড়তি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কমলাপুর রেল স্টেশন ও সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, স্টেশনের প্রবেশ পথেই বসানো হয়েছে পুলিশের আর্চওয়ে। এর সামনে দুই পাশে অস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন পুলিশ সদস্যরা। স্টেশনে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় সবাইকে আর্চওয়ের ভেতর দিয়ে আসতে হচ্ছে। যাকে সন্দেহ হচ্ছে তাকে তল্লাশি করে ছাড়া হচ্ছে। প্রয়োজনে যাত্রীদের সঙ্গে থাকা ব্যাগ খুলে চেক করা হচ্ছে। এ ছাড়াও সিসিটিভি ক্যামেরা দিয়ে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করাও হচ্ছে।
কমলাপুর রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল মজিদ বলেন, ‘জঙ্গি নাশকতা এড়াতে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে শতভাগ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক যাত্রীকে তল্লাশি করে স্টেশন থেকে বের করা হচ্ছে ও স্টেশনে প্রবেশ করানো হচ্ছে। এ ছাড়া ট্রেনের ভেতরেও আমাদের বাড়তি নজরদারি রয়েছে।’
হামলার পর থেকে গুলশান, বনানী, উত্তরা, বারিধারাসহ কূটনীতিক পাড়ার নিরাপত্তা ঢেলে সাজানো হয়েছে। দূতাবাসগুলোর সামনে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, ইরান, কাতারসহ বিভিন্ন দূতাবাসের সামনে অনগার্ডে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের। র‌্যাব-পুলিশের পাশাপাশি মাঠে নামানো হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ও আনসার বাহিনীর সদস্যদের।
গুলশান এলাকায় প্রবেশের দুটি পথে বসানো হয়েছে ৪টি চেকপোস্ট। প্রতিটি চেকপোস্টের দায়িত্বে একজন করে পুলিশের সিনিয়র কর্মকর্তা রয়েছেন। রাস্তার মোড়ে মোড়েই পুলিশ সদস্যরা অবস্থান করে সার্বক্ষণিক নজর রাখছেন জনসাধারণের ওপর। ঘটনাস্থল ৭৯ নম্বর সড়কের আশপাশের কয়েকটি সড়কে এখনো যানবাহন চলাচলে নিয়ন্ত্রণ রাখা হয়েছে। এত দিন হলুদ প্লেটে নম্বরযুক্ত কূটনীতিক এবং বিভিন্ন দাতা ও সাহায্য সংস্থার গাড়ি তল্লাশি করা না হলেও এখন থেকে সব গাড়িকেই তল্লাশির আওতায় আনা হয়েছে। জনসাধারণকেও সন্দেহ হলে পুলিশি তল্লাশির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। কোনো কারণ ছাড়া অযথা চলাফেরা না করতে অনুরোধ জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। গুলশানের নিকেতন এলাকায় প্রবেশ-বের হওয়ার মুখগুলোতে পুলিশের অতিরিক্ত চেকপোস্ট বসানো হয়েছে।
কূটনৈতিক নিরাপত্তা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) জসিম উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘গুলশান, বনানী ও বারিধারা এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের তিনটি বিভাগ যৌথভাবে কাজ করছে। গুলশান বিভাগ ও কূটনৈতিক বিভাগের পুলিশের সঙ্গে এপিবিএন সমন্বয় করে কাজ করছে। এ এলাকায় পুলিশের সংখ্যা (ইনহ্যানস) বাড়ানো, সিসিটিভি ক্যামেরায় পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে সাদাপোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি। গুলশান পুলিশ, ডিপ্লোমেটিক ডিভিশন, এপিবিএন, র‌্যাবসহ কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা মনিটর করছে। এমনকি দূতাবাসগুলো চাইলে নিরাপত্তার স্বার্থে তাদেরকে স্কটও দেওয়া হবে।’
বিদেশিদের নিরাপত্তায় পুলিশের বিশেষ টিম কাজ করছে নগরজুড়ে। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সারা দেশে বৈধভাবে অবস্থান করছে ১১ হাজার ৯২৫ বিদেশি। বিদেশিদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে। প্রতিদিন তাদের বাসা ও অফিসে গিয়ে খোঁজ নিচ্ছেন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তারা। গুলশান-বারিধারা এলাকার নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওই এলাকার মধ্যে ব্যবসাসহ যে কোনো কাজ করতে হলে সোসাইটির কাছ থেকে পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।
ডিসি জসিম উদ্দিন আরও বলেন, ‘বিদেশি নাগরিকদের আগেও কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে রাখা হতো। তবে এখন এ নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি বেড়েছে মনিটরিং। দূতাবাসগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো হয়েছে। তাদের জনবহুল এলাকা ছেড়ে অধিক নিরাপত্তার এ ডিপ্লোমেটিক জোনে চলে আসতে বলা হচ্ছে।’
এদিকে কূটনৈতিক এলাকার অবৈধ সব হোটেল-রেস্তোরাঁ ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ১০ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ তথ্য জানান শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু।
তিনি বলেন, ‘গুলশান আবাসিক এলাকায় রেস্তোরাঁ, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজসহ অনুমোদনহীন বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেবে সরকার। আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। গুলশান আবাসিক এলাকা ছিল। সেখানে যত্রতত্র রেস্টুরেন্ট, রেস্তোরাঁ, হাসপাতাল, বিভিন্ন রকম স্কুল-কলেজ গড়ে উঠেছে। এগুলোকে তদারকি করে একটা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তভাবে অনুমোদন ছাড়া যেগুলো হয়েছে সেগুলো বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।’
এ ছাড়া ভিআইপি এলাকাগুলো যেমন- মন্ত্রী পাড়া, সচিবালয়, সংসদ ভবন এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাড়তি সতর্কতা লক্ষ্য করা গেছে। মন্ত্রী পাড়া হিসেবে পরিচিত রাজধানীর মিন্টো রোডে, বেইলি রোড ও হেয়ার রোড এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। হোটেল শেরাটন এলাকা, রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন, গোয়েন্দা কার্যালয় ও ইস্কাটনের সামনে দিয়ে মিন্টো রোডে প্রবেশের প্রতিটি রাস্তায় যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। বিশেষ কিছু স্থানের প্রবেশমুখে ব্যারিকেড বসিয়ে যানবাহনে তল্লাশি করেই যেতে দেওয়া হচ্ছে। যারা পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন তাদেরও তল্লাশি করে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে। সিসি টিভির মাধ্যমে সন্দেহভাজনদের গতিবিধি মনিটরিং করা হচ্ছে।
ডিএমপির উপ-কমিশনার (গণমাধ্যম) মো. মাসুদুর রহমান বলেন, গুলশানে জিম্মি ঘটনার কারণে পুরো রাজধানী জুড়েই নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। যে কোনো ধরনের অপরাধ মোকাবেলায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশ।