pakistan.jpg১৯৯৬ সালে ঐতিহ্যবাহী লর্ডসে সর্বশেষ টেস্ট ম্যাচ জিতেছিল পাকিস্তান। ২০ বছর পর এই ভেন্যুতে পাকিস্তানের জয়টি স্মরণীয় হয়ে থাকবে বেশকটি বিশেষ কারণে। এরমধ্যে লর্ডসে পাকিস্তান অধিনায়ক মিসবাহ-উল হকের অভিষেকেই সেঞ্চুরি এবং মোহাম্মদ আমিরের দলে ফেরা অন্যতম। ২০১০ সালে এই মাঠেই স্পট ফিক্সিংয়ের কারণে ক্যারিয়ার থেকে ৫টি মূল্যবান বছর হারিয়ে ফেলেন প্রতিভাবান এই পেসার।
পাকিস্তানের লর্ডস জয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানটি রাখেন ইয়াসির শাহ। ডোপ টেস্টের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে এসে ইংল্যান্ডকে যেন একাই হারিয়ে দিলেন তিনি। তার ঘূর্ণিতে একে একে কুপোকাত হলেন ইংলিশ ব্যাটসম্যানরা। ইংল্যান্ডের মতো বৈরী পরিবেশে দুই ইনিংসে ১০ উইকেট নিয়ে নতুন ইতিহাস তৈরি করেছেন তিনি।
চলুন সংখ্যাত্বত্ত্বে পাকিস্তানের লর্ডস জয়টি জেনে নেই:
১. লডর্সে নিজের প্রথম টেস্টেই ক্যারিয়ারের ১০ম সেঞ্চুরি করেন পাকিস্তান অধিনায়ক মিসবাহ-উল হক।
২. নাটকীয়ভাবে সেই লর্ডসে আবারও টেস্টে ফিরে নিজের সেরাটা জানান দিলেন মোহাম্মদ আমির। পাকিস্তানের এই টেস্টে জয়ের ম্যাচে তার বোলিং স্পেলে দুটি ক্যাচ মিস হয়। আর ওই দুইটি ক্যাচই ছিল ইংল্যান্ড অধিনায়ক অ্যালিস্টার কুকের।
৪. লডর্সে ১৬টি টেস্ট ম্যাচের মধ্যে এটি পাকিস্তানের চতুর্থ জয়।
১০. লডর্সে দুই ইনিংসে ১৪১ রানের খরচায় ১০ উইকেট পেয়েছেন পাকিস্তানি লেগ স্পিনার ইয়াসির শাহ। লর্ডসে এশিয়ার কোনো বোলার হিসেবে প্রথম ১০ উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব দেখালেন তিনি।
২০. লর্ডসে ২০ বছর আগে সর্বশেষ কোনো টেস্ট ম্যাচে জয় পেয়েছিল পাকিস্তান। এর আগে ১৯৯৬ সালে ওয়াসিম আকরামের নেতৃত্বে জয় পেয়েছিল পাকিস্তান। হোম অব ক্রিকেট খ্যাত এই ভেন্যুতে জয় পাওয়া মিসবাহ চতুর্থ অধিনায়ক। এর আগে ইমরান খান (১৯৮২), জাভেদ মিয়াঁদাদ (১৯৯২) জয় পান।
৭৫. লর্ডসের এই ম্যাচে বোলারদের নৈপুণ্যে ৭৫ রানে জয় পায় পাকিস্তান।

অধিনায়ক মিসবাহর সেরা জয়
Misbah-BG.jpgলর্ডস টেস্টে ৭৫ রানের ঐতিহাসিক জয়ে দলের ভূয়সী প্রশংসায় মেতেছেন মিসবাহ উল হক। অধিনায়ক হিসেবে এটিকে ক্যারিয়ারের সেরা জয়ের তালিকায় রাখছেন ৪২ বছর বয়সী এ অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান। ২৮৩ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে ২০৭ রানে গুটিয়ে যায় ইংল্যান্ডের ইনিংস। মিসবাহর নেতৃত্বের লর্ডসে ২০ বছরের মধ্যে প্রথম টেস্ট জয়ের উল্লাসে মাতে টিম পাকিস্তান। এই ভেন্যুতেই ২০১০ সালে স্পট ফিক্সিং কেলেঙ্কারির শিকার হয়েছিল পাকিস্তানের ক্রিকেট। ভুলে থাকার মতো ওই ঘটনা পেছনে ফেলে ছয় বছর পর চার ম্যাচ টেস্ট সিরিজের শুরুতেই ঘুরে দাঁড়ালো সফরকারীরা। পেস তারকা মোহাম্মদ আমিরেরও টেস্টে প্রত্যাবর্তন ঘটে।
১৫ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র ইংল্যান্ডেই টেস্ট ম্যাচ খেলা হয়নি মিসবাহর। দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে ‘অভিষেকটা’ স্মরণীয় করেই রাখেন তিনি। গড়েন সবচেয়ে বয়স্ক ক্রিকেটার হয়ে টেস্ট শতকের (১১৪) রেকর্ড। একদিন হাতে রেখেই দলও তুলে নেয় ঐতিহাসিক জয়।
দলের এমন পারফরম্যান্সে বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন মিসবাহ, ‘২০১০ ঘটনার (ফিক্সিং) পর এটা ছিল অসাধারণভাবে ঘুরে দাঁড়ানো জয়। এই টিম সত্যিকারের দায়িত্ব নিয়েছে এবং খেলোয়াড়রা সবাই খেলাটির প্রতি অনেক সম্মান প্রদর্শন করেছে। ছয় বছর ধরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে এবং অনেক জয় এনে দিয়েছে। মাঠ ও মাঠের বাইরে শৃঙ্ক্ষলা খুবই ভালো হচ্ছে এবং শীর্ষ দলের বিপক্ষে জয় পাচ্ছে।’
‘অধিনায়ক হিসেবে এবং পাকিস্তান দলের জন্য এটি অন্যতম সেরা জয়ের একটি। সবাই প্রতিদ্বন্দ্বিপূর্ণ মনোভাব দেখিয়ে যার যার সেরাটা দিয়েছে। বিশেষ করে আজকে (চতুর্থ দিন) মানসিকভাবে সবাই শক্ত অবস্থানে ছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় ইনিংসে ইয়াসির শাহ ও ফাস্ট বোলাররা দুর্দান্ত বোলিং করেছে। সামগ্রিকভাবে এটা আমাদের জন্য একটি স্মরণীয় জয়।’

লর্ডস সাফল্যে র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে ইয়াসির
yasir sha.jpgলর্ডস টেস্টে দুর্দান্ত বোলিংয়ে ম্যাচ সেরার পুরস্কার জেতেন। এবার ক্যারিয়ারের অনন্য চূড়ায় বসলেন। টেস্ট র‌্যাংকিংয়ে বিশ্বের এক নম্বর বোলার যে এখন পাকিস্তানের ইয়াসির শাহ। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৭৫ রানের ঐতিহাসিক জয়ে সবচেয়ে বড় অবদানই রাখেন ৩০ বছর বয়সী এ লেগ স্পিনার। দীর্ঘ ২০ বছর পর লর্ডসে টেস্ট জেতার উল্লাসে মাতে টিম পাকিস্তান। লেগ স্পিনার হিসেবে শেন ওয়ার্ন ২০০৫ সালে সর্বশেষ টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর বোলার হয়েছিলেন।
মুশতাক আহমেদের (১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে) পর দ্বিতীয় পাকিস্তানি বোলার হিসেবে র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষ ওঠার গৌরব অর্জন করলেন ইয়াসির। সবশেষ (২০০৫ সালের ডিসেম্বরে) লেগ স্পিনারদের মধ্যে শেন ওয়ার্নই নাম্বার ওয়ান পজিশনে ছিলেন।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের দুই ইনিংসে মোট ১০ উইকেট পান ইয়াসির। তার দারুণ ঘূর্ণিতে দিশেহারা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৭৫ রানে জয় পায় পাকিস্তান। দলের হয়ে ১৪১ রানের খরচায় ১০ উইকেট নেওয়ায় ইয়াসির পান ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার। অন্যদিকে কাঁধের ইনজুরির কারণে এই টেস্টে খেলতে পারেননি এতদিন র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থাকা অ্যান্ডারসন।
নিজের ১৩ টেস্টের ক্যারিয়ারে ৮৬ উইকেট পেয়েছেন ইয়াসির। লর্ডস টেস্টে তার নৈপুণ্যেই ২০ বছর পর ক্রিকেট-তীর্থে জয় পেয়েছে পাকিস্তান। দলের জয়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন দুটি রেকর্ডের মালিকও হন ইয়াসির। ইতিহাসের দ্বিতীয় লেগ স্পিনার হিসেবে লর্ডসে ১০ উইকেটের কীর্তি ওঠে তার গলায়। এর আগে ১৯৪৭ সালে ইংলিশ লেগ স্পিনার ডাগ রাইট দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথমবার ১০ উইকেট পেয়েছিলেন। লর্ডসে বিদেশি কোনো বোলারের এটাই সর্ব্বোচ সাফল্য।
তাছাড়া ইয়াসির ভেঙে ফেলেছেন টেস্টে ১২৩ বছর টিকে থাকা একটি রেকর্ডও। প্রথম ১৩ টেস্টে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারের রেকর্ড এখন তার। ভেঙেছেন অস্ট্রেলিয়ার চার্লি টার্নারের রেকর্ড।
ইংল্যান্ড সফরের আগে র‌্যাঙ্কিংয়ের চার নম্বর অবস্থানে ছিলেন স্পিনার ইয়াসির। লর্ডসের দুই ইনিংসে দারুণ সাফল্যে তিনজনকে পেছনে ফেলেছেন তিনি। প্রথম ইনিংসে ৭২ রানে ৬ উইকেটের পর দ্বিতীয় ইনিংসে ৬৯ রানে ৪ উইকেট পান তিনি।
ইনজুরির কারণে খেলতে না পারা অ্যান্ডারসন র‌্যাঙ্কিয়ের তৃতীয় অবস্থানে চলে গেছেন। টেস্টের দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছেন রবিচন্দ্রন অশ্বিন। আর চতুর্থ অবস্থানে আছেন স্টুয়ার্ড ব্রুড।