roston chaij (westindis).jpgমিড উইকেটে মিসফিল্ড, একটি রান। শতক ছুঁয়ে ব্যাটসম্যানের মুখে আকর্ণ বিস্তৃত হাসি। দুই হাত আড়াআড়ি ওপরে তুলে ব্যতিক্রমী উদযাপন। উন্মত্ত গ্যালারি, ব্যালকনিতে সতীর্থদের উচ্ছ্বাস। স্বয়ং ভিভ রিচার্ডস মাঠের বাইরে থেকে গলা ফাটিয়ে যাচ্ছেন, ‘রোস্টন…রোস্টন!’
খাদের কিনারায় দল। অসহায় আত্মসমর্পণ করেছেন অভিজ্ঞ সতীর্থরা। ভারতীয় পেস ও স্পিনের সামনে থরথর কাঁপছে ক্যারিবিয়ান গর্ব। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া সেই গর্বকেই বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে গেলেন একজন, যিনি খেলতে নেমেছেন মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট। রোস্টন চেইজ মহাকাব্যিক অপরাজিত শতকে দলকে এনে দিলেন অসাধারণ ড্র, যে ড্র আসলে জয়েরই সমান!
ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে কখনোই টানা দুটি টেস্ট জেতেনি ভারত। তবে এবারের সিরিজে অ্যান্টিগা টেস্টের পর জ্যামাইকা টেস্টেও জয়ের দিকেই এগিয়ে ছিল সফরকারীরা। কিন্তু শেষ দিন রোস্টন চেইজের দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে ড্রতেই সন্তুষ্ট থাকতে হলো বিরাট কোহলিদের। বৃষ্টি বিঘ্নিত চতুর্থ দিনে উড়ে গিয়েছিল দলের টপ অর্ডার। ৪৮ রানেই নেই প্রথম ৪ ব্যাটসম্যান! আবহাওয়া সহায় না হলে ইনিংস পরাজয়ই মনে হচ্ছিল একমাত্র নিয়তি। আবহাওয়ার অনুকম্পা লাগেনি, দলের নিয়তি নিজ ব্যাটেই লিখলেন চেইজ।
আগেরদিন ১৫.৫ ওভারেই ৪ উইকেট হারিয়েছিল যে দল, শেষ দিনে ৮৮ ওভারে হারাল তারা মাত্র ২ উইকেট। ১৩৭ রানের অপরাজিত ইনিংসে দলের ঘুরে দাঁড়ানোয় নেতৃত্ব দিয়েছেন চেইজ। দারুণ দুটি অর্ধশতকে যোগ্য সঙ্গ দিয়েছেন শেন ডাওরিচ ও অধিনায়ক জেসন হোল্ডার।
সেঞ্চুরির আগে অফ স্পিনে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন চেইজ। গ্যারি সোবার্সের ৫০ বছর পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের কেউ করে দেখাল ‘ডাবল’। ১৯৬৬ সালের অগাস্টেই একই টেস্টে শতক ও ৫ উইকেট পেয়েছিলেন সোবার্স।ওয়েস্ট ইন্ডিজের ঘুরে দাঁড়ানোর শুরুটা জার্মেইন ব্ল্যাকউডের হাত ধরে। প্রথম ইনিংসের মতোই পাল্টা আক্রমণের পথ বেছে নেন তরুণ ব্যাটসম্যান। ওয়ানডের গতিতে খেলে আউট হন অর্ধশতকের পরপরই (৫৪ বলে ৬৩)।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের পরাজয় তখন মনে হচ্ছিল স্রেফ সময়ের ব্যাপার। লোয়ার-মিডল অর্ডারকে নিয়ে সেখান থেকেই চেইজের প্রতিরোধ। সেটি শুধু মাথা নিচু করে উইকেটে সময় কাটিয়ে নয়, রানও এসেছে দারুণ গতিতে। ষষ্ঠ উইকেটে ডাওরিচ ও চেইজের ১৪৪ রানের জুটিতে ওভারপ্রতি রান এসেছে ৩.৭৭।
অভিজ্ঞ দিনেশ রামদিনকে বাদ দিয়ে দলে নেওয়া হয়েছিল ডাওরিচকে। এই ইনিংসে দারুণ ব্যাট করে উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান প্রমাণ করলেন নিজের যোগ্যতা। আম্পায়ার ইয়ান গুল্ডের বাজে সিদ্ধান্তে আউট না হলে হয়ত শতকও করতে পারতেন। অমিত মিশ্রর বল ব্যাটে লাগলেও আম্পায়ার দেন এলবিডব্লিউ, ডাওরিচ ১১৪ বলে ৭৪।
চেইজ তখন ৯৯ রানে দাঁড়িয়ে। খানিক পরই ছুঁয়ে ফেলেন মাইলফলক। তবে পরাজয়ের চোখরাঙানি ছিল তখনও। চেইজ তাই শতক ছুঁয়ে হাল ছাড়েননি লড়াইয়ে। এবার সঙ্গী পান হোল্ডারকে। সপ্তম উইকেটে দুজনের অবিচ্ছিন্ন জুটি ১০৩ রানের। তাতে নিশ্চিত হয়ে যায় ড্র। সেই ১৯৯৮ সালের পর এই প্রথম ড্র দেখল জ্যামাইকার স্যাবাইনা পার্ক।ডাওরিচের মতো হোল্ডারও ছিলেন বেশ আক্রমণাত্মক। ৯৯ বলে অপরাজিত ৬৪। তবে মূল নায়ক চেইজই। ২৪ বছর বয়সী বারবাডিয়ান অলরাউন্ডার দেখিয়েছেন নিখুঁত ডিফেন্স, খেলছেন দৃষ্টিনন্দন সব শট, প্রমাণ রেখেছেন দারুণ সাহসিকতা ও টেম্পারমেন্টের। প্রায় ৬ ঘণ্টায় ২৬৯ বলে অপরাজিত ১৩৭।
প্রথম টেস্ট আর এই টেস্টের বেশিরভাগ জুড়ে ভারতীয় দাপটে অসহায় ক্যারিবিয়ানরা অবশেষে দেখাল, কিছুটা লড়াই অবশিষ্ট আছে তাদের! তৃতীয় টেস্ট মঙ্গলবার থেকে সেন্ট লুসিয়ায়।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:
ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১ম ইনিংস: ১৯৬
ভারত ১ম ইনিংস: ৫০০/৯ (ইনিংস ঘোষণা)
ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২য় ইনিংস: (আগের দিন ৪৮/৪) (ব্র্যাথওয়েইট ২৩, চন্দ্রিকা ১, ব্রাভো ২০, স্যামুয়েলস ০, ব্ল্যাকউড ৬৩, চেইজ ১৩৭*, ডাওরিচ ৭৪, হোল্ডার ৬৪*; ইশান্ত ১/৫৬, শামি ২/৮২, মিশ্র ২/৯০, যাদব ০/৪৪, অশ্বিন ১/১১৪)।
ফল: ম্যাচ ড্র
ম্যান অব দা ম্যাচ: রোস্টন চেইজ
সিরিজ: ৪ ম্যাচ সিরিজে ভারত ১-০ তে এগিয়ে।