নির্বাচন মওসুম প্রেমেরও মওসুম যুক্তরাষ্ট্রে!


US-Vote-love.jpgযুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন মৌসুম কিন্তু প্রেমেরও মওসুম। নির্বাচনের প্রাইমারি শুরু হয় সেই এপ্রিলে। শেষ ভোটাভুটি হয় নভেম্বরে। মাঝে কেটে যায় পুরো সাতটি মাস। এই সময়ের মধ্যে অাটলান্টিকের পানি বয়ে যায় হাজার-লক্ষ মাইল। শীতের আমেজ কেটে গ্রীস্ম আসে, গ্রীস্ম ছাড়িয়ে বর্ষা ছুঁয়ে ফের শীত নামে প্রকৃতিতে।
এই সময়ের মধ্যে নির্বাচনের কর্মীরা একসঙ্গে ঘোরে, মাঠে, ঘাটে পথে প্রান্তরে ছোটে ভোট চায়, স্লোগান দেয়, লিফলেট বিলি করে। ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয় ভোটের আহ্বান, ভোটারের তালিকা, তথ্য-তালাশ।
একটি কথা সকল প্রার্থীর জন্যই সত্য এই নির্বাচনী কাজের নিয়োগে তারা বেছে নেন তারুণ্যকেই। ফলে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী এই কাজে নিয়োজিত হয়। এই তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে তারা যেমন নির্বাচনকে করে তোলে আনন্দমুখর। তেমনি নিজেরাও থাকে আনন্দ উদ্বেলিত। ফলে এই সময়ের মধ্যে তারা নিজেদের মধ্যে বসচা, খুনসুটিতে জড়ায়, ভালোবাসায়ও জড়িয়ে যায়।
প্রতিটি প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনেই একই চিত্র। পছন্দের প্রার্থীকে জিতিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি অনেকেই বেছে ফেলেন পছন্দের পাত্র-পাত্রী। আর তার মধ্যেই নির্বাচনের মওসুম হয়ে ওঠে প্রেমেরও মওসুম যা বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়। গড়ে ওঠে রাজনীতিক দম্পতি।
যুক্তরাষ্ট্রের এমন অনেক দম্পতি রয়েছেন যারা এখন ছেলে-মেয়ে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, যাদের বিয়ে হয়ে নির্বাচনী সম্পর্কের জেরে।
স্যাডি ওয়েনার ডেমোক্র্যাটদের সেনেটরিয়াল ক্যাম্পেইন কমিটির পরিচালক। স্বামী জাচারি ওয়েইনবার্গের সঙ্গে তার প্রেম হয় ২০১২ সালে বারাক ওবামার দ্বিতীয় দফা নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের সময়। যাদের প্রথম দেখা হয় ওয়েইনবার্গের বোনের বাসায়। এই বোনের সঙ্গে ওয়েনারের পরিচয় আরও আগে থেকে। তারা দুজন সেনেটরিয়াল ক্যাম্পেইনে ছিলেন একসঙ্গে।
তবে এও ঘটে অনেকের সম্পর্কটি হয় স্রেফ ওই ক্যাম্পেইনের সময়টুকুর জন্য। ক্যাম্পেইন শেষ তো সম্পর্কও শেষ।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিকেশনের শিক্ষক জন এ ক্রোসনিকের মতে রাজনৈতিক ক্যাম্পেইনগুলো স্বল্পমেয়াদী প্রেম আর প্রেমিক প্রেমিকার চারণক্ষেত্র।
তিনি বলেন, কেউ যখন একটি দলে থাকে তখন তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের চেয়ে মতের মিলটাই বেশি থাকে। এতে তাদের ভেতর উত্তেজনার উদ্রেক ঘটে। একে ঠিক রোমান্স বলা চলে না, তবে নিঃসন্দেহে তা হরমোনজনিত।
“ক্যাম্পেইনের মাঝে প্রতিনিয়ত নাটকীয় কিছু ঘটতে থাকে। এতে নানা জন নানাভাবে পারফর্ম করে। আর তাতে অপররা মুগ্ধ হন। এই মুগ্ধতার মধ্য দিয়ে হরমোনজনিত উত্তেজনা বাড়তেই থাকে। ফলে একসময় তা মোহ বা প্রেমে রূপ নেয়,” বলেন ক্রোসনিক। নির্বাচন শেষ হলে এদের সম্পর্কের ইতিও ঘটে।
তবে কেউ আবার সেই সম্পর্ক চাঙ্গা করেন অনেক পরে। এমনই এক দম্পতি রিক সিগার ও কিনসে ক্যাসি। জন কেরির ২০০৪ সালের নির্বাচনে তারা ক্যাম্পেইনে ছিলেন, কিছুদিনের রোম্যান্সেও জড়িয়ে পড়েছিলেন। ক্যাম্পেইনের পর থেকে সম্পর্ক নেই। কিন্তু এই জুলাইয়ে তাদের বিয়ে হয়ে গেলো। মিস ক্যাসি এখন পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলরে ডেপুটি চিফ অব স্টাফ হিসেবে কাজ করছেন আর মি. সিগার কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যাললের পরিচালক পদে রয়েছেন। ২০০৪ সালের পরে তাদের দ্বিতীয়বার দেখা হয় ২০০৮ এ প্রেসিডেন্ট ওবামার প্রথম দফার ক্যাম্পেইনের সময়। আর ২০১০ সালে এসে তারা সম্পর্কটিকে নিয়ে আরো সিরিয়াস হয়ে ওঠেন ও ২০১৬তে এসে তা বিয়েতে পরিনতি পায়।
ক্যাম্পেইনগুলো হাতেগোনা কিছু লোক থাকে। আর তারা তারাই। ফলে দীর্ঘ একটা সময় এক সঙ্গে থাকতে থাকতে রোমান্সে জড়িয়ে যায়, এটাই স্বাভাবিক, বলেন মি. সিগার।
নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের পল স্লিকার, ২৮, ও নিউজার্সির হোবোকেনের সিহেম মেলা,২৬,’র কথাই ধরুন। গত মার্চে বার্নি স্যান্ডার্সের প্রেসিডেন্সিয়াল প্রার্থীতার ক্যাম্পেইনে তাদের দেখা। মন দেওয়া নেওয়া হয়ে গেছে। ২০১৭তে বিয়ে করবেন বলে মনোস্থির করেছেন।
ড. কারসনের প্রেসিডেন্সিয়াল প্রচেষ্টার ফিল্ড ম্যানেজার ম্যাটে পোসের মতে, ক্যাম্পেইনগুলোতে সম্পর্কে জড়ানোর একটা ক্ষেত্র তৈরি হয়েই থাকে। দিনে ১৮-২০ ঘণ্টা একসঙ্গে কাটাতে হয়। অ্যালকোহল একটা অনিবার্য উপকরণ যা থাকতেই হয়। ফলে নিজের অজান্তেও অনেকে কাছাকাছি হয়ে যায়।
পোসে জানালেন, কারসনের এক ক্যাম্পেইনে একবার বাসে করে তারা ২০০০ মাইল সফর করছিলেন। টানা দুই দিনের সফর। এই সফরে তার সঙ্গে ছিলেন জনা চল্লিশেক কর্মী। যাদের বয়স সবারই ত্রিশ বছরের নিচে। ফলে বাসে তাদের জার্নিটা বসন্তের ছুটির সময়ের মতোই উপভোগ্য হয়ে উঠলো।
তবে পোসের মতে, ক্যাম্পেইনে গড়ে ওঠা সম্পর্কটা স্থায়ী হয় না। এটি আসলে কোনও ভালোবাসার সম্পর্কও না। তিনি বলেন, ‘যদি আপনি ক্যাম্পেইন চলার সময় কাউকে বিয়ে করে ফেলেন, তাহলে ক্যাম্পেইন শেষ হলে তাকে ছেড়ে দিতেও চাইবেন।’
গ্রিন পার্টির ড. জিল স্টেইন ক্যাম্পেইনের ডেপুটি ম্যানেজার গ্লোরিয়া মাত্তেরা আরও একটু গভীরে গিয়ে বললেন, আসলে জড়াজড়ি, চুম্বন এগুলো অনেকের কাছে দীর্ঘসময় ধরে কাজের অংশই হয়ে ওঠে।
এএফএল-সিআইও’র ক্যাম্পেইন ম্যানেজার জিওফ ওয়েট্রোস্কির মতে, নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের সময় যতটা চাপ নিয়ে কাজ করতে হয়, তখন ভূত-ভবিষ্যত নিয়ে ভাবনার সুযোগটা কম থাকে। তখন যে কেউ আসলে ওই সময়টিতে যে তাকে বুঝতে পারবে তাকেই বেছে নেবে।
তবে এর পরেও কিছু আশা বেঁচে থাকে। নির্বাচন শেষ হয়ে গেলে যখন সব ধোয়াশা কেটে যায়, তখন বিবেচনাশক্তি কাজ করতে থাকে। আর অনেকের মধ্যেই বিষয়টি রোমান্সের বাইরের কিছু মনে হয়। মনের টানটা প্রকট হয়ে ওঠে। নির্বাচনের পর দুই জনের দুটি পথ দুই দিকে বেকে গেলেও অনেক পরে হলেও তা আবার এক পথে মিলিত হয়। তাদের কেউ কেউ আবদ্ধ হয়ে পড়ের জীবনের বন্ধনে।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s