রায়ে কেউ খুশি, কেউ বেজার


নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলা

seven_murder20170116155757
বাঁ থেকে- নূর হোসেন, লে. কর্নেল তারেক সাঈদ, মেজর আরিফ ও লে. কমান্ডার এম এম রানা

নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুন মামলার রায়ে ২৩ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও ৯ জনের বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এই রায় নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল অপহরণের পর খুন করে ফেলা সাত জনের স্বজনরা।   নিহত আইনজীবী চন্দন সরকারের গাড়িচালক ইব্রাহিমের বাবা বলেন, ‘রায়ে আমি খুশি না। কারণ এই ঘটনা মূল আসামি মজিবর এখনও ধরা পরেনি। মজিবর আর মজিবরের ছেলে হাক্কা এই দুজনকে শাস্তি দিলে সন্তুষ্ট হতাম।’
নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের বাবা শহীদ চেয়ারম্যান জানান, রায়ে তিনি আংশিক খুশি। মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে মামলার এজাহারে যাদের নাম দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে কয়েকজনের নাম কেটে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। তিন বলেন, ‘ইকবাল ও আশিক মূল পরিকল্পনাকারী ছিল।’
নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেন, ‘আমি রায়ে সন্তুষ্ট। আমরা আশা করবো উচ্চ আদালতে রায়টি বহাল থাকবে এবং দ্রুত রায় কার্যকর হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও স্বজনহারা। তাই স্বজন হারানোর কষ্ট তিনি নিজেও বোঝেন। আমি প্রধানমন্ত্রী কাছে কৃতজ্ঞ এবং পাশাপাশি তাকে আহ্বান জানাবো, রায় কার্যকর করার ব্যাপারে তিনি যেন প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা প্রদান করেন।’
চন্দন সরকার মেয়ে সুষমিতা সরকার বলেন, ‘রায়ে আমি সন্তুষ্ট। উচ্চ আদালতে রায় বহাল থাকবে সেটি আমাদের প্রত্যাশা। ’
এছাড়া নিহত স্বপনের ভাই মিজানুর রহমান ও তাজুলের বাবা আবুল খায়ের তারাও এ রায়ে সন্তুষ্ট প্রকাশ করেছেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইজীবী পিপি অ্যাডভোকেট ওয়াজেদ আলী খোকন বলেন, ‘আদালতে নির্ভুল ও গ্রহণযোগ্য রায় ঘোষণা করা হয়েছে। আমার প্রত্যাশা উচ্চ আদালতেও রায় বহাল থাকবে। এতে ভুক্তভোগীরা ন্যায় বিচার পাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে আমি কোনও চাপ অনুভব করি নাই। এই রায়ে বাংলাদেশ তো বটেই, সারা বিশ্বের মানুষের দৃষ্টি ছিল।’
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমরা আশা করবো উচ্চ আদালতে রায়টি বহাল থাকবে। এই মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। আমারা আশা কববো উচ্চ আদালতেও যথার্থ ন্যায় বিচার পাবো।’
এদিকে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসামিপক্ষের আইনজীবী সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘আবেগপ্রবণ হয়ে রায় দিয়েছেন আদালত। আমার মক্কেল ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয় নাই। আমরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছি।’
আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী সুলতানুজ্জামান বলেন, ‘আমার মক্কেল মনে করেন এই আদালতে তিনি ন্যায়বিচার পাননি। আমরা উচ্চ আদালতে যাবো।’
আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লায় খান সাহেব ওসমান আলী জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সামনে থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২নং ওয়ার্ডের তৎকালীন কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র-২ নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিম অপহৃত হন। পরদিন ২৮ এপ্রিল ফতুল্লা মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন নজরুল ইসলামের স্ত্রী। ওই মামলায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি নূর হোসেনকে প্রধান করে ৬জনকে আসামি করা হয়। এছাড়া আইনজীবী চন্দন সরকারের মেয়ের জামাই বিজয় কুমার পাল বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা মডেল থানায় আরও একটি মামলা করেন। ৩০ এপ্রিল বিকেলে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ৬ জন এবং ১ মে সকালে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়।  পরে স্বজনরা লাশগুলো শনাক্ত করেন।
মামলার চার্জশিটভুক্ত ৩৫ আসামির মধ্যে ১২ জন পলাতক রয়েছেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর  নূর হোসেন, র‌্যাব-১১-এর সাবেক অধিনায়ক লে. কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ মুহাম্মদ, মেজর (অব.) আরিফ হোসেন, নৌ-বাহিনীর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এম এম রানা রয়েছেন।

কার কী সাজা
বহুল আলোচিত সাত খুন মামলায় নূর হোসেন, র‌্যাবের প্রাক্তন তিন কর্মকর্তা লে. কর্নেল তারেক সাঈদ, লে. কমান্ডার এম এম রানা ও মেজর আরিফসহ ২৬ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া আট আসামিকে ১০ বছর করে সাজা ও এক আসামিকে সাত বছরের দণ্ড দেওয়া হয়েছে। মামলায় মোট আসামি ৩৫ জন। তাদের মধ্যে ১২ জন পলাতক রয়েছেন। সোমবার সকাল ১০টার দিকে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক সৈয়দ এনায়েত হোসেন এ আদেশ দেন।
মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্তরা হলেন র‌্যাব-১১ এর প্রাক্তন সিও লে. কর্নেল (বরখাস্তকৃত) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রাক্তন কাউন্সিলর নূর হোসেন, মেজর (বরখাস্তকৃত) আরিফ হোসেন, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার (বরখাস্তকৃত) এম এম রানা, নূর হোসেনের গাড়িচালক মিজানুর রহমান দীপু, করপোরাল মোখলেসুর রহমান, সৈনিক মহিউদ্দিন মুন্সী, ল্যান্স নায়েক হিরা মিয়া, সিপাহি আবু তৈয়ব, সেলিম, সানাউল্লাহ, শাহ জাহান, জালাল উদ্দিন, আসাদুজ্জামান নূর, পূর্নেন্দু বালা, আরিফ হোসেন, আল আমিন, তাজুল ইসলাম, এনামুল, বেলাল হোসেন, শিহাব উদ্দিন, মূর্তজা জামান চার্চিল, আলী মোহাম্মদ, আবুল বাশার, রহম আলী ও এমদাদুল হক।
১০ বছরের সাজাপ্রাপ্তরা হলেন করপোরাল রুহুল আমিন, সৈনিক নুরুজ্জামান, এসআই আবুল কালাম আজাদ, এএসআই বজলুর রহমান, এএসআই আলিম, এএসআই কামাল, কনস্টেবল বাবুল ও কনস্টেবল হাবিব।  সাত বছরের দণ্ড পেয়েছেন হাবিলদার নাসির।
আসামিদের মধ্যে ১২ জন পলাতক রয়েছেন। এদের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিনজন। তারা হলেন- সেলিম, শাহ জাহান ও সানাউল্লাহ সানা।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s