স্বপ্ন দেখার ম্যাচে দুঃস্বপ্নের হার


a13t5668একদিন আগেও উড়তে থাকা শ্বেত পায়রাগুলি হয়ে গেল নির্জীব; ডানা মেলার সামর্থ্য নেই, স্রেফ একটু-আধটু হাওয়ায় দুলুনি! খেলোয়াড়দের শরীরী ভাষার এই বদলই যেন বাংলাদেশের পারফরমান্সের প্রতিচ্ছবি। প্রথম ইনিংসে স্বপ্নকে ছাড়িয়ে যাওয়া টেস্ট ম্যাচের শেষটা হলো দুঃস্বপ্নের বিভীষিকায়। চোটের ছোবল বয়ে এনেছে দুর্ভাগ্য। তবে স্বপ্নের কবর খোঁড়া হয়েছে আসলে অন্য ব্যাটসম্যানদের আত্মঘাতী শটে। মুশফিক-ইমরুলের বীরোচিত নিবেদনের ইনিংসটিই হয়ে রইল সতীর্থদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার আরেকটি নিদর্শন। উপহারগুলো সানন্দেই গ্রহণ করল কিউইরা। ওই মঞ্চেই হলো জয়োৎসব।
চতুর্থ দিন চা বিরতির পরও ম্যাচ এগিয়ে যাচ্ছিলো নিশ্চিত ড্রয়ের পথে। সেই ম্যাচই নিউ জিল্যান্ড ৭ উইকেটে জিতে নিল শেষ দিন চা বিরতির পর। কেন উইলিয়ামসনের সেঞ্চুরি ছোঁয়ার সতর্কতায় শেষ বেলায় একটু বাড়ল ম্যাচের বয়স। জয়ের সময় তবু বাকি ছিল ১৭ ওভারের বেশি!
শেষটা দেখে কে বলবে, এই ম্যাচের প্রথম ইনিংসেই রান উৎসব করেছে বাংলাদেশ, লুটোপুটি খেয়েছে রেকর্ড। শেষও হয়েছে রেকর্ড গড়ে। সে রেকর্ড গর্বের নয়, বিস্ময় আর হতাশার। যেটিতে খুঁজতে হয় মুখ লুকানোর আড়াল। ৮ উইকেটে ৫৯৫ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে এত রান করে টেস্ট ইতিহাসে হারেনি আর কোনো দল। ১২৩ বছর পুরোনো বিব্রতকর রেকর্ড থেকে মুক্তি পেল অস্ট্রেলিয়া।

চোট আর ভুল শটকে দায়ী করলেন তামিম
ওয়েলিংটন টেস্ট হারের পর কথা বলেছেন ডেপুটি অধিনায়ক তামিম ইকবাল। হারের ব্যাখ্যায় চোট আর ব্যাটসম্যানদের ভুল শটকে দায়ী করেছেন বাঁহাতি ওপেনার। সোমবার ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তামিম বলেন, ‘প্রথম ইনিংসে আমরা চমৎকার খেলেছি। দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুটাও ভালো ছিল। কিন্তু ইমরুল ইনজুরিতে পড়ার পর আর আমি আউট হওয়ার পর সব গড়বড় হতে শুরু করে।’ যদিও বন্ধু সাকিবের আউট সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রথমে তাকে দায়ী করতে চাইছিলেন না তামিম। পরে আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তার আরেকটু সতর্ক খেলা উচিত ছিল।’ তামিম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘টেস্টে সেশন বাই সেশন খেলা হয়। একটা সেশনে উইকেটে জুটি গড়তে পারাটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি জুটি ভেঙে গেলে নতুন আরেকজনকে ক্রিজে এসে সেট হতে সবকিছু আবার নতুন করে শুরু করতে হয়। জুটি গড়তে পারায় আমরা প্রথম ইনিংসে রেকর্ড রান করতে পেরেছি। দ্বিতীয় ইনিংসে আমাদের শুরুটাও ভালো হয়েছিল। কিন্তু ইমরুল ইনজুরিতে পড়াতেই সংকটের শুরু। এরপর দুই-তিন বলে খেলে আমি আউট হয়ে গেলাম। তখন মাত্র দিনের ৩২ বল বাকি। ওইভাবে তিন উইকেট না হারালে অন্য কিছু হতে পারতো।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘টেস্টের পঞ্চম দিনে এসে সাকিব আউট হয়ে গেল। মুশফিক চমৎকার শুরু করেছিল। কিন্তু সে ইনজুরিতে পড়ায় আবার জুটি ভাঙলো। এরপর সাব্বির ছাড়া আমাদের স্বীকৃত কোনও ব্যাটসম্যান ছিল না। সব মিলিয়ে পুরো বিষয়টি হতাশার ছিল। এ অবস্থা থেকে দলকে বের করে আনতে আমাদের কাজ করতে হবে।’ বাংলাদেশ দলের এখন পর্যন্ত টেস্টের ইতিহাস হচ্ছে এক ইনিংসে ভালো করলে আরেক ইনিংসে বিপর্যয়। এ অবস্থা থেকে দলকে বের করার উপায় কী জানতে চাইলে তামিম বলেন, ‘সাম্প্রতিক দেশে না হলেও বিদেশের মাটিতে অভিযোগটি সত্য। এ অবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।’
বিপিএলসহ লম্বা সময় ধরে ক্রিকেট খেলায় থাকায় দলের সদস্যরা ক্লান্ত কিনা জানতে চাইলে তামিম না সূচক জবাব দিয়ে বলেন, ‘এটি আমার মনে হয় না। আগামী দু’বছর আমাদের অনেক বেশি খেলায় থাকতে হবে। আমাদের কারও কারও যদি ক্লান্তির সমস্যা থাকে, সেগুলো দলের মেডিক্যাল স্টাফরা দেখবেন।’
নিউজিল্যান্ড দল বেশি বেশি শর্ট বল করায় বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা এভাবে চোটে পড়েছে কিনা জানতে চাইলে তামিম বলেন, ‘আমার তা মনে হয় না। এটি তাদের একটি কৌশল হতে পারে। যেমন কিউই দল আমাদের দেশে গেলে সারাদিন স্পিন বল সামাল দিতে দিতে খেই হারিয়ে ফেলে।’

হারের প্রাথমিক আয়োজন সম্পন্ন হয়েছিল আগের দিনই। দেড়শ ওভার কিপিং করার পর ব্যাটিংয়ে নেমে রান নিতে গিয়ে চোটে মাঠ ছাড়েন ইমরুল কায়েস। বাজে শটে ফেরেন তামিম-মাহমুদউল্লাহ। সেই আয়োজন পূর্ণতা পেয়েছে শেষ দিনে সাকিব-মুমিনুল-সাব্বিরদের হাত ধরে।
প্রথম ইনিংসের নায়ক সাকিব ‘ড. জেকিল’ থেকে হয়ে গেলেন ‘মিস্টার হাইড’। দিনের অষ্টম বলেই ভীষণ দৃষ্টিকটু শটে বিপদে ফেলে এলেন দলকে। ফাঁদের প্রলোভন এড়ানোর মানসিক দৃঢ়তা ছিল না মুমিনুল হকের। সাব্বির লড়াই করেছেন দারুণ, কিন্তু যুদ্ধ জয়ের নায়ক হতে পারেননি। দলের ভীষণ প্রয়োজনের সময় ছেড়ে এসেছেন লড়াইয়ের মঞ্চ।
৫৭ ওভারে ২১৭, ওভার প্রতি ৩.৮০ রান তোলা শেষ দিনে সহজ হওয়ার কথা ছিল না। এখানেও ব্যাটসম্যানদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উদার বাংলাদেশের বোলাররা। ফিল্ডিং আর শরীরী ভাষা তো হতশ্রী। ওভারপ্রতি সাড়ে পাঁচ রান তুলেছে নিউ জিল্যান্ড, দুই শতাধিক রানে যেটি টেস্ট ইতিহাসের দ্বিতীয় দ্রুততম রান তাড়া।
রান তাড়ায় নাটকীয় কিছুর আশা অবশ্য জেগেছিল ক্ষনিকের জন্য। পরপর দুই ওভারে মিরাজ ফিরিয়েছিলেন দুই কিউই ওপেনারকে। এরপর যখন আরও চেপে ধরার কথা, খাপছাড়া বোলিংয়ে উল্টো আলগা হলো ফাঁস।
প্রথম ইনিংসে অর্ধশতকের পরই আউট হয়ে নিশ্চয়ই নিজের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছিলেন উইলিয়ামসন। দ্বিতীয় ইনিংসে প্রমাণ করলেন কেন তিনি সময়ের সেরাদের একজন। চাপের লেশমাত্র ছিল না ব্যাটিংয়ে। ছিল দারুণ কর্তৃত্ব ও নিশ্চয়তা। যেন জানতেন, দলের জয় নিয়েই ফিরবেন। মুগ্ধতা জাগানিয়া সব শট তো বরাবরের ‘ট্রেডমার্ক’।
ম্যাচ জেতানো জুটিতে অধিনায়কের সঙ্গী রস টেইলর, প্রথম ইনিংসে যিনি ভালো শুরুটা ফেলে এসেছিলেন মাঠে। শেষ পর্যন্ত থাকতে পারেননি এদিনও, তবে যখন ফিরেছেন তখন ম্যাচ একরকম শেষই। নিজে করেছেন ৬০, উইলিয়ামসনের সঙ্গে ১৬৩ রানের ম্যাচ জেতানো জুটিতে রান এসেছে ওভারপ্রতি সাড়ে ছয় করে!
টেইলরের বিদায়ের পরপরই মিরাজকে সুইপ করে উইলিয়ামসন ছুঁলেন পঞ্চদশ সেঞ্চুরি। মাত্র ৮৯ বলে, রান তাড়ায় যেটি টেস্ট ইতিহাসের চতুর্থ দ্রুততম সেঞ্চুরি। বেসিন রিজার্ভে তখন করতালির জোয়ার। শেষ দিনে গ্যালারি ছিল উন্মুক্ত, দর্শকও সবচেয়ে বেশি। পরের বলেই জয়, আরও উচ্চকিত হয়ে চারপাশে ছড়িয়ে তালির স্রোত।
বাংলাদেশের কাছে ওই তালি পরাজয়ের ধ্বনি। স্টেডিয়ামের কোল ঘেষে থাকা মাউন্ট ভিক্টোরিয়ার চূড়া থেকে আরও উঁচুতে উঁকি দিচ্ছিল যে স্বপ্ন, শেষ দিনে সেটিই মুখ থুবড়ে পড়েছে বেসিন রিজার্ভের সবুজ মখমলে। ঘাসের স্পর্শও কোমল, তবে যন্ত্রণাটা তীব্র!
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস: ৫৯৫/৮ ইনিংস ঘোষণা
নিউ জিল্যান্ড ১ম ইনিংস: ৫৩৯
বাংলাদেশ ২য় ইনিংস: ১৬০
নিউ জিল্যান্ড ২য় ইনিংস: ৩৯.৪ ওভারে ২১৭/৩ (লক্ষ্য ৫৭ ওভারে ২১৬) (ল্যাথাম ১৩, রাভাল ১৬, উইলিয়ামসন ১০৪*, টেলর ৬০, নিকোলস ৪*; কামরুল ০/৩১, মিরাজ ২/৬৬, তাসকিন ০/৩৮, সাকিব ০/৩০, শুভাশীষ ১/৩২)।
ফল: নিউ জিল্যান্ড ৭ উইকেট জয়ী
ম্যান অব দা ম্যাচ: টম ল্যাথাম

Advertisements

About Emani

I am a professional Graphic designers create visual concepts, by hand or using computer software, to communicate ideas that inspire, inform, or captivate consumers. I can develop overall layout and production design for advertisements, brochures, magazines, and corporate reports.
This entry was posted in Cricket (ক্রিকেট). Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s