সংকটের মুখে ট্রাম্প প্রশাসন

trump-melanea
অনন্য ঐতিহাসিকতায় আজ শপথ নিতে যাচ্ছেন নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অবসান হতে যাচ্ছে মার্কিন ইতিহাসের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট বারাক ওমাবা যুগের। নানা কারণেই এই অনুষ্ঠান ঐতিহাসিক। শপথ অনুষ্ঠানে যোগদানকারী সম্ভাব্য মানুষের সংখ্যা হবে ৯ লাখ। আর দুই লাখ মানুষ হোয়াইট হাউসের বাইরের বিক্ষোভে অংশ নেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অতীতে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট-এর শপথের দিন এতো মানুষ বিক্ষোভে নামেনি কোনওদিন। ট্রাম্পের এই শপথ অনুষ্ঠানকে মার্কিন ইতিহাসে সবথেকে ব্যয়বহুল বলা হচ্ছে। আবার নির্বাচিত প্রেসিডেন্টদের ইতিহাসে সবথেকে কম জনপ্রিয়তা নিয়ে শপথ নেবেন তিনি। সবমিলে শপথের দিনটি ঐতিহাসিকতা পেয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানাচ্ছে, রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির ক্যাপিটল হিলের পশ্চিম প্রান্তে হবে জমকালো এ শপথ অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানস্থলের আশপাশের প্রায় ২ দশমিক ৭ বর্গমাইল এলাকায় রাস্তা ব্যারিকেড দিয়ে ব্লক করে রাখা হয়েছে। জমকালো ওই অনুষ্ঠানের খরচ হবে ৮০০ কোটি টাকা (১০০ মিলিয়ন ডলার)।ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানে ৯ লাখ লোকের সমাগম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ক্যাপিটল হিলের বাইরে ২ লাখ প্রতিবাদকারী বিক্ষোভ সমাবেশ করবেন। এছাড়া হোয়াইট হাউসের এবং তার আশপাশের এলাকার আকাশে চলবে হেলিকপ্টার মহড়া।নিরাপত্তার ব্যাপারে গত সপ্তাহে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি প্রধান জেহ জনসন বলেছিলেন, ওই অনুষ্ঠানে ২৮ হাজার নিরাপত্তাকর্মী কাজ করবেন। মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস, এফবিআই, পার্ক পুলিশ, ক্যাপিটল পুলিশ, কোস্ট গার্ড ও স্থানীয় পুলিশের সমন্বিত এ বহর ওয়াশিংটন ও তার আশপাশের এলাকার প্রহরায় থাকবে। মার্কিন সংমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হচ্ছে, অভিষেক অনুষ্ঠানের ব্যয়ের ৭ কোটি ডলার আসবে বিভিন্ন কর্পোরেট এবং ব্যক্তিগত অনুদান থেকে। বাকি অর্থ ব্যয় হবে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে। মূল শপথ অনুষ্ঠানে ব্যয় হবে মাত্র ১ কোটি ডলার। বাকি ৯ কোটি ডলারই নিরাপত্তা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে ব্যয় হবে বলে জানায় ট্রাম্পের ক্ষমতা হস্তান্তর কমিটি।

সংকটের মুখে ট্রাম্প প্রশাসন

যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শপথ নেয়ার আগেই তাঁকে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক সংকটের মুখে পড়তে হচ্ছে।উত্তর কোরিয়া বলেছে, তারা আন্তমহাদেশীয় পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষামূলকভাবে উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত। উত্তর কোরিয়ার এই হুমকি কীভাবে মোকাবিলা করবেন, জানাননি ট্রাম্প। তিনি আদৌ তা পারবেন কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ রয়েছে। এই উদ্বেগের কারণ হলো, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার কোনো অভিজ্ঞতা ট্রাম্পের নেই। তিনি সারা জীবন কোনো নির্বাচিত পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। ব্যবসার বাইরে অন্য কোনো অভিজ্ঞতা অর্জন করেননি। সেনাবাহিনীতে দায়িত্বপালনের কোনো অভিজ্ঞতাও তাঁর নেই।ট্রাম্পের প্রস্তাবিত মন্ত্রিসভায় বেশির ভাগই কোটিপতি ব্যবসায়ী অথবা সেনাবাহিনীর সাবেক জেনারেল। যদিও স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে এক নৈশভোজে ট্রাম্প তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী বলে চিহ্নিত করেছেন। ট্রাম্প যতই দাবি করুন, অনভিজ্ঞ এই মন্ত্রিসভা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ওবামা প্রশাসনের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের অন্যতম ফেলো নরমান এলসন ট্রাম্পের প্রস্তাবিত মন্ত্রিসভাকে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে অনভিজ্ঞ’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, অন্য যেকোনো সংস্থার মতো রাষ্ট্র পরিচালনার জন্যও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন।
আশঙ্কার আরও কারণ রয়েছে। এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার কোনো সদস্য সিনেটের অনুমোদন পেয়ে তাঁদের নিয়োগ চূড়ান্ত করতে পারেননি। প্রতিপক্ষ ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনার মুখে তাঁদের কারও কারও নিয়োগ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অন্যদের নিয়োগ বিলম্বিত হচ্ছে। জানা গেছে, স্থানীয় সময় শুক্রবার কোনো একসময় কম বিতর্কিত মন্ত্রিসভার এমন একাধিক সদস্যের ব্যাপারে সিনেটে ভোটগ্রহণ করার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের তিনজন সদস্যের নিয়োগ চূড়ান্ত হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সাময়িকভাবে কাজ চালিয়ে যেতে ট্রাম্প ওবামা প্রশাসনের ৫০ জন সদস্যকে তাঁদের দায়িত্বে থাকতে অনুরোধ করেছেন।
ট্রাম্পের একজন মুখপাত্র জানান, শুক্রবার শপথগ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা ও উৎসব শেষে নতুন প্রেসিডেন্ট একাধিক নির্বাহী নির্দেশের মাধ্যমে একাধিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করবেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স সিএনএনকে বলেছেন, নির্বাচনী প্রচারের প্রতিশ্রুতি পূরণে তাঁরা বদ্ধপরিকর। ক্ষমতাগ্রহণের প্রথম দিন থেকেই সেই লক্ষ্যে তাঁরা ব্যবস্থা নেবেন। জানা গেছে, নতুন প্রশাসনের বিবেচনায় ২২০ বা তারও বেশি নির্বাহী নির্দেশ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, অবৈধ অভিবাসীদের সন্তানদের অস্থায়ী বৈধতা কর্মসূচি। এটি ‘ডাকা’ নামে পরিচিত। রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের আপত্তি সত্ত্বেও ওবামা স্বাক্ষরিত ডাকা কর্মসূচির মাধ্যমে সাড়ে সাত লাখ অভিবাসী-সন্তান যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের ও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার বৈধ অধিকার পেয়েছে।
ট্রাম্প মেক্সিকোর সঙ্গে উত্তর আমেরিকান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (নাফটা) বাতিল ও ফেডারেল সরকারের জন্য নতুন কোনো নিয়োগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনই ট্রাম্প ওবামাকেয়ার নামে পরিচিত স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচি বাতিল ও তার স্থলে ভিন্ন বিমা কর্মসূচি চালু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু প্রথম দিন নির্বাহী নির্দেশে ওবামাকেয়ার বাতিল ঘোষণা করলেও তার বদলে নতুন কোনো কর্মসূচি চালু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ কংগ্রেসের অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দ ছাড়া এ রকম কর্মসূচি সম্ভব নয়। ওবামাকেয়ার বাতিল হলে প্রায় দুই কোটি মার্কিনি স্বাস্থ্যবিমা হারাতে পারেন বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ট্রাম্প বৃহস্পতিবার পৃথক দুটি ভাষণে আমেরিকান সবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু তাঁর কর্মকাণ্ডে অবিশ্বাস ও তিক্ততা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মার্কিনিদের চোখে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের বৈধতা এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। ক্ষমতা গ্রহণের তিন দিন আগে প্রকাশিত এক জনমত জরিপ অনুসারে, ৫৫ শতাংশ আমেরিকান ট্রাম্পের প্রতি বিরোধী মনোভাব পোষণ করেন। যে ৪০ শতাংশ মানুষ ট্রাম্পের প্রতি তাঁদের সমর্থন জানিয়েছেন, তাঁদের বেশির ভাগই হয় শ্বেতাঙ্গ অথবা রিপাবলিকান। ওয়াশিংটন পোস্ট এবিসির জরিপ বলছে, রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ মানুষ মনে করেন ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে ‘সম্পূর্ণ যোগ্য’।
শুক্রবার অভিষেকের দিন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হবে। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে পুলিশ প্রস্তুতি নিয়েছে। এরপরও সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয় সময় গতকাল সন্ধ্যায় এর প্রমাণ মিলেছে। ওয়াশিংটন প্রেসক্লাবে ট্রাম্প-সমর্থকেরা নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন। এর প্রতিবাদে ‘রিফিউজ ফ্যাসিজম’ নামে একটি সংগঠন প্রতিবাদ জমায়েতের আয়োজন করে। ক্লাবের কাছাকাছি আসতেই পুলিশ তাদের বাধা দেয়। মরিচ ভর্তি স্প্রে ছিটায়।
ওয়াশিংটন পুলিশ বলছে, শনিবার নারীদের বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে তারা বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। একাধিক নারী সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত এই র‍্যালির জন্য পুলিশ দুই নারী-পুরুষের জমায়েতের অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু পুলিশের ধারণা, এই সংখ্যা সম্ভবত চার বা পাঁচ লাখে দাঁড়াবে।
ট্রাম্পের জন্য আরও একটি দুঃসংবাদ রয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (এফবিআই) ট্রাম্পের সহযোগীদের সঙ্গে রাশিয়ার গোপন সম্পর্ক নিয়ে তদন্ত করছে। এই দুই পক্ষের মধ্যে তথ্যবিনিময়ের প্রমাণ তারা পেয়েছে। আপাতত এই তদন্তের লক্ষ্য ট্রাম্পের সাবেক ক্যাম্পেইন ম্যানেজার পল মানাফোর্ট ও আরও দুজন ব্যবসায়ী। ট্রাম্পের একজন মুখপাত্র অবশ্য এ ধরনের কোনো তদন্ত বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন।

Advertisements