mustard-oilপ্রাচীন ভারতীয়, রোমান ও গ্রীক সভ্যতার আমল থেকে সরিষা তেল ব্যবহার হয়ে আসছে। ভারতীয় উপমহাদেশে খৃষ্টপূর্ব তিন হাজার বছর থেকে সরিষার ব্যবহার চলে আসছে। ইদানীংকালে ভোজ্য তেল হিসাবে সরিষার ব্যবহার বেড়েছে। বহুদেশে সরিষার আবাদ হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হচ্ছে বাংলাদেশ, বেলজিয়াম, ব্রাজিল, ক্রোয়েশিয়া, কলম্বিয়া, এসটোনিয়া, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রিস, হাঙ্গোরি, ভারত, ইটালি, লাটভিয়া, লিথুনিয়া, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, পোলান্ড, সার্বিয়া, শ্লোভেনিয়া, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
মাছ ও ডিম ভাজা, ভর্তা বা ঝালমুড়ির জন্য সরিষার তেল ছাড়া অন্য তেল চিন্তাই করতে পারেন না অনেকে। কেবল স্বাদের জন্যই নয়, বহুকাল ধরেই এই তেল ব্যবহারের পেছনে আরো অনেক কারণ রয়েছে। বলা হয়, কেবল খাবার রান্নাতেই নয়, ত্বকের যত্ন থেকে শুরু করে চুলেও সরিষার তেল ব্যবহার করা হয়। ভারতের সেলিব্রিটি পুষ্টিবিজ্ঞানী সন্ধ্যা গুগনানি বলেন, সরিষার তেল নিয়ে রীতিমতো মিথলজি প্রচলিত রয়েছে। একটা ধারণা রয়েছে, সরিষার তেল খেলে হার্ট খারাপ হয়! অসুখবিসুখ বাড়ে! কিন্তু চিকিৎসকরা এসব মানছেন না। উল্টে বলছেন, হার্ট ভাল রাখার পাশাপাশি ত্বক, চুলের জন্যও উপকারি সরিষার তেল।এই তেলটি অন্যান্য স্বাস্থ্যকর তেলের মতই তালিকার শীর্ষস্থানীয়দের একটি।
এখানে বিশেষজ্ঞদের মতে সরিষার তেলের কিছু বিসম্ময়কর গুণের কথা তুলে ধরা হলো।
১. সরিষার তেলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড (‌এম ইউ এফ এ)‌, যা শরীরের দরকার। এই এম ইউ এফ এ হার্ট ভাল রাখে। চুল পড়া, সাদা চুলের সমস্যা কমায়।
২. সরিষার তেলে থাকা এম ইউ এফ এ রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখে। এতে রক্তে ফ্যাটের মাত্রা কমে চলাচলের গতি বাড়ে। সরিষার তেলের আলফা–লিনোলেনিক অ্যাসিড ইসকেমিক হার্টের সমস্যা কমায়।
৩. ফাটা পায়ে সরষের তেল লাগালে দারুণ উপকার পাবেন। সরিষার তেলের সঙ্গে সামান্য মোম মিশিয়ে গরম করে পায়ের ফাটা অংশে লাগান। সমস্যা নিমেষে উধাও। নখে লাগালেও উপকার পাবেন।
৪. ব্যাকটিরিয়া, ভাইরাস প্রতিরোধের ক্ষমতা রয়েছে সরিষার তেলের। খাদ্যনালীর সংক্রমণ সারাতেও অব্যর্থ এই তেল।
৫. সরিষার তেল দিয়ে মালিশ করলে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে। ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বাড়ায়। মালিশের পর ঘর্মগ্রন্থিগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে বেশি ঘাম বেরিয়ে শরীরের টক্সিন দূর হয়।
৬. সর্দি–কাশি থেকেও রেহাই দেয় সরষের তেল। নিয়মিত নাকে এক ফোটা সরিষার তেল দিলে শ্বাসনালী পরিষ্কার হয়। শ্বাস চলাচলে সুবিধা হয়।
৭. সরিষার তেলে থাকে বেটা–ক্যারোটিন, যা চুল বাড়তে সাহায্য করে। ব্যাকটিরিয়া প্রতিরোধ করতে পারে বলে খুশকি, স্কাল্পে সংক্রমণ আটকায়। শ্যাম্পু করার আগের রাতে চুলে সরিষার তেল দিয়ে ম্যাসাজ করুন।
৮. এক টেবিল চামচ সরিষার তেলে রয়েছে ১২৬ ক্যালরি।
৯. এই তেলে ঝাঁঝালো গন্ধ রয়েছে যার কারণে কীট-পতঙ্গ দূরে থাকে। তাই অনেক সময় পিঁপড়া এবং মশা তাড়াতে সরিষার তেল মিশ্রিত তরল স্প্রে করা হয়।
১০. এই তেলে আছে দুটো গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাটি এসিড। যথা- ওয়েলিক এসিড এবং লিনোলিক এসিড। এগুলো চুলের জন্য দারুণ টনিকের মত কাজ করে। মাথায় মেসেজ করা হলে রক্ত চলাচল বৃদ্ধি পায়। চুলের বৃদ্ধিও গতি পায়।
১১. দেহের বিষাক্ত উপাদান ঝেড়ে ফেলতে সরিষার তেলের ব্যবহার বহুল প্রচলিত। খাওয়া হলে বা ত্বকে লাগানো হলে ঘাম বের হয়। এর মাধ্যমেই দেহের বাজে উপাদান বের হয়ে যায়।
১২. দাঁতের যত্নে সরিষার তেলের সঙ্গে লবণ মিশিয়ে দাঁত মাজতে বলেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
১৩. তিসির পাউডারের সঙ্গে সরিষার তেলের ব্যবহারের খুশকি দূর হয়।
১৪. অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল উপাদান থাকার কারণে সরিষার তেল আচার তৈরিতে অনন্য।
১৫. বিভিন্ন তেলের উপাদান নিয়ে গবেষণা চালায় অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস (অলএমএস) এবং স্যার গঙ্গারনাম হসপিটাল। তাতে বলা হয়, সরিষার তেল কার্ডিওভাসকুলার ডিজিসের ঝুঁকি কমায় ৭০ শতাংশ। এটা অলিভ অয়েলের চেয়ে ভালো। কারণ অলিভ অয়েলে ওমেগা ৬ (এস৬) এবং ওমেগা ৩ (এন৩) ফ্যাটি এসিডের সুষম ভারসাম্য নেই।

Advertisements