১৩ টাকার ভাড়া নিচ্ছে ২০ টাকা


BRTA Cityng

সরকারের ঘোষণা থাকলেও রাজধানীতে সিটিং সার্ভিস বন্ধ হয়নি। বরং এই অজুহাতে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে রাজধানীর প্রায় অধিকাংশ পরিবহনে। চার্টে ১৩ টাকা ভাড়া থাকলেও আদায় করা হচ্ছে ২০ টাকা। এই চিত্র রাজধানীর প্রায় অধিকাংশ সড়কে চলাচল করা সদ্য লোকাল হওয়া ‘সিটিং সার্ভিস’ বাসগুলোর।
১৬ এপ্রিল রোববার সকাল থেকে রাজধানীতে সিটিং সার্ভিস বন্ধ হওয়ার কথা থাকলেও তা বন্ধ হয়নি। ঠিক আগের নিয়মেই চলছে যাত্রীদের থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়। বাস শ্রমিকরা মানছেন না নিয়মনীতি। সর্বনিম্ন ভাড়া সাত টাকা নির্ধারিত থাকলেও তাও মানা হচ্ছে না। বাসে উঠলেই সর্বনিম্ন ভাড়া হিসেবে যাত্রীদের দিতে হচ্ছে ১০ টাকা। একই সিট বিক্রিও হচ্ছে দুবার। দাঁড়িয়ে যাত্রী নেওয়া হলেও ভাড়া নেওয়া হচ্ছে আগের মতই সিটিংয়ের। বাসে নেই ভাড়ার চার্ট। আবার কোনো কোনো বাস সকাল থেকে চলছে না। রাজধানী গণপরিবহনেরও সংকট দেখা গেছে। এ নিয়ে যাত্রীদের ক্ষোভের শেষ নেই।
মোহাম্মদপুর থেকে একটি এমটিসিএল বাস (ঢাকা মেট্রো-ব ১৮-০৫৩০) দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে ছাড়ে। এই বাসে এ প্রতিবেদক প্রেসক্লাব পর্যন্ত আসেন। আড়াইটার দিকে প্রেসক্লাবের সামনে পৌঁছায়। এই সময়ের মধ্যে মোহাম্মদপুর থেকে প্রেসক্লাব পর্যন্ত কোথাও অভিযান চালাতে দেখা যায়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। তবে রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের সামনে সকালের দিকে অভিযান চালানোর খবর পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ রোড অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) ওয়েবসাইটে ২০১৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বরের প্রজ্ঞাপন অনুসারে ১৪১ পৃষ্ঠার চার্টে পৃথক পৃথক রুটের নির্ধারিত ভাড়া উল্লেখ করা হয়েছে। রিজিওনাল ট্রান্সপোর্ট কমিটি চার্ট অনুযায়ী, মোহাম্মদপুর থেকে আসাদগেট হয়ে সায়েন্স ল্যাবরেটরি পর্যন্ত ভাড়া ৭ টাকা, শাহবাগ পর্যন্ত ১১ টাকা প্রেসক্লাব পর্যন্ত ১৩ টাকা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। দেখা গেছে অতিরিক্ত ভাড়া নিতে।
মোহাম্মদপুর থেকে ছেড়ে আসা এমটিসিএল বাসটি আসাদ গেটের পরে ধানমন্ডি ২৭ নাম্বারের মাথায় এলে সিটিং সার্ভিসের চেকার ওঠেন গাড়িতে। আসাদ গেটের আগে থেকেই বাসের কন্ডাক্টর ভাড়া নেওয়া শুরু করেন। যারা ধানমন্ডি ২৭, ৩২ নাম্বার বা শুক্রাবাদ নামবেন তাদের সবার কাছ থেকে ১০ টাকা করে নেন। কিন্ত বাসের পেছনে বসে থাকা কয়েক যুবক ১০ টাকা করে দিতে চান না। এ নিয়ে কন্ডাক্টরের সঙ্গে তারা তর্কে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় তারা সবাইকে অতিরিক্ত ভাড়া না দেওয়ার আহ্বান জানান। কিন্ত এরই মধ্যে ভাড়া দেওয়া কেউ কেউ ২৭ নম্বরে নেমে গেছেন। যারা ছিলেন, তারা ফেরত চাইলেও কন্ডাক্টর ফেরত দেয়নি। ওই যুবকদের শক্ত অবস্থান লক্ষ করে নিচে থেকে চেকারদের একজন ওই যুবকদের কাছ থেকে সাত টাকা নিতে বলেন। এ সময় নিচের ওই লোক বলেন, সাত টাকা তো আগের চার্ট অনুযায়ী। তবে নতুন চার্ট হলে ভাড়া আরো বাড়বে।
এরপর শুক্রাবাদ থেকে গাড়িতে আসন ছাড়াও আরো অতিরিক্ত ১০ জন যাত্রী ওঠে। ২৭ নাম্বারে কয়েকজন যাত্রী নেমে যাওয়ায় ওই আসনে অন্য যাত্রী বসেন। শুক্রাবাদ থেকে ওঠে তাদের মধ্যে কয়েকজন শাহবাগ নামেন। তাদের কাছ থেকে ১০ টাকা ভাড়া নেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে শাহবাগ পর্যন্ত ভাড়া উঠল ২০ টাকা। এক আসন দুবার বিক্রি হলো। মূলত ভাড়া ১১ টাকা। অতিরিক্ত পেল ৯ টাকা। মোহাম্মদপুর থেকে ওঠা এক যাত্রী নামবেন প্রেসক্লাবে। তার কাছ থেকে নেওয়া হয় ২০ টাকা। কিন্তু নির্ধারিত ভাড়া ১৩ টাকা। অতিরিক্ত নিলো ৭ টাকা।
এ ব্যাপারে কন্ডাক্টরের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শাহবাগ পর্যন্ত ভাড়া ১৫ টাকা। শাহবাগের পরে মতিঝিল পর্যন্ত যেখানে যাবেন ভাড়া ২০ টাকা। কারণ শাহবাগের পরে শিশুপার্কের উল্টো পাশে চেকার বসে।
তার কথা মতো সেখানে এসে চেকারকে চেক করতে দেখা যায়। চেকার চেক করতে এলে তার হাতে কন্ডাক্টরকে ১০ টাকা দিতে দেখা যায়।
বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এনায়েতুল্লাহ বলেন, একদিনেই এত বছরের অনিয়ম বন্ধ হবে, এমন প্রত্যাশা করা আমাদের উচিত না।
তাহলে কীভাবে এত বছর রাজধানীতে সিটিং সার্ভিস চলাচল করল। বাস মালিকরা কেন চালাল। আর আপনারা বাস মালিক, আপনাদের ঘোষণা কেন শ্রমিকরা মানবে না? এর জবাবে তিনি বলেন, আমাদের সেক্টরের শ্রমিকরা অধিকাংশ অশিক্ষিত, তারা অনেক কিছুই বোঝে না। তাই কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সিটিং সার্ভিস বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের অভিযান চলমান থাকবে। আমরা আশা করি সিটিং সার্ভিস লোকাল সার্ভিসে রূপান্তর হবে।
অপরদিকে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে দেখা যায়, রাস্তার পাশে সার করে রাখা হয়েছে মেশকাত গাড়ি। যা গতকালও সিটিং সার্ভিস হিসেবে ভাড়া নিয়েছে। রোববার সকাল থেকে মেশকাত গাড়ি চলাচল বন্ধ রয়েছে।  মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে একটি মেশকাত গাড়িতে বসে কয়েকজনকে গল্প করে সময় কাটাতে দেখা যায়। বাস বন্ধ থাকার কারণ জানতে চাইলে তারা বলেন, সিটিং সার্ভিস চলতে পারবে না তাই আজ বন্ধ রাখা হয়েছে। বাস মালিক কাল থেকে চালাতে বললে, কাল থেকে আবার চলবে।

পরিবহনের সঙ্গে জড়িতদের অনেকেই খুব প্রভাবশালী : কাদের
বেসরকারি সড়ক পরিবহন খাতের সঙ্গে জড়িত অনেকেই খুব প্রভাবশালী বলে মন্তব্য করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
সচিবালয়ে মঙ্গলবার (১৮ এপ্রিল) বিআরটিসির বাসচাপায় নিহত ছাত্রীর পরিবারের হাতে ক্ষতি পূরণের চেক হস্তান্তর অনুষ্ঠানে মন্ত্রী এ মন্তব্য করেন।
গত ১৬ এপ্রিল থেকে রাজধানীতে বাসে সিটিং সার্ভিস বন্ধের সিদ্ধান্তের কারণে নৈরাজ্য সৃষ্টি হওয়ায় সিদ্ধান্তটি পর্যালোচনা জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান ও মালিক সমিতির নেতাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই পর্যালোচনা সভাটি বুধবার হবে বলেও জানান ওবায়দুল কাদের।
সিটিং সার্ভিস বন্ধে বিআরটিএর অভিযানের কারণে রাজধানীতে বাস ও মিনিবাস চলাচল বন্ধ করে দিয়ে গণপরিবহনের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা। এতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন নগরবাসী। কোনো কোনো মালিক সিটিং সার্ভিস লোকাল করলেও ভাড়া নিচ্ছে আগের মতোই।
যারা গাড়ি চালাচ্ছেন না, তাদের বিরুদ্ধে সরকার কোনো ব্যবস্থা নেবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহন মন্ত্রী বলেন, ‘কেউ নানা অজুহাতে যদি গাড়ি না চালায়, আমরা কি…, আমাদের দেশের বাস্তবতা কি, আমার জোর করে গাড়ি নামাতে পারব? আর গাড়ির সাথে যারা জড়িত, তারা খুব সামান্য মানুষ নয়। তারা অনেকেই খুব প্রভাবশালী।’
তিনি বলেন, ‘যারা এসব বিষয়ে তাগিদ দিয়ে ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেবে, তারাই আবার কখনো কখনো এ ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করে, ভোগান্তিটা হয় পাবলিকের, সাধারণ মানুষের। এটা হলো বাস্তবতা, এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।’
পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা কি সরকারের চেয়েও প্রভাবশালী- একজন সাংবাদিক জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘শোনেন, সরকারের চেয়ে প্রভাবশালী এ কথাটা ঠিক নয়। সরকার যখন এটা বাঁধন-কষণ শুরু করবে তখন ফস্কা গেড়ো হয়ে যায়। তখন আপনারাও বলেন সরকার বাড়াবাড়ি শুরু করেছে।’
‘কখনো বলেন মালিকরা বাড়াবাড়ি করছে, শ্রমিকরা বাড়াবাড়ি করছে। সরকার যখন তাদের বিরুদ্ধে স্টেপ নিতে যায় তখন কি হয়? তখন হয় রাতের অন্ধকারে সীতাকুন্ডে ওয়েস্কেল মেশিন পুড়িয়ে দেয়। হাজার হাজার মিছিল করে। তখন তাদের প্রতিরোধ করার মতো …একটা মব তৈরি হয়, তারপর কেউ আসে না।’
সড়ক পরিবহন মন্ত্রী বলেন, ‘এটাই হলো বাস্তবতা আমি বজ্র আঁটুনি করতে গিয়ে ফস্কা গেড়ো হয়ে যাবে। এখানে রিয়েলিস্টিক অ্যাপ্রোচ মেনে আমাকে কাজ করতে হচ্ছে।’

সিটিং সার্ভিস বন্ধের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনায় সভা বুধবার
ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘জনগণের দুর্ভোগ হচ্ছে, কষ্ট হচ্ছে অনেকের কাছ থেকে অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি সক্রিয় বিবেচনায় নিয়ে সমাধান করা উচিত।’
‘বিআরটিএর চেয়ারম্যানকে আমি সকালে ডেকে এনেছি, মালিক সমিতির দু-তিনজনের সঙ্গেও কথা বলেছি। তাদের বলেছি, বিষয়টি রিভিউ করার জন্য। তারা যে সিদ্ধান্ত নিয়ে অভিযান করছে, এ বিষয়টি জনস্বার্থে রিভিউ করতে বলেছি’ বলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।
সিটিং সার্ভিস বন্ধের বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য বুধবার একটি সভা হবে জানিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক, নাগরিক সমাজ, যাত্রীদের প্রতিনিধিসহ আরও কিছু প্রতিনিধি নিয়ে বসে পুরো পরিস্থিতি রিভিউ করে এটা জনস্বার্থে বাস্তবভিত্তিক, ন্যায়ানুগ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য।’
বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যমে সিটিং সার্ভিসকে বৈধতা ও ভাড়া বাড়ানোর প্রচেষ্টার বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে- এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘এ ধরনের পাঁয়তারা আছে কি না তা রিভিউ করলে বলা যাবে।’
এ পরিস্থিতিতে বিআরটিসির সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে রাস্তায় গাড়ি নামানো হবে বলেও জানান মন্ত্রী।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রী বলেন, ‘ফিটনেসের বিরুদ্ধে অভিযান চালালে গাড়ি বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন মানুষের দুর্ভোগ হয়। তোপের মুখে পড়ি আমরা। দোষটা আসে আমাদের ঘাড়ে। কি করব বলুন?’
দীর্ঘদিন ধরে পরিবহন খাতের কাছে দেশবাসী জিম্মি, আপনি সরকারের একজন প্রভাবশালী ও তৎপর মন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও আপনি এ সমস্যা সমাধান করতে পারছেন না। এ বিষয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমি রিজাইন করব আপনি চান? আমি প্রভাবশালী মন্ত্রী এ শব্দটাই খারাপ, ইয়েস আই অ্যাম একটিভ, নো ইনফ্লুয়েন্টশিয়াল। বর্তমানে পরিবহন সেক্টর কি আগের তুলনায় ভালো নয়? দু-একটি ব্যাপার নিয়ে বলবেন মন্ত্রী সাহেব আপনি একেবারে ব্যর্থ। ব্যর্থতার ভাগ আছে, সব তো ব্যর্থ নয়।’
এ সময় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এম এ এস ছিদ্দিক উপস্থিত ছিলেন।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s