Berca messiলিগ টেবিলের সুবিধাজনক জায়গায় দাঁড়িয়ে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনার বিপক্ষে মাঠে নেমেছিল রিয়াল মাদ্রিদ। চ্যাম্পিয়নস লিগের শেষ আট থেকে বিদায়ে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত বার্সার বিপক্ষে নিজেদের মাঠে জয় রিয়ালকে নিয়ে যেতে পারত শিরোপার একদম প্রান্তে, যে ট্রফি ২০১২ সালের পর তারা জেতেইনি। ড্র হলেও হয়তো হতো। কিন্তু জাদুকর যে তাঁর হ্যাটে লুকিয়ে রেখেছিলেন শেষ মুহূর্তের জন্য বের করে আনা খরগোশ! প্রায় একাই রিয়াল মাদ্রিদকে হারিয়ে দিলেন লিওনেল মেসি। জোড়া গোল, দ্বিতীয়টি ম্যাচের শেষ শট থেকে। আর তাতেই শ্বাসরুদ্ধকর লড়াইয়ে ৩-২-এ রিয়ালকে হারিয়ে স্প্যানিশ লিগের শিরোপার লড়াইটা আবারও ফিরিয়ে আনল বার্সেলোনা।
‘এল ক্লাসিকো’ নামটা যেন সার্থক আজকের এই ম্যাচে। কী ছিল না এতে! আক্রমণ, পাল্টা-আক্রমণ, গোল-পাল্টা গোল। খেলোয়াড়দের মেজাজ হারানো, নাটকীয়তা, সবকিছু যেন পসরা সাজিয়ে বসেছিল রিয়ালের মাঠ সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে। ছিল লাল কার্ডও।
ম্যাচ শেষ হতে কয়েক সেকেন্ড বাকি। বার্সার ডি বক্সের পাশ থেকে বল নিয়ে ছুটলেন সার্জি রবার্তো। তার সামনে পেছনে ছুটছে রিয়ালের খেলোয়াড়রা। কিন্তু কে রুখে তার গতিকে? ডি বক্সের সামনে গিয়ে বল বাড়িয়ে দিলেন জর্ডি আলবাকে। সুযোগ বুঝে আলবা বল বাড়িয়ে দিলেন লিওনেল মেসিকে। মেসির নেওয়া জোরালো শট কেইলর নাভাসকে ফাঁকি দিয়ে জালে আশ্রয় নেয়।
বুনো উল্লাসে মেতে ওঠেন লিওনেল মেসি। জার্সি খুঁলে সটান দাঁড়িয়ে থাকেন বেশ কিছুক্ষণ। এরপর আচার-আনুষ্ঠানিকতা সেরে মাঠে ফিরে আসেন। তার আসার অপেক্ষায় ছিলেন রেফারি। তার হাতে ছিল হলুদ কার্ড। মাঠে আসতেই মেসিকে সেটি দেখালেন রেফারি। মেসির দোষ? দোষ কিছুই নয়, অতিরিক্ত উদযাপন। এটি রেফারির কাছে নিয়ম বহির্ভূত হতে পারে। কিন্তু মেসির জন্য? মোটেও নয়।
২০১৪ সাল থেকে এল ক্লাসিকোতে গোল পাচ্ছিলেন না মেসি। সেই মেসিই দলের মুমূর্ষ মুহূর্তে জোড়া গোল করে দলকে জেতালেন মর্যাদার এল ক্লাসিকো। তাও আবার রিয়াল মাদ্রিদের মাঠে! জোড়া গোল করে দলকে জেতানোর পাশাপাশি ৫০০ গোলের মাইলফলকও স্পর্শ করেছেন আর্জেন্টাইন তারকা। এক ম্যাচ কম খেলা রিয়ালকে পেছনে ফেলে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে উঠিয়ে দিয়েছেন বার্সাকে। সে কারণে তার উল্লাস এবং উদযাপন একটু বেশিই ছিল। এটি যেমন তাকে স্বস্তি দিয়েছে। তেমনি বার্সেলোনাকে টিকিয়ে রেখেছে শিরোপার দৌঁড়ে। আজ হেরে গেলে লা লিগার শিরোপা জয়ের স্বপ্ন ফিকে হয়ে যেতে কাতালানদের।
দিনটি কেমন যাবে সেটি নাকি সূর্যোদ্বয় দেখেই বোঝা যায়। রিয়াল মাদ্রিদের ক্ষেত্রে ঘটল তার উল্টো। ম্যাচের শুরুতেই কাসেমিরো কর্নার থেকে আসা বলে পা লাগিয়ে জালে পাঠান। এগিয়ে নেন দলকে। এরপর থেকে রিয়াল কেবল পিছিয়ে যেতে থাকে। ৩৩ মিনিটে লিওনেল মেসির অসাধারণ গোলে সমতায় ফেরে বার্সা। ৩৮ মিনিটে ইনজুরি কাটিয়ে এল ক্লাসিকোতে ফেরা গ্যারেথ বেল সেই একই ধরণের ইনজুরিতে পরে মাঠ ছাড়েন। তাতে ১-১ গোলের সমতা নিয়েই শেষ হয় প্রথমার্ধের লড়াই।
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের ৭৩ মিনিটে ডি বক্সের সামনে থেকে আনমার্ক ইভান রাকেটিকের বাঁকানো শট জালে আশ্রয় নিলে ২-১ ব্যবধানে পিছিয়ে পরে রিয়াল। ৭৭ মিনিটে লিওনেল মেসিকে বাজেভাবে ফাউল করে সরাসরি লালকার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন রিয়ালের অধিনায়ক সার্জিও রামোস। তাতে দশজনের দলে পরিণত হয় লস ব্লাঙ্কোসরা। গোল ব্যবধানে পিছিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি খেলোয়াড়ের ব্যবধানেও পিছিয়ে যায় জিদানের শিষ্যরা।
৮২ মিনিটে করিম বেনজেমার বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামেন হামেস রদ্রিগেজ। ৮৫ মিনিটেই গোল করে ম্যাচে সমতা ফেরান কলম্বিয়ান এই তারকা। উল্লাসে ভাসান সান্তিয়াগো বার্নাব্যুকে। তাকে গোলটি করতে সহায়তা করেন মার্সেলো। মার্সেলোর জোরালো শটে পা লাগিয়ে গতিপথ বদলে দেন রদ্রিগেজ। বলটি বার্সেলোনার গোলরক্ষক আন্দ্রে টার স্টেগানের মাথায় আঘাত করে জালে আশ্রয় নেয়। এরপর অন্তিম মুহূর্তে আজকের ম্যাচের মহানায়ক লিওনেল মেসির অবিশ্বাস্য গোলে জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ে বার্সেলোনা। এটা শুধু জয় নয় মেসি ও তার দলের জন্য। তার চেয়ে বড় কিছু।
আর এই জয়ে রিয়ালকে টপকে অবশেষে আবারও পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে বার্সা। রিয়ালের হাতে এখনো একটি ম্যাচ বা ৩ পয়েন্টের হিসাব বাকি আছে। অবশ্য সেভিয়া আর ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষাও দিতে হবে তাদের। রিয়াল-বার্সা সমান পয়েন্ট নিয়ে লিগ শেষ করলে, লা লিগার নিয়ম অনুযায়ী মুখোমুখি লড়াইয়ে এগিয়ে থাকায় শিরোপা জিতবে বার্সা। কাল মেসির কাছে ব্যক্তিগত লড়াইয়ে নিঃশর্ত আত্মসমর্পন করা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর জন্যও দ্বিতীয় লা লিগা ট্রফির অপেক্ষা বাড়বে তাহলে। রিয়ালে প্রায় আট বছরের ক্যারিয়ারে রোনালদো যে লিগ জিতেছেন একবারই!

কী দাঁড়াল শিরোপার সমীকরণ ?

লা লিগা শিরোপাটা পেতে এখন রিয়ালকে মেলাতে হবে অনেক হিসাব। ছবি: রয়টার্সএক ম্যাচেই বদলে গেল লা লিগার সব সমীকরণ। এক ম্যাচ হাতে রেখে তিন পয়েন্টে এগিয়েছিল রিয়াল মাদ্রিদ। কিন্তু কাল ঘরের মাঠে রিয়াল ৩-২ গোলে হেরে যাওয়ায় লিগ শিরোপাটা ভালোই জমে উঠেছে স্পেনে। মাত্র এক সপ্তাহ আগেও রিয়ালই লা লিগা জিতছে বলে দিয়েছেন অনেকে, সে শিরোপাই এখন আবার বার্সেলোনার হাতে শিরোপা তুলে দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা! প্রশ্নটা উঠে যাচ্ছে, এবারের লা লিগা ট্রফি কার ঘরে যাচ্ছে?পয়েন্ট তালিকার চূড়ায় এখন বার্সেলোনা। তবে রিয়াল মাদ্রিদের হাতে এখনো এক ম্যাচ বাড়তি আছে। পা না হড়কালে, রিয়ালকে হটানোর সাধ্য নেই বার্সেলোনার। কিন্তু রিয়ালের সামনে এখন অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ। লিগে রিয়ালের যে ছয়টি ম্যাচ বাকি, এর চারটিই প্রতিপক্ষের মাঠে। দেপোর্তিভো লা করুনিয়া, গ্রানাডা, সেল্টা ভিগো বা মালাগা—নামে-ভারে কোনো দলই ভয় জাগাচ্ছে না নিশ্চয়ই! পয়েন্ট টেবিলের ১৯ নম্বর দল গ্রানাডাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা হয়তো না করলেও চলবে রিয়ালের।
তবে অন্য তিনটি দল নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগা উচিত ‘লস ব্লাঙ্কো’দের। কারণ নিজেদের মাঠে এই তিন দলই বার্সেলোনাকে হারিয়েছে। এবার যে তারা রিয়ালকে হারিয়ে বার্সাকে শিরোপা উপহার দেবে না সে কথা কে বলবে! এর মাঝে দেপোর্তিভোর সঙ্গে ঘরের মাঠের ড্রটাও এসেছিল শেষ ৮ মিনিটের মারিয়ানো-রামোস ঝলকে। লাল কার্ড দেখায় দেপোর্তিভোর বিপক্ষে সেই রামোসই থাকবে না। পেপে আর ভারানের চোট আরও দুর্বল করে রাখছে রিয়ালের রক্ষণ।
ঘরের মাঠে যে দুই ম্যাচ খেলবে রিয়াল সে দুটিতেও প্রতিপক্ষ ভ্যালেন্সিয়া ও সেভিয়া। বার্সার কাছে হারের আগে লা লিগায় শুধু এই দুই প্রতিপক্ষের কাছেই হেরেছে রিয়াল। সরাসরি লালকার্ড হওয়ায় ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষেও না থাকতে পারেন রামোস, দুই ম্যাচ যদি নিষিদ্ধ হন। চোট ও নিষেধাজ্ঞা মিলিয়ে কোচ জিনেদিন জিদানের হাতে এখন মাত্র একজন সেন্ট্রাল ব্যাক আছে! আগামী দুই ম্যাচ দল সাজানো নিয়েই ঝামেলায় পড়বেন জিদান।
জিদানের ভাবনা এখানেই শেষ হয়ে যাচ্ছে না। দল চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে, যেখানে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ। আগের একপেশে মাদ্রিদ ডার্বির পরিসংখ্যান ডিয়েগো সিমিওনের হাত ধরে যারা বদলে দিয়েছে। জিদানকে তার একাদশও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খেলাতে হবে যেন ক্লান্তি না পেয়ে বসে। আরও একটা চোট না সর্বনাশ ডেকে আনে।
উল্টো দিকে রিয়াল পা হড়কালেই কাজ সোজা হয়ে যাবে বার্সার। রিয়ালের সঙ্গে মুখোমুখি লড়াইয়ে এই জয়ে এগিয়ে গেছে বার্সা। লা লিগার নিয়ম হলো, শীর্ষে থাকা দুদলের পয়েন্ট সমান হলে মুখোমুখি লড়াইয়ের হিসাবটাই দেখা হয়। এবার লিগে ঘরের মাঠে ড্র করা বার্সা কাল রিয়ালের মাঠে গিয়ে জিতে এল।
বার্সার বাকি পাঁচ ম্যাচের প্রতিপক্ষও দেখুন: ওসাসুনা, এসপানিওল, ভিয়ারিয়াল, লাস পালমাস ও এইবার। এর মাঝে প্রতিপক্ষের মাঠে গিয়ে খেলতে হবে এসপানিওল ও লাস পালমাসের সঙ্গে। লিগে এই দুই দলের সঙ্গেই নিজেদের মাঠে জিতেছে বার্সা। তবে গতবার এসপানিওলের মাঠে ড্র করেছিল বার্সা। আর লিগে লাস পালমাসের অবস্থান ১৩তে থাকলেও এই দলটি কিন্তু রিয়ালের সঙ্গে দুই ম্যাচেই ড্র করেছে। নিজেদের মাঠেও এই মৌসুমে লিগে শুধু দুই ম্যাচে হেরেছে ক্যানারি দ্বীপের এই দল। নিজেদের মাঠে শুধু ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষেই বড় ম্যাচ আছে বার্সেলোনার। ভিয়ারিয়ালের মাঠে দুই দলের ম্যাচটি ড্র হয়েছিল। কিন্তু ন্যু ক্যাম্পে ভিয়ারিয়ালের হার ছাড়া অন্য কোনো ফলই অঘটন হিসেবে দেখা হবে।
লা লিগাটা দারুণ জমে উঠল শেষ বেলায়!
Advertisements