কোন শাকের কী গুণ? (স্বাস্থ্য সুরক্ষায় শাক)


Bivinno Shak

শাক বা পাতা সবজি হল এক ধরনের উদ্ভিদ যার পাতা সবজি হিসাবে খাওয়া হয়। পাতা ছাড়াও মাঝেমধ্যে পাতাবৃন্ত ও কচি কাণ্ড এর অন্তভুর্ক্ত। যদিও বিভিন্ন প্রকারের উদ্ভিদ শাকের আওতায় আসে, অধিকাংশের পুষ্টিগুণ ও রান্নার পদ্ধতি অনুসারে শাকের সাথে ভাগ করা হয়। প্রায় এক হাজার প্রজাতির উদ্ভিদের পাতা খাওয়ার উপযোগী হিসাবে জানা যায়। শাক অধিকাংশ সময় লতাপাতা বা গুল্মজাতীয় ও ক্ষণস্থায়ী উদ্ভিদ হয়ে থাকে, যেমনঃ লেটুস, পালংশাক, নাপা শাক। আদানসোনিয়া, অ্যারেলিয়া, মোরিঙ্গা, মোরাস ও টুনা প্রজাতি সহ কিছু অরণ্যময় বা বৃহদাকার উদ্ভিদের পাতাও শাক হিসাবে খাওয়া যায়।
কমবেশি আমরা সবাই শাক খেতে ভালোবাসি। শাক রান্না করা অনেকে এর ঝোল স্যুপের মতো করে খায়। অনেকে আবার শাক ভাজি কিংবা মাছের সঙ্গে রান্না করেও খেতে পছন্দ করেন। তবে যেভাবেই খান না কেন, শাক শরীরের জন্য অনেক উপকারী। নিয়মিত শাক খেলে নানা ধরনের রোগ-ব্যাধি দূর হয়। এতে শরীরও সুস্থ থাকে।
এক্ষেত্রে সুস্থতায় জেনে রাখুন কোন শাকের কী গুণ রয়েছে-

পালংশাক : Palong Shak (Spinacia oleracea).jpg

পালং শাক (Spinacia oleracea) এমারান্থাসি পরিবারভুক্ত এক প্রকার সপুষ্পক উদ্ভিদ। এটি জনপ্রিয় শাক ও সবজি। এর আদিবাস মধ্য ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া। এটি একবর্ষজীবি উদ্ভিদ, তবে দ্বিবর্ষজীবি পালং গাছ হতে পারে যদিও বিরল। পালং গাছ ৩০ সেমি পর্যন্ত লম্বা হয়। বাংলাদেশে শীতকালে এর চাষ হয়। এর পাতা একান্তর, সরল, ডিম্বাকার বা ত্রিভূজাকার। এই পাতার আকার ২-৩০ সেমি লম্বা ও ১-১৫ সেমি চওড়া হতে পারে। গাছের গোড়ার দিকের পাতাগুলো বড় বড় এবং উপরের দিকের পাতাগুলো ছোট হয়। এর ফুল হলদেটে সাদা, ৩-৪ মিমি ব্যাসবিশিষ্ট হয়। এর ফল ছোট, শক্ত, দানাকৃতির ও গুচ্ছাকার। ফলের আকার আড়াআড়ি ৫-১০ মিমি; এতে বেশ কয়েকটি বীজ থাকে।
পালং শাক অন্ত্রের ভেতরে জমে থাকা মল সহজে বের করে দিতে সহায়তা করে। যার কারণে যাদের কোষ্ঠকাঠিন্য আছে তাদের জন্য এ শাক খুব উপকারী। আবার পালং শাকের বীজ কৃমি ও মূত্রের রোগ সারায়। এর কচি পাতা ফুসফুস, কণ্ঠনালীর সমস্যা, শরীর জ্বালাপোড়া সমস্যা দূর করতেও সাহায্য করে। আবার জন্ডিসেও এই শাক বিশেষ উপকারী। পোড়া ঘায়ে, ক্ষত স্থানে, ব্রণে বা কোথাও ব্যথায় কালচে হয়ে গেলে টাটকা পালং পাতার রসের প্রলেপ লাগালে উপকার পাওয়া যায়। পালং শাকে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, বি, সি, ই এবং আয়রন। এজন্য পালং শাক খেলে রক্তে আয়রনের মাত্রা বেড়ে যায়।

লাল শাক : 

Lal Shak red vegitable.jpgএটা এক প্রকারের পাতা, যার পাতা সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। এই শাক আগে শুধুমাত্র শীতকালে পাওয়া গেলেও বর্তমানে এটি সারাবছরই পাওয়া যায়। এর রং লাল এবং রান্নার পর এটি থেকে লাল রং বের হতে দেখা যায়। এই সবজি ৬”-১২” হয়। গাছের কান্ড থেকে ভেঙে নিয়ে আসার পর ভাঙা কান্ড হতে পুনরায় নতুন গাছ গজায়।
লাল শাক রক্তে হিমোগ্লোবিন বাড়ায়। ফলে যাদের রক্তস্বল্পতা বা এনিমিয়া আছে তারা নিয়মিত লাল শাক খেলে রক্তস্বল্পতা পূরণ হয়।

কলমি শাক :

kalmi shaak (Ipomoea aquatica).jpgকলমি শাক (Ipomoea aquatica) এক প্রকারের অর্ধ-জলজ উষ্ণমণ্ডলীয় লতা। একে শাক হিসাবে খাওয়া হয়। এর আদি নিবাস কোথায় তা জানা যায়নি, তবে সারা বিশ্বের ক্রান্তীয় ও উপ-ক্রান্তীয় অঞ্চলে এটি জন্মে। ইংরেজিতে একে বলে water spinach, river spinach. কলমি শাক পানিতে কিংবা ভেজা মাটিতে জন্মে থাকে। এর ডাঁটাগুলো ২-৩ মিটার বা আরো বেশি দীর্ঘ হয়। ডাঁটার গিঁট বা পর্ব থেকে শেকড় বের হয়। এটি ফাঁপা বলে পানির উপরে ভেসে থাকতে পারে। কলমি শাকের পাতা অনেকটা লম্বাটে ত্রিকোণাকার বা বল্লমাকার, এবং ৫-১৫ সেমি দীর্ঘ এবং ২-৮ সেমি চওড়া হয়। কলমির ফুল অনেকটা ট্রাম্পেট আকৃতির এবং ৩-৫ সেমি চওড়া হয়ে থাকে। ফুলের রঙ সাধারণত সাদা এবং গোড়ার দিক বেগুনি। ফুলে বীজ হয়, বীজ থেকেও গাছ লাগানো যায়।
কলমি শাকেরও রয়েছে নানা গুণ। ফোড়া হলে কলমি পাতা একটু আদাসহ বেটে ফোড়ার চারপাশে লাগালে ফোড়া গলে যাবে এবং পুঁজ বেরিয়ে শুকিয়ে যাবে। পিঁপড়া, মৌমাছি কিংবা পোকামাকড় কামড়ালে কলমি শাকের পাতা ডগা সহ রস করে লাগালে যন্ত্রণা কমে যায়। এছাড়া কোষ্ঠকাঠিন্য হলে কলমি শাকের সঙ্গে আখের গুড় মিশিয়ে শরবত বানিয়ে সকাল-বিকাল এক সপ্তাহ খেলে ভালো উপকার পাওয়া যায়। আমাশয় হলেও এ শরবত কাজ করে। আবার গর্ভাবস্থায় মায়েদের শরীরে পানি আসে। কলমি শাক বেশি করে রসুন দিয়ে ভেজে তিন সপ্তাহ খেলে অনেকক্ষেত্রে পানি কমে যায়। প্রসূতি মায়েদের শিশুরা যদি মায়ের দুধ কম পায় তাহলে কলমি শাক ছোট মাছ দিয়ে রান্না করে খেলে মায়ের দুধ বাড়ে।

কচু শাক :

Kochu Shak (Araceae).jpgকচু Araceae গোত্রভূক্ত একধরনের কন্দ জাতীয় ফসল। কচু মানুষের দ্বারা চাষকৃত প্রাচীন উদ্ভিদগুলোর মধ্যে একটি। বাংলাদেশপশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব এলাকায় কম বেশি কচু দেখতে পাওয়া যায়। রাস্তার পাশে, বাড়ির আনাচে কানাচে, বিভিন্ন পতিত জমিতে অনাদরে-অবহেলায় অনেক সময় কচু হয়ে থাকতে দেখা যায়। বহু জাতের কচু রয়েছে। কিছু কিছু জাতের কচু রীতিমত যত্নের সাথে চাষ করতে হয়। খাবার উপযোগী জাতগুলোর অন্যতম হচ্ছে মুখীকচু, পানিকচু, পঞ্চমুখী কচু, পাইদনাইল, ওলকচু, দুধকচু, মানকচু, শোলাকচু ইত্যাদি।
কচু শাকে প্রচুর ভিটামিন সি থাকায় এ শাকের লৌহ দেহ কর্তৃক সহজে বিপাকিত হয়। এছাড়া জ্বরের সময় রোগীকে শরীরের তাপমাত্রা কমানোর জন্য দুধ কচু খাওয়ালে বেশ উপকার পাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে ওল কচুর রস উচ্চ রক্তচাপের রোগীকে প্রতিষেধক হিসেবে খাওয়ানো হয় এবং এতে বেশ ভালো উপকার পাওয়া যায়।

পুঁইশাক:

Pui Shak (Basella alba).jpgপুঁই (Basella alba) এক প্রকার লতা জাতীয় উদ্ভিদ। পুঁই গাছের পাতা ও ডাঁটি শাক হিসেবে খাওয়া হয় বলে সচরাচর একে পুঁই শাক হিসাবে উল্লেখ করা হয়। পুঁই Basellaceae গোত্রভুক্ত বহুবর্ষজীবী উষ্ণমণ্ডলীয় গাছ। বাংলাদেশে, পশ্চিমবঙ্গে, আসামে এবং ত্রিপুরায় সর্বত্র এর চাষ হয়ে থাকে। এর ভাজি এ সব এলাকার মানুষের প্রিয় সহযোগী খাদ্য।
চিংড়ি দিয়ে পুঁইশাক অনেকেরই খুব প্রিয় খাবার। সর্দি ও কোষ্ঠকাঠিন্য সারাতে দধি এবং পুঁইশাক সেদ্ধ করে খেলে ভালো উপকার পাবেন। এছাড়া পুঁইপাতা থেঁতো করে ব্রণের ওপর প্রলেপ দিলে ব্রণ নিরাময়ের ক্ষেত্রে চমৎকার ফল পাওয়া যায়।

সরিষা শাক : সরিষা বা সরষে ব্রাসিকা (Brassica) বা ক্রুসিফেরি (Cruciferae) গোত্রের কয়েক প্রজাতির তেল প্রদায়ী দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদ।এর ডিম্বক বক্রমুখী ৷ সরিষার দানা মশলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও সরিষার দানা পানির সাথে মিশিয়ে ভিনেগারসহ বিভিন্ন তরল তৈরি করা হয়, দানা পিষে সরিষার তেল তৈরি করা হয় যা রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়। সরিষার পাতা সরিষার শাক বা সর্ষে শাক হিসেবে খাওয়া হয়।
সরিষার তেল যেমন খাবারে আনে ভিন্ন স্বাদ, তেমনি সরিষার শাকেও পাওয়া যায় প্রচুর পরিমাণে আমিষ ও স্নেহ জাতীয় ভিটামিন। নিয়মিত এ শাক খেলে রক্তে উপকারী কোলেস্টেরল বেড়ে যায়। এছাড়া এই শাক দেহে ভিটামিন ডি তৈরিতেও সহায়তা করে।

ধনেপাতা :

dhone_pata (Coriander).jpgধনিয়া বা ধনে (ইংরেজি ভাষায়: Coriander) একটি সুগন্ধি ঔষধি গাছ। এটি একটি একবর্ষজীবী উদ্ভিদ। এটি দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার স্থানীয় উদ্ভিদ। এর বীজ থেকে বানানো তেল সুগন্ধিতে, ওষুধে এবং মদে ব্যবহার করা হয়। বঙ্গ অঞ্চলের প্রায় সর্বত্র ধনের বীজ খাবারের মসলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ধনের পাতা এশীয় চাটনি ও মেক্সিকান সালসাতে ব্যবহার করা হয়।
ধনেপাতায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, ফলিক এসিড যা ত্বকের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এই ভিটামিনগুলো প্রতিদিনের পুষ্টি জোগায়, ত্বক, চুলের ক্ষয় রোধ করে, মুখের ভেতরের নরম অংশ গুলোকে রক্ষা করে। এছাড়া ধনেপাতার ভিটামিন এ চোখের পুষ্টি জোগায়, রাতকানা রোগ দূর করতে ভূমিকা রাখে। ধনেপাতায় উপস্থিত আয়রন রক্ত তৈরিতে সাহায্য করে এবং রক্ত পরিষ্কার রাখতেও অবদান রাখে। ধনেপাতায় রয়েছে ভিটামিন ‘কে’ যা হাড়কে মজবুত করে। অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকায় ধনেপাতা শীতকালীন ঠোঁট ফাটা, ঠান্ডা লেগে যাওয়া, জ্বর জ্বর ভাব ধনেপাতা খেলে দূর হয়।

লাউ শাক

Law Shak.jpgঘরের মাচায়, ছাদে, উঠানে অনেক জায়গাতেই ছোট পরিসরে লাউ গাছ ও লাউ শাক জন্মাতে দেখা যায়। দেখতে খুব সাদাসিধে হলেও এর উপকার করার ক্ষমতা কিন্তু অনেক। শাক বলতে লাল শাক, কচু শাক ও পুঁই শাককেই বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়। লাউ গাছের লাউ খেয়েই যেন বাঙালিরা তৃপ্ত। কিন্তু লাউ শাকও যে আমাদের শরীর ও স্বাস্থ্যের উন্নয়নে অপরিসীম ভূমিকা রাখে সে কথাই আজ আপনাদের জানাবো।
আমাদের কাছে লাউ শাকও পরিচিত আবার চিংড়িও পরিচিত। আমরা লাউ শাক দিয়ে নানান তরকারি তৈরি করে খাই আবার চিংড়ি দিয়েও নানা তরকারি রান্না করে খাওয়া হয়। কিন্তু কখনও কি লাউ শাক আর চিংড়ি দিয়ে তরকারি রান্না করে খাওয়া হয়েছে? না হলে আজই শিখে নিন সুস্বাদু লাউ শাক দিয়ে রান্না করা চিংড়ির তরকারি।

মেথি শাক :

Mathe Shak (Trigonella foenum-graecum).jpeg মেথি (Trigonella foenum-graecum) -এটি মৌসুমী গাছ,একবার মাত্র ফুল ও ফল হয়। । তিনটি করে পাতা একসাথে জন্মায় । ফুলে ও তিনটা করে পাপড়ি থাকে। স্ত্রী এবং পুরুষ দুই ধরণের ফুল হয়। রঙ সাধারণত সাদা ও হলুদ হয়ে থাকে। বাদামি-হলুদ বর্ণের প্রায় চারকোনা আকৃতির বীজ হয়।
এর পাতা শাক হিসাবে খাওয়া হয়। মেথি শাক গ্রাম বাংলার মানুষের প্রিয় খাদ্য। ইউনানী, কবিরাজী ও লোকজ চিকিৎসায় বহুবিধ ব্যবহার হয়। মশলা হিসাবেও এটি প্রচুর ব্যবহার হয়।। এটি পাঁচ ফোড়নের একটি উপাদান। মেথি থেকে ষ্টেরয়েডের উপাদান তৈরি হয়।
মেথিকে মসলা, খাবার, পথ্য—তিনটাই বলা চলে। মেথির স্বাদ তিতা ধরনের। এতে রয়েছে রক্তের চিনির মাত্রা কমানোর বিস্ময়কর শক্তি। প্রতিদিন সকালে খালি পেটে মেথি চিবিয়ে খেলে বা এক গ্লাস পানিতে মেথি ভিজিয়ে রেখে সেই পানি খেলে শরীরের রোগ-জীবাণু বিশেষত কৃমি মরে, রক্তের চিনির মাত্রা কমে। রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বা চর্বির মাত্রা কমে যায়। এই গরমে ত্বকে যে ঘা, ফোড়া, গরমজনিত ত্বকের অসুখ হয়, এই অসুখগুলো দূর করে মেথি। বার্ধক্যকে দূরে ঠেলে দিয়ে তারুণ্যকে দীর্ঘস্থায়ী করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে মেথি। গবেষণা করে দেখা গেছে, যে ডায়াবেটিক রোগীরা নিয়মিত মেথি খান, তাঁদের ডায়াবেটিসজনিত অসুখগুলো কম হয় এবং স্ট্রোক হওয়ার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম। ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য মেথি শ্রেষ্ঠ পথ্য।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s