Cannesবিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম জমকালো আয়োজন কান চলচ্চিত্র উৎসব। সাগর ছুঁয়ে থাকা ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলের শহর কানে বসেছে বিশ্ব চলচ্চিত্রের মর্যাদাপূর্ণ এই উৎসব। ১৭ মে, বুধবার চলচ্চিত্রের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর কান চলচ্চিত্র উৎসবের পর্দা উঠেছে।উৎসব উপলক্ষে সাগর পাড়ের কান শহরের হোটেলগুলোতে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়। ভবনের চূড়ায় এরমধ্যে উঠে গেছে ঝলমলে লাল পোস্টার। ৭০ তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে আবারো বসেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তারকাদের মেলা।
দক্ষিণ ফ্রান্সের কান শহরের রাস্তার নানান স্থানে ঝুলছে ৭০ তম কানের অফিসিয়াল পোস্টার ও ব্যানার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হাজির হয়েছেন নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী, সাংবাদিক, প্রযোজক, তারকা এবং স্রেফ চলচ্চিত্র ভক্তরা। কান চলচ্চিত্র উৎসবে রয়েছে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
এবারের কান উৎসবের উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা করবেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী মনিকা বেলুচ্চি। এর আগে ২০০৩ সালেও মনিকা এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এছাড়া ২০০৬ সালে মনিকা বেলুচ্চি মূল প্রতিযোগিতা বিভাগের বিচারকদের প্যানেলে ছিলেন।
এবারের কান চলচ্চিত্র উৎসবের শুরু হবে ফ্রান্সের ছবি ‘ইসমাঈলস গোস্টস’ প্রদর্শনের মধ্যে দিয়ে। ড্রামানির্ভর এ ছবিটি পরিচালনা করেছেন আর্নাউড ডেসপ্লেচিন। এ বছর প্রতিযোগিতা বিভাগে আছে ১৯টি ছবি। এর মধ্যে একটি ছবি জার্মান পরিচালক ফাতিহ আকিনের ‘ইন দ্য ফেড’। মার্কিন নির্মাতা সোফিয়া কপোলার ‘দ্য বিগাইলড’ ছবিটিও আছে এ বিভাগে। আছে নোয়াহ বোমবাকের ‘দু মায়োরিদজ স্টোরিজ’ (নিউ অ্যান্ড সিলেকটেড)।
এবার প্রতিযোগিতা বিভাগের বিচারকদের সভাপতি হয়েছেন স্প্যানিশ নির্মাতা পেড্রো আলমোডোভার। অস্ট্রেলীয় পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও প্রযোজক জর্জ মিলারের নেতৃত্বে বিচারকের দায়িত্ব পালন করবেন উইল স্মিথ, জেসিকা চ্যাস্টেইন, ফ্যান বিংবিং, ফরাসি অভিনেত্রী অ্যাগনেস জাউই, ইতালিয়ান নির্মাতা পাওলো সোরেন্তিনো, দক্ষিণ কোরীয় চলচ্চিত্রকার পার্ক চ্যান-উক,জার্মান নির্মাতা মারেন আদে ও অস্কারজয়ী ফরাসি সংগীত পরিচালক গ্যাব্রিয়েল ইয়ারেদ।
১২ দিনের এ উৎসবে এ বছর প্রতিযোগিতা বিভাগে আছে ১৯টি ছবি। এগুলো হলো, ওকজা (যুক্তরাষ্ট্র, পরিচালক: বং জোন-হো), ইউ ওয়্যার নেভার রিয়েলি হিয়ার (যুক্তরাজ্য, পরিচালক: লিন রামসে), ‘লাভলেস’ (নির্মাতা-আন্দ্রেই জিভিয়াজিন্তসেভ, ফ্রান্স), দ্য কিলিং অব অ্যা স্যাক্রেড ডিয়ার (যুক্তরাষ্ট্র, পরিচালক: ইওর্গেস লানথিমস), অ্যা জেন্টেল ক্রিয়েচার (ফ্রান্স, পরিচালক: সের্গেই লোজনিৎসা), দ্য মেয়ারোউইৎজ স্টোরিস (ফ্রান্স, পরিচালক: নোয়া বামব্যাচ), দ্য ডাবল লাভার (ফ্রান্স, পরিচালক: ফ্রাঁসোয়া ওজোন), রদাঁ (ফ্রান্স, পরিচালক: জ্যাক দোয়াইও), এবং দ্য স্কয়ার (সুইডেন, পরিচালক:রুবেন আস্টলান্ড)। এছাড়াও অফিসিয়াল সিলেকশনের বিভাগ ‘আঁ সার্তেন রিগার্দ’-এ রয়েছে ১৭টি ছবি।
নিরাপত্তায় উৎসবের মূল কেন্দ্রে ঢুকতেই আমন্ত্রিত অতিথিকে বরাদ্দ ব্যাজ বা পরিচয়পত্র সংগ্রহ করতে হয়েছে। সবাইকে সহযোগিতার জন্য আছে আয়োজকদের প্রতিনিধি এবং নিরাপত্তা কর্মী। ভবনের ভিতরে-বাইরে রয়েছে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রতি ১৬০ মিটার পরপর তল্লাশির জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। এই উৎসবকে ঘিরে রয়েছে প্রায় ৪০০ নিরাপত্তা স্তর। টাইমস ইউনিয়ন, মিরর।

কান চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশ

Can-BD.jpgকানে নানা ক্যাটাগরিতে বিভিন্ন দেশের সিনেমার প্রতিযোগিতার পাশাপাশি প্রদর্শনও হয়। প্রতিযোগিতায় সিলেকশন না হলেও শো-এর ব্যাবস্থা করে নিজেদের সিনেমা দেখানো সম্ভব। এতসব সুযোগের পরও বাংলাদেশের প্রাপ্তি সেখানে খুবই কম।
এখন পর্যন্ত কানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন প্রয়াত তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ ছবির সাফল্য। ২০০২ সালে ‘মাটির ময়না’ কান চলচ্চিত্র উৎসবে ডিরেক্টরস ফর্টনাইট বিভাগে পুরস্কার জিতেছিল। এছাড়া ফিপ্রেস্কি আন্তর্জাতিক সমালোচক পুরস্কারের আওতায় শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কার অর্জন করে।
এরপর ২০১৩ সালে এম এ অনন্ত জলিল প্রযোজিত, পরিচালিত ও অভিনীত চলচ্চিত্র ‘নিঃস্বার্থ ভালোবাসা’ ছবিটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হয়। উৎসবের সবচেয়ে বড় স্ক্রিন অলিম্পিয়ায় প্রদর্শিত হয় এই ছবি। সে বছরই প্রথমবারের মতো কান চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দেন অভিনেত্রী জয়া আহসান। কান চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজকদের পক্ষ থেকে একজন ‘বহুমাত্রিক অভিনেত্রী’ হিসেবে জয়া আহসানকে সেবার আমন্ত্রণ জানানো হয়।
তার ঠিক পরের বছর নির্মাতা কামার আহমাদ ‘শুনতে কি পাও’ চলচ্চিত্র নিয়ে কানে উপস্থিত হন। সেটা ছিল প্রতিযোগিতার ৬৭ তম উৎসব। সেই আয়োজনে তাঁর প্রথম নির্মাণ ‘শুনতে কি পাও’ ফ্রান্সের ‘সিনেমা দ্যু রিলে’ আসরের গ্রাঁ প্রি খেতাব জিতেছিল। সেবার ১২৫টি আবেদন থেকে বাছাই করা ১০টির মধ্যে কামার আহমেদের স্থান পেয়েছিল। যা বংলাদেশের জন্য প্রথম।
২০১৫ সালে  কান উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছিল খিজির হায়াত পরিচালিত ‘আই ফর অ্যান আই’ নামের একটি বাংলাদেশি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। ছবিটি শর্ট ফিল্ম কর্নারে প্রদর্শিত হয়। ১৮ মিনিট দৈর্ঘ্যের এশর্টফিল্মটি বাংলাদেশের নির্মাতার হলেও বাংলাদেশ থেকে সিনেমাটি উৎসবে জমা দেওয়া হয়নি। এটি জমা দেওয়া হয়েছিল কানাডা থেকে। রাজনৈতিক থ্রিলারধর্মী শর্টফিল্মটির চিত্রনাট্য লিখেছেন ক্যারিন ম্যাক্সি। এর প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন শান রহমান এবং কানাডার অভিনেত্রী মমোনা কমাগত। সেবার বাংলাদেশ থেকে কান উৎসবে আরও যোগ দিয়েছিলেন পরিচালক স্বপন আহমেদ।
গত বছর বসে কান উৎসবের ৬৯ তম আসর। তৌকীর আহমেদের অজ্ঞাতনামা ও অমিতাভ রেজার আয়নাবাজি—দুটি ছবি মার্শে দু ফিল্মে দেখানো হয়েছে।
এখানে বলে রাখা ভালো, মার্শে দু ফিল্ম কানউৎসবের মূল অফিশিয়াল সিলেকশনের বাইরে একটি পুরোপুরি বাণিজ্যিক বিভাগ। উৎসবের সময়ে প্যালে ডে ফেস্টিভ্যালের নিচতলার জায়গাটায় নির্দিষ্ট ফি দিয়ে যে কেউ তাঁদের ছবি দেখাতে পারেন। প্রযোজনা সংস্থাগুলোর সুযোগ থাকে বুথ বা টেবিল ভাড়া নিয়ে কাজ তুলে ধরার।
এছাড়া গত বছর কান ক্ল্যাসিকসে দেখানো হয়েছে খান আতাউর রহমান অভিনীত উর্দু ছবি ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ (১৯৫৮)। ছবিটির সহকারি পরিচালক ছিলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান।
এ বছর পূর্ণদৈর্ঘ্য কোন সিনোমা অংশগ্রহন না করলেও স্বল্পদৈর্ঘ্য বিভাগের জন্য নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশি নির্মাতা জসিম আহমেদের চলচ্চিত্র ‘দাগ’।
অনেকে মনে করেন, ‘বাংলাদেশের জন্য আদর্শ হতে পারে ভিলেজ ইন্টারন্যাশনাল নামে কানের বিভাগ। কোনো দেশের সিনেমা আর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বাইরের দুনিয়ায় তুলে ধরার জন্য কান উৎসবে এটাই আসলে সেরা সুযোগ। সেই সুযোগটাই নিয়মিত নেয় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া বা ভারত। এমনকি ইরান, আরব আমিরাত কিংবা মিসরের মতো দেশও পিছিয়ে থাকে না।
এ বছর কান চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের উদীয়মান নির্মাতাদের জন্য একটি প্রকল্প চালু হয়েছে। এর শিরোনাম রাখা হয়েছে ‘ঢাকা টু কান’। এ কার্যক্রমে অংশ নিতে বাংলাদেশ থেকে গিয়েছেন নির্বাচিত কয়েকজন চলচ্চিত্র নির্মাতা। কান উৎসবের বাণিজ্যিক শাখা মার্শে দ্যু ফিল্মের আয়োজনে প্রডিউচার্স ওয়ার্কশপে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন তারা। তাঁদের জন্য তিন দিনের কর্মশালা অনুষ্ঠিত হবে। এই কার্যক্রমে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র পরিচালক, চলচ্চিত্র নির্বাহী ও চলচ্চিত্র শিল্পের প্রভাববিস্তারকারী ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকের সুযোগ পাবেন বাংলাদেশি নির্মাতারা।

Advertisements