পতিতা/যৌনকর্মী ও কিছু কথা


prostitutes, sex worker.jpgদেহব্যবসায় যারা প্রত্যক্ষভাবে যৌনসেবা প্রদান করেন এবং যারা এর সাথে পরোক্ষভাবে কাজ করেন যৌনকর্মী শব্দটি তাদের সবাইকে নির্দেশ করে। যারা প্রত্যক্ষভাবে যৌনসেবা প্রদান করেন তাদের অধিকাংশ সময় ‘গণিকা’, ‘বেশ্যা’ বা ‘পতিতা’ বলা হয়; অপরদিকে যারা পরোক্ষভাবে কাজ করেন তাদের বলা হয় দালাল বা কুটনী, দালাল ছাড়াও আরও পরোক্ষ যৌনকর্মীর অস্তিত্ব বিদ্যামান । দালাল যৌনকর্মী (কুটনী) টাকার বিনিময়ে মক্কেল ও গণিকার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে, মক্কেলের যৌনকাজের জন্য এরা মক্কেলের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করে কথা বলে সবকিছু ঠিক করে, প্রয়োজনে নিরাপদ স্থানও ঠিক করে দেয়। গণিকা বা বেশ্যার দালালের বাইরেও আরো অনেক ধরনের যৌনকর্মী আছে, যারা পরোক্ষভাবেই যৌনব্যবসার সাথে জড়িত, তাদের মধ্যে আসতে পারে, ফৌনিন-যৌনকর্মী (ফনো-সেক্স-ওয়ার্কার) যারা মোবাইল ফোনালাপের মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে যৌনসেবা প্রদান করে , ওয়েব-ক্যাম ব্যবহার করে সরাসরি মক্কেলের সাথে যৌন-ভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে যৌনসেবা প্রদান করে করে । যৌন-ভিত্তিক একধরনের চলচ্চিত্রও তৈরী হয় যাকে পর্ন ফিল্ম বা ব্লু ফিল্ম বা নীল ছবিও বলা হয়ে থাকে, এই ধরনের চলচ্চিত্রে যারা অভিনয় করেন তাদের পর্ন তারকা বলা হয়। এই পর্ন তারকারা পরোক্ষভাবে মক্কেলদেরকে যৌনপল্লীর দিকে ঠেলে দেয় তাই এদেরকেও যৌনকর্মী বলা হয়, শুধু তাই নয় নীল ছবিকে ঘিরে বিশাল পরিমান ব্যবসাও বিদ্যামান। অনুরূপে, আমরা যদি খেয়াল করি তাহলে দেখতে পাবো, যৌন আবেদন বিষয়ক অনেক বই পাওয়া যায় যেগুলো চটি বই হিসাবে পরিচিত, চটি বইয়ের লেখকদের চটি লেখক বলা হয়, চটি লেখক প্রকাশক থেকে শুরু করে বইয়ে ভিতর ব্যবহৃত উলঙ্গ, অর্ধ-উলঙ্গ বা আবেদনময়ী ছবির মডেল এদের সবাইকে যৌনকর্মী বলা যেতে পারে।

prostitutes, sex work.jpgপতিতা : পতিতা অর্থাৎ বেশ্যারা হলো সেই সকল নারী যারা পুরুষকে যৌন সুখ ভোগ করতে নিজেদের দেহ দিয়ে আপন জীবিকা উপার্জন করে । বেশ্যারা প্রয়োজনমত নিজেকে সর্বদা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও অলঙ্কারে ভূষিতা রাখে । যেন এক প্রকার পণ্য দ্রব্য । তারা সব সময় মনে করে সৌন্দর্য্য দিয়ে পুরুষকে জয় করতে পারলেই মিলবে তার যাচিত অর্থ । বেশ্যাদেরও ঘটক বা দূত থাকে । তারা অন্য লোককে তার গুণ পণ্য বলে তাকে আকর্ষন করে নিয়ে আসে ।
পতিতাদের অসংখ্য নামে ডাকা হতো ইতিহাসের আদিকাল থেকেই ॥ যেমন – দেহপসারিণী, বেশ্যা, রক্ষিতা, খানকি, উপপত্নী, জারিণী, পুংশ্চলী,অতীত্বরী, বিজর্জরা, অসোগু,গণিকা ইত্যাদি।

যৌনকর্মী:  যৌনকর্মী বা sex worker, দেহব্যবসার সাথে যে সকল ব্যক্তি জড়িত তাদেরকে যৌনকর্মী বলে।দেহব্যবসা বিরোধী, গণিকা বিরোধী নারীবাদী, গণিকা নিষিদ্ধকরণের সমর্থক এবং সামাজিক রক্ষণশীলদের কাছে শব্দটি অগ্রহনযোগ্য। এরা দেহব্যবসাকে নিপীড়ন অথবা অপরাধ হিসাবে দেখে।

পতিতালয় : পতিতালয় এমন একটি জায়গা যেখানে মানুষ কোনো পতিতার সাথে যৌন সঙ্গমের উদ্দেশ্যে আসে। সাধারণত যে স্থানে পতিতাদের অবস্থান সে স্থানকেই পতিতালয় বলা হয়, কিন্তু যেখানে পতিতাবৃত্তি বা পতিতালয় নিষিদ্ধ সেখানে বিভিন্ন ব্যবসা যেমন ম্যাসেজ পার্লার, বার ইত্যাদির আড়ালে পতিতালয় বা পতিতাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। অনেক আইনে পতিতালয় বৈধ আবার অনেক আইনে এটি অবৈধ অথবা নিয়ন্ত্রিত।
অনেক যৌনকর্মী অাছেন যারা টাকার বিনিময়ে টিভিতে সরাসরি যৌন অনুষ্ঠান, অথবা ওয়েবক্যামে যৌন কর্মক্ষমতা প্রদর্শন কিংবা আবেদনময়ী নাচ করেন, এছাড়াও তারা আরো অনেক ধরনের যৌন-ভিত্তিক অনুষ্ঠানে যান । উদাহরণস্বরূপ: striptease, Go-Go dancing, lap dancing, Neo-burlesque, এবং peep shows ইত্যাদি। অনেক সময় যৌন চিকিৎসক যৌনকর্মীর মাধ্যমে যৌনরোগীদের এক ধরনের থেরাপি দিয়ে থাকেন যাতে যৌন দুর্বল ব্যক্তিরা অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে যৌন সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে, অনেকসময় যৌনসঙ্গমের সময় যারা দূর্বলতায ভোগেন ডাক্টাররা তাদের বিভন্ন রকমের পর্ন ভিডিও দেখার পরামর্শ দিয়ে থাকেন । আমাদের সমাজসহ সারা বিশ্বেই যৌন কর্মীদের অবহেলা ও খারাপ চোখে দেখা হয়ে থাকে , কিন্তু যৌনরোগীদের থেরাপিতে কাজসহ যৌনকর্মীদের নানা ধরনের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখপূর্বক অনেকেই গণিকাদের কলঙ্ক দেওয়ার পক্ষপাতি নয়, অনেক সময় যৌনকর্মীদের কলঙ্ক না দেওয়ার জন্য তারা আহ্বান করে থাকেন[২] ।

prostitute, potita.jpgদারিদ্র্য থেকেই পতিতাবৃত্তি : সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যৌন বাজারে শিশু, যুবতী মেয়ে ও মহিলার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে আশঙ্কাজনকভাবে। বিশাল সংখ্যক নারী পতিতাবৃত্তিতে আসার সবচেয়ে বড় কারণ হলো দারিদ্র্য এবং আর্থিক দৈন্যদশা। এর সাথে জড়িত অন্যান্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় পারিবারিক কলহ, শিক্ষার অভাব, কর্মসংস্থানের অভাব, শারীরিক নির্যাতন ও ধর্ষণ। এছাড়া গ্রামের মেয়েরা বিভিন্ন সময় কাজের সন্ধানে শহরে এসে দালাল চক্রের শিকার হয়ে শেষ পরিণতি হিসেবে পতিতাবৃত্তিকেই বেছে নেয়। এরপর থেকেই তাদের জীবনে নেমে আসে অমাবস্যার অন্ধকার। জীবনের চিরসবুজ স্বপ্নের মৃত্যু ঘটে তখন। অর্থনৈতিক দৈন্যদশা ও দারিদ্র্যের কারণে নারী ও অল্প বয়স্ক মেয়েরা পতিতাবৃত্তিতে যুক্ত হতে বাধ্য হয়। নিজের ইচ্ছাটাকে বিসর্জন দিয়ে নির্মম নির্যাতন সহ্য করতে হয় তাদের কোনোরকমে খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকার তাগিদে। বিভিন্ন এনজিও তাদের সুবিধার্থে কাজ করে গেলেও এদের পুনর্বাসন এবং অন্ধকার জীবন থেকে সব সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে সরকারের জোর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য মতামত দেন বিশেষজ্ঞরা। এ গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আল-আমিন রাব্বী বলেন, দারিদ্র্য এবং আর্থিক দৈন্যতাসহ বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক কারণে নারীরা এ পেশার সাথে ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় জড়িয়ে পড়ে। এ পেশার সাথে জড়িতের সংখ্যা দিনের পর দিন বাড়ছে। তাই এ ব্যাপারে সরকারের অবিলম্বে দৃষ্টি দেয়া উচিত বলে জানান তিনি।
গবেষণা সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রায় ১২টির মতো পতিতালয় রয়েছে। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সর্বত্র তরুণীদের, বিশেষত যারা ১৩-৩৫ বছর বয়সের এদের পতিতাবৃত্তির জন্য বড় রকমের চাহিদা আছে। বাংলাদেশের পতিতাদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ আসে কৃষিজীবী পরিবার ও ভূমিহীন নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে। দেশের বিভিন্ন পতিতালয় নিয়ে হাতে গোনা যে কয়েকটি গবেষণা হয়েছে তাতে দেখা যায় এসব জায়গায় নিয়োজিত মেয়েদের অধিকাংশই এসেছে মূলত গ্রামের দরিদ্র পরিবার থেকে। ১৯৯৯ সালে উচ্ছেদকৃত টানবাজার পতিতালয় সম্পর্কে একটি সমাজতাত্তি্বক গবেষণা থেকে জানা যায়, এখানকার অনেক মেয়েই এসেছে গ্রামের দরিদ্র, ভূমিহীন কৃষক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা ছোটখাট গ্রামীণ কারুশিল্প নির্ভর পরিবার থেকে। আরো জানা যায়, পতিতাবৃত্তিতে নিয়োজিত নারীদের অধিকাংশই অপ্রাপ্ত বয়স্ক হিসেবে কাজ শুরু করে। আইনে অপ্রাপ্ত বয়স্কদের দিয়ে পতিতাবৃত্তি করানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকলেও আইনের রক্ষকরা তাতে সহায়তা করে। অবৈধ উপায়ে পুলিশের খাতায় এই অপ্রাপ্ত বয়স্কদের নাম উঠে এবং ঘুষের বিনিময়ে প্রাপ্ত বয়স্ক পরিচয়ে এদের জন্য এফিডেভিট জোগাড়ের ব্যবস্থা আছে। এ কারণে এ পেশায় অপ্রাপ্ত বয়স্কদের সংখ্যা বাড়ছে দিনের পর দিন। তাহলে বলা যায়, অপ্রাপ্ত বয়স্কদের পতিতাবৃত্তিতে আসার পিছনে আইনের রক্ষকরাও দায়ী।

কোন মেয়েই পতিতা হয়ে জন্মায় না । আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে অর্থনৈতিক সমস্যা, পক্ষপাতদুষ্ট সামাজিক নিয়ম, পারিবারিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের অভাব ইত্যাদি পরিস্থিতির স্বীকার হয়েই একটা মেয়ে বেছে নিতে বাধ্য হয় এই ঘৃণিত পতিতার জীবন । এটা কোন মেয়েরই কাম্য জীবন নয় । একটা মেয়ের পতিতা হয়ে উঠার পেছনের কাহিনী যাই হোক এটা ঠিক যে কোন মেয়েই স্বেচ্ছায় পতিতার জীবন বেছে নেয়না। কিন্তু প্রায় সব সময়ই যে বা যারা এই মেয়েটিকে অন্ধকার পতিতার জীবনে ঠেলে দিচ্ছে তারা রহস্যময় ভাবে থেকে যাচ্ছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে । যে পুরুষটি তাকে ব্যবহারের মাধ্যমে পতিতার সীলমোহর লাগিয়ে দিচ্ছে সেও সমাজের বুকে কোন নারীর সন্তান, ভাই, স্বামী বা বাবা হিসেবে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে । কেন অন্যের কৃত কর্মের দায় শুধুমাত্র মেয়েটিকেই একা বয়ে বেড়াতে হবে ? যে সমাজ মেয়েটিকে নিরাপত্তা দিতে পারল না, তার প্রতি হয়ে যাওয়া অন্যায়ের সুবিচার করতে পারল না, তার কি অধিকার আছে এই মেয়েটির দিকে আঙ্গুল তোলার ?”

পতিতাপ্রথাকে বৈধ করা মানে নারী নির্যাতনকে বৈধ করা। যে রাষ্ট্রে পতিতা প্রথা বৈধ সেই রাষ্ট্র সত্যিকার কোনও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়। গণতন্ত্র মানবাধিকার নিশ্চিত করে, নারী-পুরুষের সমানাধিকার নিশ্চিত করে। কোনও সভ্যতা বা কোনও গণতন্ত্র মানুষের উপর নির্যাতনকে ছল-ছুতোয় মেনে নেওয়ার চেষ্টা করে না। করতে পারে না। যদি করে, সেই গণতন্ত্রের নাম নিতান্তই পুরুষতন্ত্র, আর সেই সভ্যতার নাম বর্বরতা ছাড়া অন্য কিছু নয়”।
পতিতাবৃত্তি বা বেশ্যাবৃত্তিকে রোধ করতে হলে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি সরকারকেও এর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। সামাজিকভাবে সকলে মিলে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুললে আশা করা যায় বেশ্যাবৃত্তি বা বেশ্যালয়কে সমাজ থেকে ধ্বংস করা যাবে। লাস ভেগাস, ম্যাকাউয়ের বিখ্যাত বেশ্যালয়গুলি অতীত হয়ে যাক। জেনে রাখুন,  ৯২% যৌনজীবী কোন না কোন যৌন রোগে আক্রান্ত। যার মধ্যে বেশীরভাই মারাত্নক ও দীর্ঘমেয়াদি। বিভিন্ন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ফাংগাস ইত্যাদি একজন পেশাদার যৌনজীবীর শরীরকে নিরাপদ পোষক হিসেবে ব্যবহার করে। ক্ষতযুক্ত প্রশস্ত যৌনাঙ্গ যৌনজীবীদের একটা সাধারন বৈশিষ্ট্য। যতই কনডম বা অন্যান্য ব্যবস্থা নেয়া হোক না কেন এই সকল জীবাণুগুলো অতি উচ্চমাত্রার সংক্রামক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। কোন লাভ হয় না।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s