জানা-অজানা তৃতীয় লিঙ্গ/হিজড়া সম্প্রদায়


hizra, hijra, common gender“হিজড়া” ইংরেজি: Hijra – Common Gender, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ক্রোমোজোমের ত্রুটির কারণে জন্মগত যৌন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, যাদের জন্মপরবর্তী লিঙ্গ নির্ধারণে জটিলতা দেখা দেয়, মূলত তারাই হিজড়া। হিজড়া শব্দের অপর অর্থ হচ্ছে ‘ট্রান্সজেন্ডার’, ট্রান্সজেন্ডার বলতে এমন এক লৈঙ্গিক অবস্থাকে বুঝায় যা দৈহিক বা জেনিটিক কারণে মেয়ে বা ছেলে কোন শ্রেণীতে পড়ে না। সাধারণ অর্থে হিজড়ার অভিধানিক অর্থ বলতে আমরা বুঝি একই দেহে নারী ও পুরুষের চিহ্নযুক্ত মানুষ । যারা সন্তান উৎপাদনে অক্ষম ।
পৃথিবীতে কখন থেকে হিজড়াদের আবির্ভাব হয়েছে তা সঠিক জানা যায়নি। তবে নৃতত্ত্ববিদদের মতে, যখন থেকে পৃথিবীতে মানব জাতির আবির্ভাব তখন থেকেই হিজড়ার আবির্ভাব । সুতরাং প্রতীয়মান হয় যে, মানব সমাজ যতদিন টিকে থাকবে, ততদিন পর্যন্ত হিজড়া সম্প্রদায় অস্তিত্ব নিয়ে টিকে থাকবে। এই তৃতীয় বৈশিষ্ট্যের হিজড়া সম্প্রদায় জন্মের জন্য কোন মতেই তারা দায়ী নয়। এমনকি তার পিতামাতাও দায়ী নয়। এটা নিছক প্রকৃতির একটি পরিহাসমূলক কর্মকাণ্ড। জীববিজ্ঞানীগণ এই তৃতীয় লিঙ্গের বা হিজড়া মানব সন্তান জন্মের রহস্যকে এখন পর্যন্ত উন্মোচন করতে পারেননি। তারা একে কেবল বায়োলজিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কোন একটা সঙ্কট বা বাড়তি বা ঘাটতি বলে ক্ষান্ত হয়ে বসে না থাকলেও তেমন কূল কিনারা খুঁজে পাচ্ছেন না।
শারীরিক ও মানসিক গঠনের উপর নির্ভর করে এদেরকে ৬ ভাগে ভাগ করা যায়। শারীরিক ভাবে পুরুষ কিন্তু মানষিক ভাবে নারী বৈশীষ্ট্য এর অধীকারী হিজড়াদের বলা হয় অকুয়া, অন্য হিজড়াদের ভরা হয় জেনানা, আর মানুষের হাতে সৃষ্ট বা ক্যাসট্রেড পুরুষদের বলা হয় চিন্নি।
উল্লেখ্য যে, হিজড়া সন্তানের জন্মের পর আধুনিক চিকিত্সায় বা অস্ত্রোপাচারের মাধ্যমে কোন লিঙ্গের অধিকারী হবে, তা নির্ধারণ করে দেয়ার ব্যাপারটা জটিল হলেও সম্ভব। কিন্তু নানা কারণে অনেক ক্ষেত্রে চেষ্টার পরও প্রতিবন্ধকতার কারণে সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। ফলশ্রুতিতে হিজড়া সম্প্রদায় একই বাবা-মায়ের সন্তান হয়েও অন্য ছেলে-মেয়েদের মতো সম্মানযোগ্য অবস্থানে নেই। তারা প্রচলিত মানব সমাজের, রাষ্ট্রের ও পরিবারের কাছে হচ্ছে সদানিয়ত বৈষম্যের শিকার। এই বৈষম্যগত কারণে এবং আচরণে হিজড়া সম্প্রদায় অন্য মানুষের মতো প্রাপ্য ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকে এবং অপর একটি ভিন্ন জগতের বাসিন্দায় রূপান্তরিত হয়ে সমাজে উপেক্ষিত জীব হিসেবে কালাতিপাত করে থাকে। এ সম্প্রদায়ের প্রতি এই বৈষম্যগত আচরণ এবং অবহেলা তার পরিবার, সুশীল সমাজ, এমনকি তারা জন্মগতভাবে যে রাষ্ট্রের নাগরিক সেই রাষ্ট্রের মধ্য থেকেও অনেক দূরে। তাছাড়া কোন ধর্মেও অনুশাসনের আওতা ধরে তাদের নিয়ে তেমনভাবে মাথা ঘামানো হয়নি। যেহেতু সব মিলে তাদের নাগরিক অধিকারের স্বীকৃতি পুরাপুরি মেলেনি বিধায় তারা মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত একটি অন্ধকার জগতের বাসিন্দা হিসেবে বিদ্যমান এবং প্রকারান্তরে পরিবার, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মানবেতর অপরিচ্ছন্ন জীবন-যাপন করে চলেছে। আসলে তারা উভয় লিঙ্গ হলেও কোনটিই কার্যকরী নয়। প্রধানত এদের দুটি বৈশিষ্ট্যগত ধরনঃ যেমন-  ক) প্রকৃতিদত্ত এবং খ) মানুষের হাতে সৃষ্ট।
সারা পৃথিবী জুড়ে প্রকৃতিদত্ত বৈশিষ্ট্যের হিজড়াদের ধরন প্রায় একই। তবে জীববিজ্ঞানী এবং চিকিত্সাবিদরা লৈঙ্গিক, মনস্তাত্ত্বিক ও আচরণগত বৈশিষ্ট্য অনুসারে প্রকৃতিদত্ত বৈশিষ্ট্যের হিজড়াদের ছয়টি ধরন চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু মানুষের হাতে সৃষ্ট লৈঙ্গিক বিকৃতিগ্রস্ত হিজড়াদের ধরন ও জীবন পরিণতি স্থানীয় সংস্কার ও নিয়ম, সামাজিক প্রথা এবং আর্থ-সামাজিক মর্যাদা ও অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল। কিছু হিজড়াকে অকুয়া বলা হয়, যারা শরীরীভাবে পুরুষ, কিন্তু মানসিকভাবে নারী স্বভাবের।
প্রকৃতপক্ষে চিকিত্সা বিজ্ঞানে হিজড়া কথাটি আমাদের সমাজেরই তৈরি। বাবা মা দু’জনের জিনঘটিত সমস্যা থাকলে, তাদের শিশু হিজড়া হতে পারে। এক্ষেত্রে বাবা মা স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু উভয়ের কাছ হতে ত্রুটিপূর্ণ জিন পাওয়ায় শতকরা ২৫ ভাগ ক্ষেত্রে শিশুর শরীরে হরমোনের অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে। অল্প বয়সে রোগ ধরা পড়লে এর চিকিত্সা সম্ভব। কিন্তু আমাদের দেশের হিজড়া শিশুদের ব্যাপারে সচেতনতার অভাব রয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় মানুষ জানেই না যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে হিজড়াদের চিকিত্সা এদেশেই সম্ভব। ছোট বেলাতেই হিজড়া শিশুকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার প্রবণতা আমাদের দেশে রয়েছে। এটা না করে তাদের যথাযথ চিকিত্সার ব্যবস্থা করলে এরাও অন্য দশজনের মতো যতদূর সম্ভব স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে বাস করতে পারে। অথচ হিজড়া শিশুর জন্ম দেয়ায় অধিকাংশ বাবা মা ও পরিবার সামাজিকভাবে লজ্জা ও গ্লানিতে ভোগেন, ফলে একটা বড় অংশ সম্পূর্ণ পরিবার থেকে আলাদা হয়ে থাকে। সাধারণ বাংলাদেশে হিজড়ারা নিজেদের একটি আলাদা সমাজ তৈরি করে বসবাস করছে। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের হিজড়া সমাজ একই ধারায় গড়ে উঠেছে। এই উপমহাদেশের মতো হিজড়া সমাজ ব্যবস্থা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। ইউরোপসহ পাশ্চাত্য বিশ্বে হিজড়া বা জন্মগত যৌন প্রতিবন্ধীরা তাদের পরিবারের সাথেই থাকে। অনেক ক্ষেত্রে নিজেরাও সঙ্গী খুঁজে নিয়ে সংসার করে। প্রায় উন্নত দেশে হিজড়াদের উপর সামাজিক ও পারিবারিক সহানুভূতি রয়েছে।
হিজড়াদের সমাজে নেতৃত্ব দেন গুরু মা। হিজড়া সম্প্রদায়সহ অধিকাংশ গুরু মায়েরা মূলস্রোতে ফিরে আসতে চান না। তাছাড়া সমাজও হিজড়াদের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন অনুভব করে না। এ কারণেই বাংলাদেশের হিজড়া সমাজ সুবিধা বঞ্চিত প্রান্তিক এক জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। উল্লেখ্য যে, হিজড়া জনগোষ্ঠীর ওপর সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান ও তথ্য নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো জানায়, এ পর্যন্ত কোন শুমারীতে আলাদাভাবে হিজড়াদের তথ্য সংগৃহীত হয়নি।
চিন্তার বিষয় হলো- এই পৃথিবীতে ওরা জোর করে আসেনি ।দুইজন মানব মানবীর চূড়ান্ত ভালোবাসার ফসল ওরা । যারা ওদের পৃথিবীতে এনেছিলো তারাই ওদের স্থান দেয়নি ।কতটা দুঃখ কষ্ট আর বঞ্চনা সহ্য করে ওরা হাতে তালি দিয়ে যাচ্ছে, হয়তো আমাদের মানবতাবোধকে পরিহাস করে । আসুন ওদের মানুষ ভাবি, ওদের দুঃখ কষ্টগুলো লাঘব করার চেষ্টা করি, এ পৃথিবী থেকে ওদের পাওনা বুঝিয়ে দেই ।

Advertisements
This entry was posted in Artikel/Data (প্রবন্ধ), Different. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s