froutনিয়মিত ফল খাওয়ার অভ্যাস আমাদের নেই। তবে মৌসুমি ফল খাওয়ার প্রবণতা আমাদের রয়েছে। ফল-ফলাদি পুষ্টিকর হলেও রোগ-ব্যাধিতে ফল খাওয়ার ব্যাপারে চিকিৎসকদের বিধিনিষেধ থাকে। যেমন_ কিডনি, হার্ট ফেইলুর, লিভার এসব রোগে নির্দিষ্ট কিছু ফল খেতে চিকিৎসকরা বারণ করে থাকেন। ডায়াবেটিসের মতো রোগ, যেখানে রক্তে অতিরিক্ত গল্গুকোজই প্রধান সমস্যা, সেখানে ফল খাওয়াটা আরও বিবেচনার দাবিদার।
দীর্ঘমেয়াদি ব্যাধি ডায়াবেটিস। অগ্ন্যাশয় থেকে যথেষ্ট পরিমাণ ইনসুলিন নিসৃত না হলে অথবা দেহকোষ ইনসুলিন প্রতিরোধী হয়ে উঠলে ডায়াবেটিস হয়। এ উভয় ক্ষেত্রে শর্করা কোষে যথাযথভাবে সঞ্চিত হতে পারে না, দেখা দেয় গুরুতর জটিলতা। টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির একটি বড় অংশ স্থূলতার শিকার। স্থূলতা পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি না হতে পারার অন্যতম কারণ। আদর্শ ওজন রক্তে শর্করার মাত্রা ঠিক রাখে। তাই টাইপ-১ বা টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের খাদ্যতালিকা ঠিক রাখা খুব প্রয়োজন। যেসব খাবারে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (জিআই) কম ও ফাইবারের পরিমাণ বেশি, সেগুলো ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য সবচেয়ে ভালো। কারণ এসব খাবার রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণের ওপর ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে।
ফলের প্রসঙ্গ এলে ডায়াবেটিক রোগীরা পড়ে যান দ্বিধাদ্বন্দ্বে। রয়েছে নানা রকম প্রচলিত ধারণাও। মিষ্টি ফল হলেই ডায়াবেটিক রোগী খেতে পারবেন না, তা নয়। লক্ষ রাখতে হবে পরিমিত পরিমাণের দিকে। কিছু ফল রয়েছে, যেগুলোর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স খুব কম। রয়েছে উচ্চমানের ফাইবার। হিসাব মতো খেলে স্থূলতা ও রক্তে অতিমাত্রার শর্করা  উভয়ই রোধ করা সম্ভব।
মিষ্টি জিনিসটা পুরো কার্বোহাইড্রেট। কিছু ফল আছে যেগুলো অন্য ফলের চেয়ে বেশি মিষ্টি, অর্থাৎ বেশি কার্ব ধারণ করে। কিন্তু তার মানে এই না যে ডায়াবেটিস আছে বলে আপনি সেসব ফল খেতে পারবেন না। রক্তের সুগার লেভেল তখনই বাড়বে যখন আপনি একটা নির্দিষ্ট পরিমানের চেয়ে বেশি কার্ব খাচ্ছেন। এই কার্ব কোন খাবার থেকে আসছে, সেটা বড় ব্যাপার নয়।
আপনি যখন একবার ফল খাবেন, তখন খেয়াল রাখবেন যে ফল থেকে প্রাপ্ত মোট কার্বের পরিমান যেন ১৫ গ্রামের বেশি না হয়। এটা নির্ভর করছে, ফলে কি পরিমান কার্ব আছে, তার উপর। আপনি যদি এমন ফল খান যাতে কার্বের পরিমান কম থাকে, তাহলে সুবিধা হলো বেশি ফল খেতে পারছেন এবং অন্য দিকে বেশি করে প্রোটিন জাতীয় খাবার খেতে পারবেন। যাই হোক, লো-কার্ব বা হাই-কার্ব ফল কোন ব্যাপার না। যতক্ষণ না আপনি ১৫ গ্রামের বেশি কার্ব খাচ্ছেন ততক্ষণ রক্তে সুগার লেভেল একই থাকবে। কোন সমস্যা হবে না।

moushumi fol, frout.jpgডায়াবেটিসে যে ফল খেতে নেই মানা
কিউই: মজাদার এই ফলটি বিদেশি হলেও আজকাল আমাদের দেশে সহজেই কিনতে মেলে। গবেষণায় দেখা গেছে যে এই ফলটি দেহের সুগারের স্তরকে কমিয়ে আনতে সহায়তা করে, তাই এই ফলটি ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য বেশ কার্যকরি।
কালো জাম: গ্রীষ্মের ফল কালোজাম ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য উপকারী একটি ফল। এতে থাকা বিভিন্ন উপাদান রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে তাই ডায়াবেটিক রোগীরা একদম চিন্তামুক্তভাবে এই ফলটি খেতে পারেন। শুধু ফলই নয়, কালোজামের বীজকে গুঁড়ো করে দিনে একবার যদি হাফ চামচ খাওয়া যায় সেটিও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
অ্যাভোকাডো: মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাট সমৃদ্ধ বিদেশি ফল অ্যাভোকাডো হজমক্রিয়াকে ধীর করে এবং রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া অ্যাভোকাডোতে থাকা ভাল ফ্যাট ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতেও সাহায্য করে।
কামরাঙ্গা: বিশেষ করে টক কামরাঙ্গা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য খুবই উপকারী। কালো জামের মতো এটিও রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে ফলে ডায়াবেটিক রোগীরা তাদের শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই ফলটি তাদের খাবার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন।
পেয়ারা: প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি এবং ডায়েটারি ফাইবার রয়েছে পেয়ারায়। ডায়েটারি ফাইবার থাকার কারণে জিআই খুবই কম পরিমাণে থাকে যা রক্তের শর্করা না বাড়িয়েই শরীরে দেয় বাড়তি পুষ্টি। এছাড়া ডায়েটারি ফাইবার কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতেও সহায়তা করে।
আনারস: আনারস অ্যান্টি ভাইরাল, অ্যান্টি ইনফ্ল্যামাটরি এবং অ্যান্টি ব্যাকটরিয়াল একটি ফল, যা খেলে দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায়, ফলে সাধারণত ভাইরাল জ্বরে আনারস অনেক বেশি কাজে দেয়। এছাড়া ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণেও আনারস বেশ কার্যকরি।
পেঁপে: পেঁপেতে রয়েছে ভিটামিন এবং মিনারেল, যার কারনে পেঁপে ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য বেশ কার্যকর। কাঁচা ও পাকা দুই রকম পেঁপেই ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপকারী। খিদে পেলে পেট ভরাতেও অনন্য এই খাবার, তবে পাকা পেঁপে মিষ্টি হলে খাবেন পরিমিত পরিমাণে।
ডালিম: ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে সুগারের নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করে ডালিম। ডালিম এমনিতেই অনেক রোগের কার্যকরি ওষুধ হিসেবে কাজে দেয়, তবে ডায়াবেটিস রোগটি নিয়ন্ত্রণে এটি বেশ সহায়তা করে।
জামরুল: তরমুজের মতো জামরুলেও রয়েছে প্রচুর পরিমাণে পানি, তাই ডায়াবেটিস রোগীরা নিয়মিত জামরুল খেতে পারেন। জামরুল রক্তের চিনির পরিমান নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়াও জামরুলে আছে প্রচুর পরিমানে ফাইবার যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে বেশ উপকারী।
আমলকী: আমলকীতে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন সি আছে। ডায়াবেটিস রোগীরা নিয়মিত আমলকী খেলে রক্তের চিনির পরিমান নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
আমড়া: আমড়া একটি পুষ্টিকর টক ফল। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ভিটামিন সি সমৃদ্ধ এই ফলটি খুবই উপকারী।
টক বড়ই: টক বড়ইতে আছে প্রচুর ভিটামিন সি যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপকারী।
তাই দেরি না করে মৌসুমী এই ফলগুলো নিয়মিত খাওয়া শুরু করুন। এখন বাজারে টক বড়ই ও আমলকী প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যাচ্ছে। বড়ই দিয়েই শুরু হোক ফল খাওয়া।

কোন ফলে কতো সুগার?
ফলের মধ্যে সুগারের পরিমান বেশি (অন্তত কিছু ফলে)। কিন্তু এতে দুশ্চিন্তার কিছু নেই এবং খাদ্য তালিকা থেকে ফল বাদ দিতে হবে না। তবে পরবর্তীতে যখন আপনি আপনার খাবারের তালিকা থেকে চিনি জাতীয় খাবার কমাবেন তখন খাবারের তালিকায় বেশি পরিমাণ ফল রাখা ডায়েটে সেরা সমাধান হতে পারে না। এটা সত্যি যে, ফল-এ প্রাকৃতিক চিনি থাকে যেখানে অন্যান্য খাবারে সাধারণত পরিশোধিত চিনি বিদ্যমান। কিন্তু তারপরও ফল আপনার চিনি খাওয়াতে অবদান রাখে- ফল খাওয়া অব্যাহত রাখুন, কিন্তু হয়তো অনেক বেশি না। এ প্রতিবেদনে আপনার পছন্দসই ফলের মধ্যে বিদ্যমান প্রাকৃতিক চিনির পরিমাণ তুলে ধরা হলো।
আঙুর : কে জানে যে, ছোট্ট এই ফলে এত বেশি পরিমান সুগার? এক কাপ পরিমাণ আঙুর খাওয়া মানে ২৩ গ্রাম সুগার খাওয়া। কিন্তু আঙুরে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলো এত ধরনের উপকারিতা প্রদান করে যে, খাদ্য তালিকা থেকে আঙুর বাদ দেওয়া কঠিন। তাই কি পরিমান খাচ্ছেন, সেদিকে লক্ষ্য রাখুন।
চেরি : চেরি ফলে প্রচুর ফাইবার এবং ভিটামিন সি রয়েছে, তাই এটা বিশ্বাস করা কঠিন যে, মাত্র এক কাপ পরিমান এই সুস্বাদু ফলে ২০ গ্রাম সুগার রয়েছে। আপনাকে চেরি না খাওয়ার কথা বলছি না বরঞ্চ পরিমাণ কমানোর কথা বলছি।
আপেল : আপনার অভিভাবক সম্ভবত আপনাকে অসংখ্যবার একথা বলেছে যে, প্রতিদিন একটি আপেল ডাক্তার থেকে দূরে রাখে। কিন্তু এটা হয়তো বলেনি যে, একটি মাঝারি আকারের আপেলে ১৯ গ্রাম সুগার থাকে। আপেলের ইতিবাচক দিক হচ্ছে, আপেল অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ডায়েটি ফাইবারের একটি বড় উৎস। এসব ফাইবার নিশ্চিত করে যে, রক্তে সুগার ধীরে ধীরে শোষিত হবে, শক্তির একটি স্থির উৎস প্রদান করবে। তাই আপেলের সুগার নিয়ে ভয় পেয়ে দূরে রাখার কোনো কারণ নেই।
আনারস : এক কাপ পরিমান আনারসে ১৬ গ্রাম সুগার থাকে। তবে সুগারের এই পরিমানটা আনারস থেকে আপনাকে দূরে রাখতে যথেষ্ট নয়। কারণ এই ফলে পর্যাপ্ত ম্যাগনেশিয়াম ও ভিটামিন সি রয়েছে। এর এই ভালো দিকগুলো এর খারাপ দিকটিকে অতিক্রম করার জন্য যথেষ্ট।
ব্লুবেরি : ব্লুবেরি ফলে প্রচুর পরিমান ভিটামিন সি, পটাসিয়াম এবং ফাইবার রয়েছে। কিন্তু আপনি হয়তো জানেন না যে, ছোট এক কাপ পরিমান ব্লুবেরিতে ১৫ গ্রাম সুগার রয়েছে। যেহেতু স্ন্যাকস হিসেবে ব্লুবেরি খুবই সুস্বাদু, তাই বেশি খাওয়ার সম্ভাবনা থাকেই। তাই সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে ব্লুবেরির স্ন্যাকসের পরিমাণের ওপর নজর রাখুন।
কলা : এ তথ্য আপনাকে হয়তো চমকে দেবে, কিন্তু সত্যি সত্যিই একটি কলা ১৪ গ্রাম সুগারযুক্ত। এটা শোনার পর নিশ্চয় আপনি আপনার কলা খাওয়ার অভ্যাস বাদ দিতে প্রস্তুত হয়ে যাবেন। কিন্তু তার আগে কলার অন্যান্য উপকারিতা উপাদানগুলোর কথাও ভাবুন। যেমন পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ফাইবারের মতো উপাদান রয়েছে এতে। এছাড়া ব্যায়াম পরবর্তী পেশীর টান লাগা্ প্রতিরোধ করে।
কমলা : একটি কমলায় ১৩ গ্রাম সুগার থাকে। যা হোক, কমলার উপকারিতার দিকে নজর দেওয়া যাক। শরীরের জন্য এটি খুবই উপকারী একটি ফল। ভিটামিন সি, ভিটামিন এ, ক্যালসিয়াম, ফাইবার এবং পটাসিয়ামের একটি বড় উৎস কমলা। শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ভিটামিন এবং খনিজ সরবরাহ করে কমলা। আপনি নিশ্চিতভাবেই এসব পুষ্টির উপকারিতা থেকে বঞ্চিত থাকতে চান না কিন্তু মনে রাখতে হবে অনিয়ন্ত্রিত ভাবে খাওয়াটা ভালো ধারণা নয়।
পিচ : গ্রীষ্মকালীন ফল পিচ এবং মাঝারি আকারের একটি পিচ ফল এ ১৩ গ্রাম পরিমাণ সুগার থাকে। হয়তো এ কারণেই এই ফল এত মিষ্টি। পিচ ফল ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসের একটি বড় উৎস। তাই গ্রীষ্মকালীন ফল হিসেবে এটিকে উপভোগ করুন।
তরমুজ : গ্রীষ্মকালীন সেরা একটি ফল হচ্ছে, তরমুজ। স্বাদ এবং সুগারে এটি এই তালিকার অন্যান্য ফলের কাজে পরাজিত হলেও আপনার জন্য লাভজনক। এক কাপ তরমুজে ৯ গ্রাম সুগার থাকে (এই তালিকার অন্যান্য ফলের তুলনায় তাই খারাপ নয়)। তরমুজের ৯২ শতাংশ পানি হলেও এটি শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক ভিটামিন ও খনিজ সরবরাহ করে। তাই খাদ্য তালিকায় রাখুন তরমুজ।
স্ট্রবেরি : ৭ গ্রাম পরিমাণ সুগার থাকে এক কাপ স্ট্রবেরিতে। এটা অনেক বেশি মনে হতে পারে কিন্তু তালিকার অন্যান্য ফলের তুলনায় বেশি নয়। স্ট্রবেরিতে ফলিক, ভিটামিন সি, ফাইবার এবং পটাসিয়াম রয়েছে- যা সুস্বাস্থ্যের জন্য আমাদের প্রয়োজন হয়।
রাস্পবেরি : এক কাপ রাস্পবেরির মধ্যে মাত্র ৫ গ্রাম পরিমান সুগার থাকে। যা বেশি নয়। এই ফল শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসে ভরপুর, তাই সকালে রেস্পবেরির আরো এক কাপ স্মুদি রাখতেই পারেন।
প্যাকেটজাত খাবার ও ট্রিটের তুলনায় এসব ফল খুবই স্বাস্থ্যকর। তাই প্রাকৃতিক সুগার বেশি থাকলেও এসব ফল খাদ্যতালিকায় যোগ করতে পারেন। আপনার পছন্দের ফল খাওয়া বন্ধ করবেন না বরঞ্চ খেয়াল রাখবেন তা যেন মাত্রাতিরিক্ত না হয়। আপনার শরীরে দৈনিক শর্করার যে চাহিদা সেটার মধ্যে ভারসাম্য রাখাটা নিশ্চিত করুন।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s