‘হার্ট অ্যাটাক’য়ের উপসর্গ ও সাবধানতা


hart attack.jpgবর্তমান বিশ্বে হার্ট অ্যাটাক বা হৃদরোগ এক ভয়ংকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বে প্রতিদিন হার্ট অ্যাটাকে অকাল মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে চলেছে। হৃদপি-ের কেন্দ্রীয় মাংসপেশীতে রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হওয়াকে বলা হয় ‘হার্ট অ্যাটাক’, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যা ‘কার্ডিয়াক মাসল ইনফ্র্যাকশন’ নামে পরিচিত।
হার্ট অ্যাটাকের প্রধান ও সাধারণ লক্ষণ হলো বুকে ব্যথাÍএ কথা আমরা সবাই জানি। এই ব্যথা বুকের মাঝখানে বা বাঁ পাশে শুরু হয় এবং ক্রমেই বাঁ হাত, গলা বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়ে। ব্যথার ধরনটিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চাপ দিয়ে ধরে রাখা বা বুকটা দুমড়েমুচড়ে যাওয়ার মতো। সঙ্গে ঘাম হবে প্রচুর। হার্ট অ্যাটাকের এই সাধারণ উপসর্গ হলে কমবেশি সবাই সতর্ক হয়ে ওঠেন এবং জানেন যে এমনটি হলে যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে পৌঁছাতে হবে। কিন্তু সব সময় হার্ট অ্যাটাকে এ রকম উপসর্গ না-ও হতে পারে।
হার্ট অ্যাটাক বা ‘করোনারি আর্টারি ডিজিস’য়ের পূর্বাভাস সম্পর্কে ‘হার্ট ফেইলিআর সোসাইটি অফ আমেরিকা’ FACES বিষয়ে সাবধান থাকতে পরামর্শ দিয়েছে।
– এখানে ‘এফ’ হল অবসাদ বা ‘ফাটিগ’য়ের সংক্ষিপ্ত রূপ। হৃদযন্ত্র যখন শরীরের চাহিদা অনুযায়ী অক্সিজেন-সমৃদ্ধ রক্ত সরবরাহ করতে পারে না, তখনই শরীর ক্লান্ত এবং অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
– ‘এ’ দিয়ে বোঝায় ‘অ্যাকটিভিটি লিমিটেইশন’ অর্থাৎ শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারানো। এক্ষেত্রেও ক্লান্তি ঘিরে ধরে এবং দম ফুরিয়ে আসে।
– ‘সি’ হল ‘কনজেসচন’ অর্থাৎ ফুসফুসে পানি জমা হওয়া। যার ফলাফল হতে পারে কাশি, হাঁচি, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি।
– ‘এডিমা’ বা পা ফুলে যাওয়া বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে ‘ই’। হৃদযন্ত্র যখন শরীরের নিম্নাংশ থেকে ব্যবহৃত রক্ত উপরে ঠেলে দেওয়ার শক্তি কমে যায়, তখন পা, উরু এবং তলপেটে তরল জমা হতে থাকে। অতিরিক্ত তরল জমা হওয়ার কারণে দ্রুত ওজন বাড়ে।
– ‘এস’ দিয়ে বোঝানো হয়েছে ‘শর্টনেস অফ ব্রেথ’ অর্থাৎ হাঁসফাঁস করা। ফুসফুসে পানি জমে থাকলে ব্যবহৃত রক্তের কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে অক্সিজেনের সঙ্গে অদল-বদল করা কঠিন হয়ে যায়। ফলে শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা হয়। দৈনন্দিন কাজ করার সময়, বিশ্রামের সময় এমনকি বিছানায় শোয়া অবস্থায়ও এমনটা হতে পারে।
“বুকে ব্যথা বা অস্বস্তি হার্ট অ্যাটাকের সবচাইতে প্রচলিত লক্ষণ। হৃদযন্ত্রের একটি বন্ধ হয়ে যাওয়া রক্তনালী এই ব্যথার সুত্রপাত ঘটাতে পারে। বুকে প্রচ- চাপ অনুভূত হতে পারে। এই অনুভূতি যে কেনো অবস্থাতেই হতে পারে এবং স্থায়ী হতে পারে কয়েক মিনিট। তাই বুকব্যথা কখনও অবহেলা করা যাবে না।”
“এছাড়াও বমিভাব, বদহজম, বুক জ্বালাপোড়া, পেটব্যথা ইত্যাদি হতে পারে হার্ট অ্যাটাকের কারণে। এই সমস্যাগুলো নারীদের ক্ষেত্রে বেশি হয়। তবে মনে রাখতে হবে, যে কোনো কারণেই এই সমস্যাগুলো হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা চলতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।”
হাত ব্যথা: হার্ট অ্যাটাকের এই পূর্বাভাসের সুত্রপাত হয় শরীরের বাম পাশ থেকে। ব্যথাটা বুক থেকে শুরু হয়ে ক্রমশ হাতের দিকে ছড়াতে থাকে। অনেকসময় রোগী তার বাম হাতে বিরতিহীন ব্যথা অনুভব করতে থাকেন, যা পরে হার্ট অ্যাটাক হিসেবে চিহ্নিত হয়।
মাথা ঘোরা ও ঝিমঝিম ভাব: বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে মাথা ঘোরাতে পারে। তবে মাথা ঘোরার সঙ্গে শরীর বেসামাল লাগা, বুকে অস্বস্তি এবং হাঁসফাঁস লাগলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হতে হবে। এর মানে হল রক্তচাপ কমে গেছে। কারণ হৃদযন্ত্র চাহিদা মাফিক রক্ত সরবরাহ করতে পারছে না।
গলা কিংবা চোয়ালে ব্যথা: সরাসরি গলা কিংবা চোয়ালে ব্যথা শুরু হওয়ার সঙ্গে হৃদরোগের সম্পর্ক নেই। তবে ব্যথা যদি বুক থেকে শুরু হয়ে চোয়াল কিংবা গলায় ছড়ায় তবে সতর্ক হতে হবে।
দ্রুত ক্লান্ত হওয়া: সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় কিংবা হাঁটতে হাঁটতেই যদি দ্রুত হাঁপিয়ে ওঠেন তবে ডাক্তার দেখান। অল্প পরিশ্রমে প্রচ- ক্লান্তি কিংবা দুর্বলতা হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ, বিশেষত নারীদের ক্ষেত্রে।
নাক ডাকা: বিষয়টা স্বাভাবিক মনে হলেও বিকট শব্দে নাকা ডাকা, সেই সঙ্গে দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো শব্দ হওয়া ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’র লক্ষণ। অর্থাৎ ঘুমের মধ্যে দমবন্ধ হয়ে যাওয়ার সমস্যা রয়েছে। এতে হৃদযন্ত্রের উপর প্রচ- চাপ পড়ে, যার ফলে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
অতিরিক্ত ঘাম: স্বাভাবিক তাপমাত্রায় কোনো কারণ ছাড়াই ঘাম হওয়া হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে। এরসঙ্গে যদি হার্ট অ্যাটাকের অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দেয় তবে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
দীর্ঘদিন ধরে কফ জমা: সাধারণত এর সঙ্গে হৃদরোগের সম্পর্ক নেই। তবে যাদের হৃদযন্ত্রের সমস্যা আছে কিংবা হৃদরোগের ঝুঁকি আছে তাদের কফ জমাকে অবহেলা করা উচিত নয়। কাশির সঙ্গে যদি সাদা কিংবা গোলাপি রংয়ের কফ যায় তবে তা হৃদপি-ের কর্মক্ষমতা হারানোর লক্ষণ হতে পারে।
পা ফোলা: হৃদযন্ত্র সঠিকভাবে রক্ত সরবরাহ করতে না পারলে শরীরের বিভিন্ন অংশ ফুলতে পারে। আর যখন হৃদপি- প্রয়োজন মতো দ্রুত ‘পাম্প’ করতে পারে না তখন রক্তনালীতে রক্ত ফেরত আসে। ফলে পাকস্থলি ফোলে। হৃদযন্ত্রের সমস্যা থাকলে শরীর থেকে বাড়তি পানি ও সোডিয়াম অপসারণ করতেও হিমশিম খায় কিডনি বা বৃক্ক।
অনিয়মিত হৃদস্পন্দন: ভয় কিংবা উত্তেজনায় হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়। সেটা যদি কয়েক সেকেন্ডের বেশি স্থায়ী হয় তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ এটি হতে পারে ‘এইট্রিয়াল ফাইব্রালেইশন’ বা অনিয়মিত হৃদস্পন্দনের পূর্বাভাস।
এই রোগে প্রাথমিকভাবে বুকে মৃদু ব্যথা হতে পারে। তবে পরবর্তী সময়ে আরও বেশি যন্ত্রণাদায়ক উপসর্গ দেখা দেবে। কিছু ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাক কোনো পূর্বাভাসই দেয় না, যাকে বলা হয় ‘সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাক’। ডায়বেটিস রোগীদের এই পরিস্থিতে পড়ার আশঙ্কা বেশি।
হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ আধা ঘণ্টা কিংবা তারও বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে। বিশ্রাম নিয়ে কিংবা ওষুধ খেয়েও অনেক সময় উপকার মেলে না।
হার্ট অ্যাটাক এবং কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট এক নয়
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশ’য়ের ব্যাখ্যায়- যখন উচ্চমাত্রার অক্সিজেন মিশ্রিত রক্ত বন্ধ হয়ে যাওয়া ধমনীর মধ্যে দিয়ে হৃদপি-ের কোনো অংশে যেতে বাধা পায়, আর সেই ধমনী নুতনভাবে কাজ করতে পারে না, তখন মরে যেতে থাকে। যা থেকে হয় হার্ট অ্যাটাক।
অপরদিকে হৃদযন্ত্রে তড়িৎ প্রবাহের ত্রুটি হলে হৃদস্পন্দন অনিয়মিত হয়ে যায়। এতে হৃদযন্ত্রের রক্ত সরবরাহ প্রক্রিয়ায় সমস্যা দেখা দেয়, ফলে মস্তিষ্ক, ফুসফুস ও অন্যান্য অঙ্গে রক্ত পৌঁছায় না। ফলাফল কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s